শ্রমিক পরিবার থেকে পরাক্রমশালী প্রেসিডেন্ট

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, ঢাকাটাইমস
 | প্রকাশিত : ২২ মার্চ ২০১৮, ১৬:৪৩

তাকে বলা হয় বিশ্বের সবচেয়ে 'আনপ্রেডিক্টেবল পাওয়ারফুল ম্যান'। যাকে বিশ্লেষণ করার সাধ্য কারও নেই। বিশ্ব রাজনীতিকে কখন কোন দিকে ঘুরিয়ে দেবেন, সে হিসাব কষতে গিয়ে বিশ্লেষকরা এটা মেনে নিয়েছেন। কারণ আর কিছুই নয়, তিনি যেসব ভাবনার বিষয় উসকে দেন বিশ্লেষকরা কেবল তাই-ই ভাবেন।

রাশিয়ায় তাকে ‘লৌহমানব’ বলে এক নামে চেনে সবাই। এছাড়াও তিনি দক্ষ কুস্তিগীর ও খেলোয়াড়। গণমাধ্যমসহ রাশিয়ার পুরো প্রশাসন তার নিয়ন্ত্রণে। তিনি ভ্লাদিমির পুতিন। রাশিয়ায় চতুর্থবারের মতো নির্বাচিত হওয়া প্রেসিডেন্ট।

তবে বিশ্বের পরাক্রমশালী এই নেতার জন্ম রাশিয়ার আর পাঁচটা সাধারণ পরিবারের মতোই একটি পরিবারে। ১৯৫২ সালের ৭ অক্টোবর তার জন্ম। পুতিনের বাবা অত্যন্ত দরিদ্র একজন মানুষ ছিলেন। পুতিনকে খুব পছন্দ করলেও তিনি পুতিনের শুধু ভুল ধরতেন আর বকাঝকা করতেন। পুতিনের দাদা লেনিনের গ্রামের বাড়িতে শেফ ছিলেন। এমনকি তিনি স্টালিনের বাবুর্চির কাজও করেছেন।

স্কুলজীবন থেকেই পুতিন জুডো-কারাতের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন এবং এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে পারদর্শিতা অর্জন করেন। ১৯৬০-১৯৬৮ সালের মধ্যে লেলিনগ্রাদের একটি স্কুলে প্রাথমিকের পড়াশুনা শেষ করেন। এরপর সেখান থেকে অষ্টম গ্রেডের পর তিনি স্কুল নং-২৮১ তে হাই স্কুলে ভর্তি হন। সেখানে ১৯৭০ সালে পড়াশুনা শেষ করেন। ১৯৭০ সালে পুতিন লেনিনগ্রাদ স্টেট ইউনিভার্সিটিতে আইন বিভাগে ভর্তি হন এবং ১৯৭৫ সালে ডিগ্রী অর্জন করেন। ১৯৮০ সালের শুরুর দিকে পুতিন মস্কোর কেজিবি স্কুল নং-১ এ পড়াশুনা করেন।

রুশ সিনেমায় গোয়েন্দাদের ভূমিকা দেখে গোয়েন্দা জীবনের প্রতি কৌতূহল জন্মায় তার। শিক্ষাজীবন শেষ করার পরপরই রুশ গোয়েন্দা সংস্থা কেজিবিতে যোগ দেন ১৯৭৬ সালে। এরপর ১৯৮৫ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত পূর্ব জার্মানির ড্রেসডেনে কেজিবি এজেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বিশ^বিখ্যাতে এ গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

১৯৯৪ সালে পুতিন সেন্ট পিটার্সবার্গ মেয়রের প্রথম ডেপুটি হিসেবে কাজ শুরু করেন। ১৯৯২ সালে তিনি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা পরিষদ থেকে অবসর নেন। সেই সময়ে তিনি ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল। পরবর্তীকালে রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হয়ে ১৯৯৯ সালের আগস্টে তিনি মন্ত্রিসভার সভাপতি নির্বাচিত হন।

২০০০ সালে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনি জয়লাভ করেন। পরবর্তীতে ২০০৪ সালে আবারো দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন পুতিন। রাশিয়ার সংবিধান অনুযায়ী একই ব্যক্তি পরপর দুই বারের বেশি প্রেসিডেন্ট থাকতে পারেন না। এজন্য ২০০৮ সালে তার ঘনিষ্ট দিমিত্রি মেদভেদেভকে প্রেসিডেন্ট বানান এবং তিনি নিজে প্রধানমন্ত্রী হন। এবং এ সরকারের সময় তিনি প্রেসিডেন্টের মেয়াদ চার বছর থেকে বাড়িয়ে ছয় বছর করেন। ২০১২ সালে পুনরায় তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন এবং ২০১৮ সালে চতুর্থবারের মতো প্রেসিডেন্ট হিসেবে ব্যাপক ব্যবধানে জয়লাভ করেন।

ক্ষমতায় টিকে থাকতে এবং নির্বাচনে কোনো বাধা যেন না থাকে সেজন্য তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন লোককে জোরপূর্বক শাস্তিসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ থাকলেও রাশিয়ার বেশিরভাগ মানুষের কাছে তিনি ‘নাম্বার ওয়ান’ তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

চলতি সিরিয়া যুদ্ধে রাশিয়া কাস্পিয়ান সাগরে অবস্থানরত যুদ্ধজাহাজ থেকে ৯৬০ মাইল দূরবর্তী সিরিয়ায় বিদ্রোহীদের অসংখ্য অবস্থানে নিখুঁত ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে প্রতিপক্ষ আমেরিকাসহ পশ্চিমাদের প্রমাণ করে দিয়েছে সামরিক সক্ষমতায় রাশিয়া এখন বিশ্বসেরা। এটি প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ। উন্নত প্রযুক্তির নিত্যনতুন সামরিক সরঞ্জাম নির্মাণের মাধ্যমে ভ্লাদিমির পুতিন সরকার আমেরিকার সামরিক কর্তৃত্বকে রীতিমতো চ্যালেঞ্জ করেছেন। সম্প্রতি রাশিয়া শত শত বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে ভূগর্ভস্থ সামরিক নিয়ন্ত্রণ কক্ষ চালু করেছে। সিরিয়া যুদ্ধে যাবতীয় দিক-নির্দেশনা এই নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে প্রদান করা হচ্ছে।

রাশিয়ার ক্ষমতা সম্পর্কে বলতে গিয়ে ২০১৪ সালে পুতিন হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, বিভিন্ন দেশকে এটা বুঝতে হবে যে, রাশিয়ার সঙ্গে লাগতে যাওয়া ঠিক হবে না। আমি আপনাদের মনে করিয়ে দিতে চাই যে, রাশিয়া বিশ্বের অন্যতম পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র।

পুতিন তার সময়কালে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এনেছেন। এছাড়াও রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণাধীন চেচনিয়ায় দ্বিতীয় চেচেন যুদ্ধের মাধ্যমে অঙ্গরাজ্যগুলোর অখণ্ডতা বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছেন। পুতিনের রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন সময়ে রাশিয়ায় অর্থনৈতিক ভিত ৯ বছরের মধ্যে জিডিপি ৭২% বৃদ্ধি পায়। দারিদ্র্যতা কমপক্ষে ৫০% কমে যায়। গড় মাসিক বেতন ৮০ মিার্কিন ডলার থেকে ৬৪০ মার্কিন ডলার বৃদ্ধি পায়।

প্রেসিডেন্ট থাকাবস্থায় পুতিন লভ্যাংশের উপর কর হ্রাসসহ ১৩% হারে আয়কর ধার্য্যের বিষয়ে আইন পাশ করেন। জ্বালানী নীতি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করার ফলে রাশিয়া জ্বালানী খাতে বৃহৎ শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়।

বৃহৎ জ্বালানী প্রকল্প হিসেবে রাশিয়ার আণবিক শক্তিতে নবজাগরণের সৃষ্টি হয়। এছাড়াও অনেকগুলো বৃহৎ রপ্তানী সহায়ক পাইপলাইনের মাধ্যমে পরিবহন ব্যবস্থার অবকাঠামো নির্মাণেরও সূচনা হয়। তন্মধ্যে রয়েছে ইস্টার্ণ সাইবেরিয়া-প্যাসিফিক ওশেন অয়েল পাইপলাইন বা এসপো এবং নর্ড স্ট্রিম প্রকল্প অন্যতম।

পুতিনের রাষ্ট্রপতিত্ব নিয়ে পশ্চিমা পর্যবেক্ষক ও দেশের অভ্যন্তরে বিরোধীরা তাকে অগণতান্ত্রিক হিসেবে আখ্যায়িত করে। কিন্তু দেশে আইনের শাসন প্রবর্তন ও স্থিতিশীলতা আনয়ণের প্রেক্ষাপটে রুশ সমাজব্যবস্থায় তিনি ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন।

পুতিনের ব্যক্তিগত জীবন:

লেনিনগ্রাদে অবস্থানকালীন যুবক বয়সে পুতিন বেশ কয়েকবার জুডো এবং স্যাম্বো (মার্শাল আর্ট) খেলায় চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন। নিয়মিত ব্যায়াম করে শরীরের ফিটনেস রক্ষা করেন সাবেক এই গোয়েন্দা কর্মকর্তা। এখনো তিনি প্রায় প্রতিদিন মার্শাল আর্ট অনুশীলন করেন।

পুতিনের পড়ার বইয়ের তালিকায় সবার উপরে গোয়েন্দা কাহিনি। এ সম্পর্কে পুতিনের বিখ্যাত একটি উক্তিও আছে— 'আমাকে সবচেয়ে বেশি বিস্মিত ও মুগ্ধ করে ওই বিষয়টি, যখন কোনো একটি কাজ পুরো সেনাবাহিনী মিলে করতে পারে না, অথচ সেই কাজই করে ফেলেন গুটিকয়েক ব্যক্তি।'

পুতিন রুশ অর্থোডক্স গির্জার সদস্য। ব্যক্তিগত জীবনে বিবাহিত পুতিন ২৮ জুলাই, ১৯৮৩ তারিখে কালিনিনগ্রাদে জন্মগ্রহণকারী ও সাবেক বিমানবালা লিদমিলা শ্রেবনেভাকে বিয়ে করেন। তাদের সংসারে মারিয়া পুতিনা ও ইয়েকাতেরিনা পুতিনা নামের দুই কন্যা রয়েছে।

কন্যাদ্বয়ের পড়ালেখা, ঘোরাফেরা সবই ছিল খুবই গোপন ও অত্যন্ত সুরক্ষিত। কলেজে ছদ্মনামে তারা পরিচিত ছিল। এমনকি বসবাসের ঠিকানা ছিল একেবারে অজ্ঞাত। তবে ত্রিশ বছর সংসার করার পর আলাদা হয়ে যান ভ্লাদিমির পুতিন ও তার দীর্ঘদিনের সঙ্গী লুদমিলা। স্ত্রীকে ডিভোর্স দেয়ার পর পুতিনের এই গোপন জগত কিছুটা হলেও ভেঙে পড়ে।

তার সম্পদের পরিমাণ সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানা যায় না। রাশিয়ার নির্বাচন কমিশনে জমা দেয়া তথ্য অনুযায়ী, পুতিনের বাৎসরিক বেতন এক লাখ ১২ হাজার ডলার। কিন্তু দুই বছর আগে মার্কিন ট্রেজারি দপ্তরের কর্মকর্তারা বিবিসিকে বলেছেন, ভ্লাদিমির পুতিন একজন দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তি, যিনি তার সম্পদ অনেক বছর ধরে লুকিয়ে রেখেছেন। ২০০৭ সালের একটি সিআইএ নথিতে জানা যায়, তার ব্যক্তিগত সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার।

বিশ্বের প্রভাবশালী এ প্রেসিডেন্টের একাধিক ভাষার উপর পূর্ণ দক্ষতা রয়েছে। নিজের মাতৃভাষা রুশ ছাড়াও পুতিন স্বতঃস্ফূর্তভাবে জার্মান ভাষায়ও কথা বলতে পারেন। বাড়ীতে তিনি ও তার পরিবার জার্মান ভাষায় কথা বলে থাকেন। প্রেসিডেন্ট হবার পর জানা যায় যে, তিনি ইংরেজি ভাষা শিক্ষাগ্রহণ করছেন। তাকে অনানুষ্ঠানিকভাবে সরাসরি বুশ ও ইংরেজভাষীদের সাথে ইংরেজিতে কথা বলতে দেখা গেছে। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে আলাপ-আলোচনার সময় তিনি এখনও অনুবাদকের সহায়তা গ্রহণ করেন।

ঢাকাটাইমস/২২মার্চ/একে/ডিএম

সংবাদটি শেয়ার করুন

আন্তর্জাতিক বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত