বিশ্ব জলাতঙ্ক দিবস আজ, বাড়ছে কুকুর-বিড়ালের আক্রমণ

কুকুর ও বিড়ালের আক্রমণের শিকার হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। সারাদেশে কুকুর-বিড়ালের আক্রমণের শিকার মানুষের পূর্ণাঙ্গ তথ্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছে না থাকলেও রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের পরিসংখ্যান বলছে, গত দুই বছরে বিভিন্ন প্রাণীর কামড়ের শিকার হয়ে চিকিৎসা নেওয়া রোগীর সংখ্যা বেড়েছে ৫৫ শতাংশ।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্টদের মতে, কুকুরের টিকাদান কর্মসূচি বন্ধ হয়ে যাওয়া, বেওয়ারিশ কুকুরের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং পোষা বিড়াল পালনের প্রবণতা বাড়ায় জলাতঙ্কের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
এমন পরিস্থিতিতে আজ সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) পালিত হচ্ছে বিশ্ব জলাতঙ্ক দিবস। প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে দিবসটি পালন করা হয়। এবারের প্রতিপাদ্য ‘একসঙ্গে আমরা আরও শক্তিশালী’। দিবসটি উপলক্ষে জলাতঙ্ক প্রতিরোধ ও নির্মূলে জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতিবছর জলাতঙ্কে আনুমানিক ৫৯ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। মানুষের জলাতঙ্ক সংক্রমণের প্রায় ৯৯ শতাংশই কুকুরের মাধ্যমে হয়ে থাকে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় কুকুরের অন্তত ৭০ শতাংশকে নিয়মিত টিকার আওতায় আনা গেলে সংক্রমণের চক্র ভাঙা সম্ভব।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলাতঙ্কের উপসর্গ দেখা দেওয়ার পর রোগীকে বাঁচানো অত্যন্ত কঠিন। তাই কুকুর, বিড়াল বা অন্য কোনো প্রাণীর কামড় কিংবা আঁচড়ের পর দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে টিকা নেওয়া জরুরি।
সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিভিন্ন প্রাণীর কামড়ের শিকার হয়ে বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছেন ১ লাখ ৪৬ হাজার ২৪৩ জন। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ১ লাখ ২২ হাজার ২৬৩। চলতি বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় ১ লাখ ৭ হাজার মানুষ চিকিৎসা নিয়েছেন।
এদিকে দেশে জলাতঙ্কে মৃত্যুর সংখ্যাও উদ্বেগজনক। ২০২৪ সালে এ রোগে ৫৮ জন এবং ২০২৫ সালে ৫৯ জন মারা যান। চলতি বছরের প্রথম আড়াই মাসেই ৩৫ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে।
দেশে জলাতঙ্কের চিকিৎসা দেওয়া হয় দুটি হাসপাতালে। তবে এসব হাসপাতালে ভর্তি রোগীর মোট সংখ্যা নিয়মিতভাবে সংরক্ষণ করা হয় না বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর মূলত রোগ প্রতিরোধে টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনা করে।
সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের টিকাকেন্দ্রে দায়িত্ব পালনকারী এক নার্স জানান, বর্তমানে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের একটি বড় অংশ পোষা বিড়ালের আক্রমণের শিকার। অনেকেই পোষা বিড়ালকে নিয়মিত টিকা দেন না। গত কয়েক বছরে বিড়ালের কামড় ও আঁচড়ের ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলেও জানান তিনি।
জলাতঙ্ক নির্মূলে ২০১০ সাল থেকে দেশে সমন্বিত কর্মসূচি চালু ছিল। এর আওতায় কুকুরকে টিকা দেওয়া, জন্মনিয়ন্ত্রণ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং আক্রান্ত ব্যক্তিকে দ্রুত চিকিৎসা দেওয়ার ব্যবস্থা ছিল।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, কর্মসূচির আওতায় ৬০টির বেশি জেলায় প্রায় ২৯ লাখ কুকুরকে জলাতঙ্কের টিকা দেওয়া হয়। ৬৪ জেলায় প্রথম দফার টিকাদান শেষ হয়। দ্বিতীয় দফায় ৪৬ জেলা এবং তৃতীয় দফায় আট জেলায় টিকা দেওয়া হয়।
রোগ নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তাদের ভাষ্য, ২০২৪ সালে সরকার পরিবর্তনের পর কর্মসূচিটি কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। অর্থের অভাবে নতুন করে কুকুরের টিকাদান ও জন্মনিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পরিচালনা করা যাচ্ছে না।
স্বাস্থ্য খাতের দীর্ঘদিনের অপারেশন প্ল্যান (ওপি) ২০২৪ সালে বন্ধ হওয়ার পর জলাতঙ্কের টিকার সংকট দেখা দেয়। আগে ইপিআই কর্মসূচির আওতায় বিনামূল্যে এ টিকা দেওয়া হলেও পরে ঢাকার বাইরের বিভিন্ন জেলায় সংকট তৈরি হয়।
পরিস্থিতি সামাল দিতে গত এপ্রিল জরুরি ভিত্তিতে দরপত্র ছাড়াই ইনসেপটা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের কাছ থেকে ৯ লাখ জোড়া টিকা কেনা হয়। বর্তমানে সরকারের হাতে প্রায় ৫৯ হাজার ডোজ টিকা মজুত রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. এফএ আসমা খান বলেন, জরুরি ভিত্তিতে টিকার সংকট মেটাতে ইনসেপটা থেকে টিকা কেনা হয়েছিল। পরে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।
সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক বলেন, কুকুর বা বিড়ালের কামড় কিংবা আঁচড়ের পর দ্রুত টিকা নিতে হবে। আক্রান্ত হওয়ার পর দেরি করলে ঝুঁকি বাড়ে। অনেকেই প্রথমে স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা নিয়ে পরে হাসপাতালে আসেন, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করতে পারে।
সিডিসির সহকারী পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) ডা. মোহাম্মদ নাজমুল হাসান বলেন, চলতি অর্থবছরে প্রায় ৯ লাখ ডোজ র্যাবিস ভ্যাকসিন এবং ৩ লাখ ডোজ র্যাবিস ইমিউনোগ্লোবিউল সরবরাহের কার্যক্রম রয়েছে।
তিনি জানান, জলাতঙ্ক প্রতিরোধে নতুন পরিকল্পনা করা হচ্ছে। তবে বর্তমানে ওই পরিকল্পনায় মানুষের টিকাদানের বিষয়টিই রাখা হয়েছে। কুকুরকে টিকা দেওয়া বা কুকুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের কোনো পরিকল্পনা এ মুহূর্তে নেই।
(ঢাকাটাইমস/২৮ সেপ্টেম্বর/আরজেড)
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন











