তাড়াশে খেজুরের রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরিতে ব্যস্ত গাছিরা

রাতের কুয়াশা ও ভোরের শিশির যত বাড়ছে খেজুরের গুড়ের চাহিদাও ততো বাড়ছে। তাই বাণিজ্যিকভাবে সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে খেজুর রস সংগ্রহ ও সুস্বাদু গুড় তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন পেশাদার ও মৌসুমি গাছিরা। যা স্থানীয় চাহিদা পূরণ করে চলে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে।
চলতি মৌসুমে উপজেলায় ১ হাজার ৬২৬টি খেজুরের গাছ থেকে প্রায় ১৩৫ মেট্রিক টন খেজুর গুড় উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে কৃষি অফিস।
সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, উত্তরবঙ্গের শস্য ও মৎস্য ভান্ডারখ্যাত তাড়াশ উপজেলায় খেজুর গাছের সংখ্যা বেশি। শীত মৌসুমের শুরুতেই রাজশাহী ও নাটোরের বিভিন্ন উপজেলা থেকে আসা গাছিরা মালিকদের কাছ থেকে খেজুর গাছ লিজ নেয়। শীতের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ৭৫ দিনে ১শ থেকে দেড়শ জন মানুষ খেজুরের রস সংগ্রহ, গাছের পরিচর্যা ও গুড় তৈরির কাজে যুক্ত থাকেন। আর প্রথম দিকে প্রতিদিন পাটালি গুড় তৈরি হয়। এই গুড় বিক্রি হয় ১৮০ থেকে ২০০ টাকা কেজি দরে। এছাড়াও মাঝামাঝি থেকে পুরো মৌসুমে প্রতিদিন পাটালি ও ঝোলা তৈরি করা হয়। প্রতি কেজি ঝোলাগুড় বাজারে পাইকারদের কাছে ১৬০ থেকে ১৮০ টাকায় বিক্রি করা হয়। এসব খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরি করে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন পেশাদার ও মৌসুমি গাছিরা।
উপজেলার দেশিগ্রাম ইউনিয়নের মাছদক্ষিণা গ্রামে গুড় কিনতে আসা লাইলী খাতুন ঢাকা টাইমসকে বলেন, খাঁটি খেজুরের গুড় পাইকারি প্রকারভেদে ১৬০ থেকে ১৯০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করা হয়। তবে ভালো মানের গুড়ের দাম ২১০ টাকা কেজি। চাহিদা বেশি ভালো মানের গুড়ের। বাড়িতে পিঠা খাওয়ার জন্য ৩ মণ কিনেছি।
রানীরহাট বাজারের গুড় ব্যবসায়ী রহমত আলী জানান, শীত মৌসুমে খেজুর রসের পিঠা, পায়েস, গুড়ের মুড়ি-মুড়কির জন্য ভালো মানের গুড় নিচ্ছেন। বাজারে ভালো মানের খেজুরের গুড়ের চাহিদা বেশি।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে আসা সবুজ মিয়া জানান, ৩২৫টি গাছ লিজ নেওয়া হয়েছে। প্রতিটি গাছ থেকে সপ্তাহে ৪ থেকে ৫ দিন রস সংগ্রহ করা হয়। প্রতিটি গাছ থেকে শুরুতে এক থেকে তিন কেজি করে রস সংগ্রহ হয় ও আস্তে আস্তে তা বাড়ে। প্রতিদিন ধাপে ধাপে সম্পূর্ণ গাছের রস সংগ্রহ করা হয়। এক মণ রস চুলায় জ্বাল করার পরে বিক্রি উপযোগী ৬ কেজি পাটালি, ৮ কেজি দানা গুড় ও ৯ কেজি ঝোলাগুড় পাওয়া যায়।
গুড় কিনতে আসা লুৎফর রহমান ঢাকা টাইমসকে বলেন, খাঁটি খেজুরের পাটালি গুড় খুচরা ১৬০ থেকে ১৮০ কেজি ও ঝোলা গুড় ২২০ থেকে ১৮০ টাকা কেজি। তবে কিছু গুড় রয়েছে ১৫০ থেকে ১৮০ টাকা কেজি।
তাড়াশ ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক আবু হাশিম খোকন বলেন, গ্রাম বাংলার প্রাচীন এক ঐতিহ্য খেজুরের গুড়। শীতের ভোরে গ্রামীণ জনপদে খেজুরের রস সংগ্রহে বেরিয়ে পড়েন গাছি ও কৃষকরা। কুয়াশাভেদ করে সূর্য উঁকি দেওয়ার আগেই গ্রামের বাড়ি ও বিভিন্ন স্থানে মাটির চুলায় সেই রস জ্বাল করে গুড় তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। রস থেকে নানা ধরনের পাটালি এবং ঝোলা গুড় উৎপাদন হয়ে থাকে।
এ প্রসঙ্গে তাড়াশ উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, চলনবিল অধ্যুষিত এ উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের মেঠো পথ ও বাড়ির আঙিনায় পর্যাপ্ত খেজুর গাছ ছিল। খেজুর গাছ পরিবেশ বান্ধব সাশ্রয়ী একটি বৃক্ষ প্রজাতি। বিভিন্ন কারণে এ গাছের সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে। এতে কমে যাচ্ছে গুড়ের উৎপাদনও।
তাড়াশ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. মনোয়ার হোসেন বলেন, বাদুড় থেকে নিপাহ ভাইরাস ছড়ায়। খেজুরের রসে ও রস থেকে মানুষের শরীরে এ ভাইরাস এসেছে। তাই খেজুরের কাঁচা রস খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। যদিও কেউ খেজুরের কাঁচা রস খেতে চান তাহলে রস সংগ্রহের পর আগুনে ৭০-৮০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপে কিছু উত্তপ্ত করলেই ভাইরাস মরে যাবে।
(ঢাকাটাইমস/২০ডিসেম্বর/ইএইচ/জেডএম)
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন












