পুঁজিবাজারে বড় দরপতন, প্রতিশ্রুতি পূরণের এখনই সময়

দেশের পুঁজিবাজারে অস্থিরতা কাটছেই না। থামছে না দরপতন। আজ পুঁজিবাজারে ভয়াবহ দরপতন হয়েছে। সূচক কমেছে ১০৭ পয়েন্ট, লেনদেন হয়েছে ৫২০ কোটি টাকা। কেন এই দরপতন?
এই পতনের জন্য মূলত দুটি কারণ উল্লেখ করছেন অভিজ্ঞ বিনিয়োগকারীরা। প্রথম কারণটি দীর্ঘদিন ধরে পুঁজিবাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে আসছে, কিন্তু বিষয়টি সুরাহা করা হচ্ছে না। সেটি হলো বিএসইসির চেয়ারম্যানের অপসারণ দাবি। অন্য যে কারণ, তাতে মূলত পুঁজিবাজারের কারও হাত নেই- ইরান যুদ্ধ। তবে প্রথম কারণটি নিয়ে বাজারে চাপানউতুর বহুদিনের।
বিএসইসির চেয়ারম্যানের ওপর বিনিয়োগকারীদের বড় অংশ আস্থা হারিয়েছেন, তারা চান নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ দিক সরকার। তার অপসারণ নিয়ে মাঝে মাঝে আলোচনা হলেও তা আলোর মুখ দেখেনি। আর তাতে প্রায়ই বড় দরপতনে পড়ে বাজার।
যখন বিপর্যয় ঘটে, তখন দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা যদি উদাসীন থাকে, তবে সেই উদাসীনতা একসময় ইতিহাসের কাছে অপরাধে পরিণত হয়। আজকের বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের বাস্তবতা তারই এক নির্মম সত্য। প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ, ভাঙা স্বপ্ন, আর মানুষের অসহায় প্রত্যাশার করুণ প্রতিফলন।
একটি দেশের অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হলো পুঁজিবাজার। এটি শুধু বিনিয়োগের জায়গা নয়; বরং এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক গতিশীলতা, আস্থা এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার প্রতিচ্ছবি। কিন্তু যখন এই বাজারে অনিয়ম, দুর্নীতি ও অদক্ষতার ছাপ পড়ে, তখন তা শুধু অর্থনীতিকেই নয়, মানুষের জীবনকেও বিপর্যস্ত করে তোলে। বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে ঠিক এমনই একটি সংকটের জন্ম হয়েছে, যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির চেয়ারম্যান রাশেদ মাকসুদ।
বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের একজন প্রভাবশালী উপদেষ্টার সুপারিশে রাশেদ মাকসুদ বিএসইসির চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পান। শুরু থেকেই তার কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন উঠতে থাকে। বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থাহীনতা বাড়তে থাকে, বাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়, এবং ধীরে ধীরে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায়, যেখানে অনেকেই পুঁজিবাজারকে “ধ্বংসস্তূপে পরিণত” বলে অভিহিত করতে শুরু করেন।
এটি কেবল একটি আর্থিক সংকট নয়, এটি একটি সামাজিক সংকট। যখন মানুষের আশা ভেঙে যায়, তখন তারা চুপ করে থাকে না। পুঁজিবাজারসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংগঠন, বিনিয়োগকারী এবং সচেতন নাগরিকরা রাস্তায় নেমে আসেন। মতিঝিলে কাফন মিছিল—যা সাধারণত চরম হতাশা ও প্রতীকী মৃত্যুর বহিঃপ্রকাশ—এই সংকটের গভীরতাকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। এই প্রতিবাদগুলো ছিল শুধুমাত্র কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়; বরং একটি ভেঙে পড়া ব্যবস্থার বিরুদ্ধে।
মানুষ চেয়েছিল পরিবর্তন। তারা চেয়েছিল জবাবদিহিতা। তারা চেয়েছিল, কেউ একজন তাদের কথা শুনুক। এই প্রেক্ষাপটে পুঁজিবাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সরাসরি যোগাযোগ করেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে। তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন- তাদের জন্য কাজ করলে এবং তাদের দল ক্ষমতায় গেলে পুঁজিবাজার নিয়ে দাবি পূরণ করা হবে।
রাজনীতিতে প্রতিশ্রুতি একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। এটি মানুষের মন জয় করে, তাদের আস্থা অর্জন করে, এবং কখনো কখনো তাদের জীবনের দিক পরিবর্তন করে দেয়। এই প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাস রেখে পুঁজিবাজারসংশ্লিষ্ট বহু মানুষ সরাসরি নির্বাচনী প্রচারণায় যুক্ত হন। তাদের প্রচেষ্টা, তাদের সময়, তাদের শ্রম, সবকিছু মিলিয়ে তারা একটি পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখেছিলেন।
দুই-তৃতীয়াংশ আসন নিয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি। এটি ছিল এক বিশাল জনসমর্থনের প্রতিফলন। তৈরি হয়েছিল একটি নতুন সূচনার আশা। বিনিয়োগকারীরা ভেবেছিলেন, এবার হয়তো পুঁজিবাজারের সংকট কাটাতে পরিবর্তন আসবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রায় দুই মাসেও সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন হয়নি। যাকে কেন্দ্র করে সংকটের ঘূর্ণাবর্ত বলে বিশ্বাস, সেই ব্যক্তিই বহালতবিয়তে দায়িত্ব পালন করছেন।
দেশের পুঁজিবাজারে সরাসরি জড়িত প্রায় ৩০ লাখ বিনিয়োগকারী। তাদের প্রত্যেকের পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, একটি স্বপ্ন, একটি সংগ্রাম। পরোক্ষভাবে এই সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় এক কোটিতে। এই মানুষগুলো শুধু সংখ্যায় বড় নয়, তারা একটি অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রতিনিধিত্ব করে। যখন বাজার পড়ে যায়, তখন শুধু গ্রাফ নিচে নামে না, মানুষের জীবনও নিচে নামে। কেউ সঞ্চয় হারায়, কেউ ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা হারায়, কেউ আবার বেঁচে থাকার আত্মবিশ্বাস হারায়।
যখন একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত সংকটে থাকে, তখন দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের নীরবতা বা উদাসীনতা কোনো সাধারণ বিষয় নয়। এটি একধরনের নৈতিক ব্যর্থতা। প্রশ্ন হলো, এই পরিস্থিতিতে নীরব থাকা কি সমাধান? নাকি এটি সমস্যাকে আরও গভীর করে?
প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রী তাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণের মাধ্যমে আজ লক্ষ মানুষের প্রত্যাশা ও আস্থার জায়গাটা বড় করতে পারেন। কিন্তু প্রত্যাশা ভেঙে গেলে শুধু বিপুল মানুষের আস্থা নষ্ট হবে না, আরও অতলে যাবে দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ খাত পুঁজিবাজার।
(ঢাকাটাইমস/৫এপ্রিল/মোআ)
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













































