জায়নবাদকে ‘বর্ণবাদ’ ঘোষণা, নীতি গ্রহণ ব্রিটেনের গ্রিন পার্টির

জায়নবাদকে ‘বর্ণবাদের একটি রূপ’ হিসেবে বিবেচনা করে আনুষ্ঠানিক নীতি গ্রহণ করেছে ব্রিটেনের গ্রিন পার্টি। রবিবার (৪ অক্টোবর) ব্রাইটনে দলের বার্ষিক সম্মেলনে এ-সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে পাস হয়।
প্রস্তাবটির পক্ষে ভোট দেন ১ হাজার ২২ জন সদস্য। বিপক্ষে ভোট পড়ে ৮১৩টি। এর মধ্য দিয়ে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের গ্রিন পার্টির নীতিতে জায়নবাদকে অন্য যেকোনো ধরনের বর্ণবাদের মতো বিবেচনা করার বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হলো।
দলটির ভাষ্য, প্রস্তাবে জায়নবাদকে একটি ‘জাতিগত-জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক প্রকল্প’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। একই সঙ্গে জায়নবাদবিরোধিতাকে ইহুদিবিদ্বেষের সঙ্গে এক করে দেখার বিরোধিতা করা হয়েছে। দলটি বলছে, তাদের অবস্থান রাজনৈতিক মতাদর্শ ও চর্চার বিরুদ্ধে, কোনো ব্যক্তির ধর্মীয় বা জাতিগত পরিচয়ের বিরুদ্ধে নয়।
প্রস্তাবে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা, ফিলিস্তিনিদের নিজ ভূমিতে ফিরে যাওয়ার অধিকার এবং ইসরাইলের বিরুদ্ধে বয়কট, বিনিয়োগ প্রত্যাহার ও নিষেধাজ্ঞা (বিডিএস) কর্মসূচির প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি ইসরাইলের ওপর পূর্ণাঙ্গ অস্ত্র নিষেধাজ্ঞার দাবিও জানানো হয়েছে। ঐতিহাসিক ফিলিস্তিনজুড়ে একটি একক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষেও দলটির অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে।
গ্রিন পার্টি জানিয়েছে, তারা একটি বর্ণবাদবিরোধী দল এবং ফিলিস্তিনি ও সিরীয় ভূখণ্ডের অবৈধ দখলের বিরোধিতা করে আসছে। দলটির নেতারা একই সঙ্গে বলেছেন, ফিলিস্তিনিদের অধিকার সমর্থনের সঙ্গে ইহুদি জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষার কোনো বিরোধ নেই।
তবে প্রস্তাবটি দলের ভেতরে বিতর্ক তৈরি করেছে। বিশেষ করে গ্রিন পার্টির ইহুদি সদস্যদের মধ্যে এ নিয়ে মতভেদ রয়েছে। ‘জিউইশ গ্রিনস’ জানিয়েছে, তাদের সদস্যদের মধ্যে প্রস্তাবটি নিয়ে গভীর বিভাজন রয়েছে এবং সংগঠনটি এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক অবস্থান নেয়নি।
এর আগে ২০২৬ সালের বসন্ত সম্মেলনের আলোচ্যসূচিতেও জায়নবাদকে বর্ণবাদের একটি রূপ হিসেবে বিবেচনার প্রস্তাব ছিল। পরবর্তী সময়ে অক্টোবরে অনুষ্ঠিত বার্ষিক সম্মেলনে ভোটের মাধ্যমে এটি দলের আনুষ্ঠানিক নীতিতে পরিণত হয়।
দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সম্মেলনে দীর্ঘ ও গভীর বিতর্কের পর সদস্যরা তাদের সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন। নতুন নীতির মাধ্যমে ফিলিস্তিনি মুক্তি, আত্মনিয়ন্ত্রণ, অধিকার ও মানবাধিকারের প্রশ্নে গ্রিন পার্টির অবস্থান আরও স্পষ্ট হয়েছে বলে দলটি উল্লেখ করেছে।
উল্লেখ্য, সমস্ত আধুনিক জায়নবাদীদের মধ্যে সাধারণ ঐক্য হলো ফিলিস্তিনের ভূমিতে একটি ইহুদি রাষ্ট্রের দাবি। জায়নবাদীদের দৃষ্টিভঙ্গিতে ফিলিস্তিন হলো একটি ভূমি যা ঐতিহ্যগতভাবে ইহুদিদের লেখায় ইসরায়েলের ভূমি ("ইরেৎজ ইসরায়েল") নামে পরিচিত। এটি ইহুদিদের জাতীয় স্বদেশ এবং ইহুদিদের জাতীয় স্ব-নিয়ন্ত্রণের জন্য নির্ধারিত। আধুনিক রাজনৈতিক জায়নবাদের বিকাশে ইহুদি সাংবাদিক ও রাজনৈতিক কর্মী থিওডর হার্ৎসেলের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। ১৮৯৭ সালে সুইজারল্যান্ডের বাসেলে তার নেতৃত্বে প্রথম জায়নিস্ট কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ফিলিস্তিনে ইহুদিদের জন্য একটি জাতীয় আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়।
হার্ৎসেল অটোমান সাম্রাজ্যের সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ফিলিস্তিনে ইহুদি বসতি স্থাপনের বিষয়ে আলোচনা করেছিলেন বলে ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। তবে অটোমান শাসকরা ফিলিস্তিনের ভূখণ্ডে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবিতে সম্মত হননি।
জায়নিস্ট কংগ্রেসের পর ফিলিস্তিনে ইহুদি অভিবাসন ও বসতি স্থাপনের প্রচেষ্টা আরও সংগঠিত হয়। বিভিন্ন দেশে থাকা ইহুদি সংগঠনগুলোর মাধ্যমে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সহায়তা সংগ্রহ করা হয়। একই সময়ে জায়নবাদকে ঘিরে ইউরোপের রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা বিতর্ক ও বিরোধিতাও তৈরি হয়।
জায়নিস্ট আন্দোলনের অন্যতম লক্ষ্য ছিল ফিলিস্তিনে ইহুদিদের জন্য একটি জাতীয় আবাসভূমি প্রতিষ্ঠা। এ লক্ষ্যে কৃষক, শ্রমিক ও ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণির ইহুদিদের ফিলিস্তিনে বসতি স্থাপনে উৎসাহিত করা হয়। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায় এবং ইহুদিদের মধ্যে জাতীয় চেতনা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সরকারের সমর্থন জায়নিস্ট আন্দোলনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মোড় তৈরি করে। ১৯১৭ সালের ২ নভেম্বর ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী আর্থার জেমস বেলফোর জায়নিস্ট নেতা লর্ড রথসচাইল্ডকে একটি চিঠি দেন, যা ‘বেলফোর ঘোষণা’ নামে পরিচিত। এতে ফিলিস্তিনে ইহুদি জনগণের জন্য একটি ‘জাতীয় আবাসভূমি’ প্রতিষ্ঠার প্রতি ব্রিটিশ সরকারের সমর্থন প্রকাশ করা হয়।
পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশ ম্যান্ডেট আমলে ইহুদি অভিবাসন ও বসতি বৃদ্ধি পায়। ১৯৪৮ সালে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে জায়নিস্ট আন্দোলনের দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রচেষ্টার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিণতি ঘটে। তবে এর সঙ্গে ফিলিস্তিনিদের বাস্তুচ্যুতি, ভূমি ও অধিকার নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতেরও সূচনা হয়।
(ঢাকাটাইমস/৫ অক্টোবর/আরজেড)
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন












