আজ আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস, প্রযুক্তিনির্ভর সাক্ষরতাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ

আজ ৮ সেপ্টেম্বর, আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এ বছর সাক্ষরতার প্রসারে প্রযুক্তির ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ইউনেসকোর নির্ধারিত এবারের প্রতিপাদ্য ‘প্রযুক্তির যুগে সাক্ষরতার প্রসার’। তবে বাংলাদেশে সাক্ষরতার হার ধারাবাহিকভাবে বাড়লেও এখনো বিপুলসংখ্যক মানুষ পড়তে ও লিখতে পারেন না। ফলে শতভাগ সাক্ষর সমাজ গঠনের লক্ষ্য অর্জনে এখনো বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, দেশে সাত বছর ও তদূর্ধ্ব জনগোষ্ঠীর সাক্ষরতার হার বর্তমানে ৭৭ দশমিক ৯ শতাংশ। ২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে এ হার একই অবস্থানে ছিল। এর আগে ২০২১ সালে সাক্ষরতার হার ছিল ৭৫ দশমিক ৬ শতাংশ এবং ২০২২ সালে ৭৬ দশমিক ৮ শতাংশ।
অর্থাৎ, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সাক্ষরতার হার বৃদ্ধির গতি অনেকটাই স্থবির। সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু আনুষ্ঠানিক শিক্ষা নয়, নিরক্ষর জনগোষ্ঠীর জন্য ধারাবাহিক ও কার্যকর কর্মসূচি নিশ্চিত করা না গেলে এই হার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো কঠিন।
তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় ২১ দশমিক ৯ শতাংশ মানুষ এখনো নিরক্ষর। সংখ্যার হিসাবে এটি প্রায় চার কোটি মানুষের সমান। তাদের একটি বড় অংশ মৌলিক পড়াশোনা ও প্রয়োজনীয় দক্ষতা থেকে বঞ্চিত।
নিরক্ষরতা দূরীকরণে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৬৪ জেলার ২৪৮টি উপজেলার ১৫ থেকে ৪৫ বছর বয়সী প্রায় সাড়ে ৪৪ লাখ মানুষকে মৌলিক সাক্ষরতার আওতায় আনা হয়েছে।
এ ছাড়া ১৪ থেকে ১৮ বছর বয়সী বিদ্যালয়ছুট কিশোর-কিশোরীদের শিক্ষার মূলধারায় ফিরিয়ে আনতে পাইলট প্রকল্প পরিচালিত হচ্ছে। তবে মাঠপর্যায়ে এসব কার্যক্রমের পরিধি ও বাস্তবায়ন নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সাক্ষরতার হারে বাংলাদেশের অবস্থান তুলনামূলকভাবে ভালো। এ অঞ্চলে ৯৭ দশমিক ৮৬ শতাংশ সাক্ষরতার হার নিয়ে শীর্ষে রয়েছে মালদ্বীপ। ৯২ দশমিক ৩৮ শতাংশ নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে শ্রীলঙ্কা। আর ৭৮ শতাংশ সাক্ষরতার হার নিয়ে তৃতীয় অবস্থানে বাংলাদেশ।
অন্যদিকে ভারতের সাক্ষরতার হার ৭৪ দশমিক ৩৭ শতাংশ এবং পাকিস্তানের ৫৮ শতাংশ।
তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আঞ্চলিক তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থান আশাব্যঞ্জক হলেও শতভাগ সাক্ষর সমাজ গঠনের জন্য মানসম্মত শিক্ষা, ঝরে পড়া রোধ এবং প্রযুক্তিনির্ভর সাক্ষরতা কার্যক্রমে আরও জোর দিতে হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশে সাক্ষরতা নিয়ে বছরজুড়ে ধারাবাহিক কার্যক্রম খুব একটা দৃশ্যমান নয়। আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবসকে কেন্দ্র করে শোভাযাত্রা, আলোচনা সভা ও বিভিন্ন প্রচারমূলক কর্মসূচি নেওয়া হলেও নিরক্ষরতা দূরীকরণে দীর্ঘমেয়াদি কার্যক্রমের ঘাটতি রয়েছে।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমদ বলেন, নিরক্ষর ও বিদ্যালয়বহির্ভূত জনগোষ্ঠীকে চিহ্নিত করে তাদের জন্য নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা প্রয়োজন। দারিদ্র্য, শিক্ষার্থী ঝরে পড়া, বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রম ও শিক্ষার প্রতি অনাগ্রহও নিরক্ষরতা কমানোর পথে বড় বাধা।
তার মতে, শুধু একটি দিবসকে কেন্দ্র করে আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি নিলে পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে না। সাক্ষরতা কার্যক্রমকে জাতীয় অগ্রাধিকার দিয়ে পর্যাপ্ত অর্থায়ন, মাঠপর্যায়ে নজরদারি এবং সাক্ষরতার সঙ্গে কর্মদক্ষতাকে যুক্ত করতে হবে।
সরকার ২০৩১ সালের মধ্যে দেশে সাক্ষরতার হার ৮৬ থেকে ৯০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
সাক্ষরতা বৃদ্ধির পাশাপাশি বিদ্যালয়বহির্ভূত শিশু-কিশোর ও নিরক্ষর জনগোষ্ঠীকে কর্মমুখী দক্ষতায় গড়ে তুলতে নতুন কার্যক্রম নেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।
‘অলটারনেটিভ লার্নিং অপরচুনিটি’ (এএলও) কার্যক্রমের আওতায় দেশের ৬৪ জেলার ৬৪টি নির্বাচিত উপজেলায় ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সী ১৯ হাজার ২০০ বিদ্যালয়বহির্ভূত শিশু-কিশোরকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত মৌলিক শিক্ষা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী আরও ১৯ হাজার ২০০ তরুণকে জীবিকায়ন দক্ষতা প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্যোগ রয়েছে।
এ ছাড়া ‘স্কিল ফোকাসড লিটারেসি ফর আউট অব স্কুল অ্যাডোলেসেন্ট’ (স্কিলফো) কার্যক্রম আরও ১৬ জেলায় সম্প্রসারণ করে তিন বছরে এক লাখ কিশোর-কিশোরীকে দক্ষতাভিত্তিক সাক্ষরতার আওতায় আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
চলতি অর্থবছরে বিশেষ কার্যক্রমের দ্বিতীয় ধাপে ৫০ জেলায় আরও ৪ হাজার কিশোর-কিশোরীকে প্রাক-বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রাপ্তবয়স্ক নিরক্ষরদের সাক্ষরতার আওতায় আনতে ‘অ্যাডাল্ট লিটারেসি অ্যান্ড ফাংশনাল অ্যাবিলিটি (আলফা) এনহ্যান্সমেন্ট প্রোগ্রাম’-এর পাইলট পর্যায়ে ৪০ জেলার ৪০টি উপজেলায় ৩৫ হাজার নারী-পুরুষকে প্রায়োগিক সাক্ষরতা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। পরবর্তী সময়ে ২৫ থেকে ৪৫ বছর বয়সী ৪৫ লাখ নিরক্ষর নারী-পুরুষকে এ কর্মসূচির আওতায় আনার লক্ষ্য রয়েছে।
বর্তমান সময়ে শুধু পড়তে ও লিখতে পারাই সাক্ষরতার মানদণ্ড নয়; প্রযুক্তি ব্যবহার, তথ্য যাচাই এবং ডিজিটাল মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সেবা গ্রহণের সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তাই প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সাক্ষরতা কার্যক্রমকে আরও আধুনিক ও কর্মমুখী করার তাগিদ দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশাল জনগোষ্ঠীকে মৌলিক ও প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতার আওতায় আনতে পারলে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির পাশাপাশি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নও আরও গতিশীল হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এই বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবসে শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়, নিরক্ষরতা দূরীকরণে দীর্ঘমেয়াদি, বাস্তবভিত্তিক ও প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসূচি জোরদারের প্রত্যাশা রয়েছে।
(ঢাকাটাইমস/৮ সেপ্টেম্বর/আরজেড)
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন







