আজ বিশ্ব শিক্ষক দিবস, জাতি গঠনের কারিগরদের প্রতি শ্রদ্ধা

আজ ৫ অক্টোবর, বিশ্ব শিক্ষক দিবস। শিক্ষকদের মর্যাদা, অধিকার, পেশাগত অবস্থার উন্নয়ন এবং জাতি গঠনে তাদের গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি দিতে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে। এবার বিশ্ব শিক্ষক দিবসের প্রতিপাদ্য-‘শিক্ষকদের পাশে দাঁড়ানো: পেশার সুরক্ষা, মর্যাদা উন্নয়ন ও আমাদের ভবিষ্যৎ গঠন’। ১৯৬৬ সালে আইএলও-ইউনেস্কোর শিক্ষকদের মর্যাদাবিষয়ক সুপারিশ গ্রহণের ৬০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ইউনেস্কো এ প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে।
শিক্ষকতা কেবল জীবিকা নির্বাহের একটি পেশা নয়, বরং মানুষ গড়ার এক মহান ব্রত। একজন শিক্ষক শিক্ষার্থীর মেধা ও মনন বিকাশের পাশাপাশি নীতি-নৈতিকতা, মানবিকতা ও মূল্যবোধের শিক্ষা দিয়ে তাকে ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য প্রস্তুত করেন। শিক্ষকরা তাদের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও আদর্শ দিয়ে গড়ে তোলেন আগামী দিনের নাগরিক; বিনির্মাণ করেন দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ।
এবার বিশ্ব শিক্ষক দিবসের প্রতিপাদ্য—‘শিক্ষকদের পাশে দাঁড়ানো: পেশার সুরক্ষা, মর্যাদা উন্নয়ন ও আমাদের ভবিষ্যৎ গঠন’। ১৯৬৬ সালে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) ও ইউনেসকোর শিক্ষকদের মর্যাদাবিষয়ক সুপারিশ গ্রহণের ৬০ বছর পূর্তি উপলক্ষে এ প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
শিক্ষকরা প্রজন্মের পর প্রজন্মকে আলোর পথ দেখালেও নানা বাস্তবতায় তাদের পেশাগত ও সামাজিক মর্যাদা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা, সামাজিক অবক্ষয়, রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতাসহ নানা কারণে অনেক শিক্ষককে বিভিন্ন সময়ে অপমান-অপদস্থ হতে হয়েছে। ফলে একসময় যে শিক্ষকতা পেশা মেধাবীদের অন্যতম আকর্ষণের জায়গা ছিল, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেখানে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।
৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের জোর করে পদত্যাগে বাধ্য করা, হেনস্তা এবং নানা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার অভিযোগও সামনে এসেছে। এমন বাস্তবতার মধ্যেই এবারের বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালিত হচ্ছে।
শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, নিজেদের ব্যক্তিগত স্বার্থের কথা না ভেবে শিক্ষকরা তাদের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার কাজে নিয়োজিত থাকেন। অথচ অনেক ক্ষেত্রেই শিক্ষকদের নিজেদের ভবিষ্যৎ থাকে অনিশ্চিত।
এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘আসলে একজন শিক্ষক একটা জাতির দর্পণ। কিছু শিক্ষক থাকেন, যারা মা-বাবার দায়িত্বও পালন করেন।’
শিক্ষকরা বলছেন, তারা বাতিঘরের মতো নীরবে প্রজন্মকে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করে দেন। শিক্ষকদের অনেক সমস্যা ও কষ্ট থাকলেও সেসব নিয়ে কথা বলার সুযোগ সবসময় থাকে না। তবে শিক্ষার্থীদের সফলতা ও ভালোবাসাই এ পেশার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি বলে মনে করেন তারা।
বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালনের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় ১৯৯৪ সালে। এর আগে ১৯৬৬ সালে ইউনেসকো ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) শিক্ষকদের মর্যাদা, অধিকার, দায়িত্ব ও কর্মপরিবেশ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ গ্রহণ করে। শিক্ষকদের পেশাগত অধিকার ও মর্যাদা রক্ষায় ঐতিহাসিক ওই সুপারিশের স্মরণে প্রতিবছর ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালন করা হয়।
বাংলাদেশে ২০২৩ সালের ৫ অক্টোবর প্রথমবারের মতো জাতীয়ভাবে বিশ্ব শিক্ষক দিবস উদযাপন করা হয়। এরপর থেকে প্রতিবছর বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি পালন করা হচ্ছে।
দিবসটির অন্যতম উদ্দেশ্য হলো—শিক্ষকদের ভূমিকা ও অবদান সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, তাদের পেশাগত মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং জাতি গঠনে তাদের অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি দেওয়া।
১০১ গুণী শিক্ষক পাচ্ছেন বিশেষ সম্মাননা
বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষে এবার জাতি গঠনে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরের ১০১ জন গুণী শিক্ষককে বিশেষ সম্মাননা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
সম্মাননাপ্রাপ্ত প্রত্যেক শিক্ষককে নগদ ২ লাখ টাকা, বিশেষ ক্রেস্ট ও সম্মাননা সনদ দেওয়া হবে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী মোট ১০১টি সম্মাননা নয়টি ক্যাটাগরিতে দেওয়া হবে। এর মধ্যে প্রাথমিক পর্যায়ে ১০টি, মাধ্যমিক পর্যায়ে ২০টি, কলেজ পর্যায়ে ২৫টি, সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০টি, চিকিৎসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ১০টি, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩টি, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩টি এবং বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও অন্যান্য বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪টি সম্মাননা রাখা হয়েছে। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক সরাসরি নির্বাচিত শিক্ষকদের জন্য রয়েছে আরও ৬টি সম্মাননা।
প্রাথমিক পর্যায়ের ১০টি সম্মাননার মধ্যে সাধারণ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য ৮টি এবং মাদ্রাসার শিক্ষকদের জন্য ২টি রাখা হয়েছে।
মাধ্যমিক পর্যায়ে সাধারণ বিদ্যালয়ের জন্য ১০টি, কারিগরি শিক্ষায় ৫টি এবং মাদ্রাসায় ৫টি সম্মাননা দেওয়া হবে।
কলেজ পর্যায়ের ২৫টি সম্মাননার মধ্যে সাধারণ কলেজে ১৫টি, কারিগরি শিক্ষায় ৫টি এবং মাদ্রাসায় ৫টি রয়েছে।
সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০টি সম্মাননার মধ্যে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য ১৮টি এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য ২টি রাখা হয়েছে। চিকিৎসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মেডিক্যাল কলেজ ও চিকিৎসা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য পাঁচটি করে সম্মাননা নির্ধারণ করা হয়েছে।
গুণী শিক্ষক বাছাইয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে পৃথক সার্চ কমিটি ও প্যানেল গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা পর্যায়ে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি), প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর, মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর পৃথক সার্চ কমিটি গঠন করবে।
প্রতিটি সম্মাননার বিপরীতে তিনজন যোগ্য শিক্ষকের একটি প্যানেল তৈরি করে তা জাতীয় স্টিয়ারিং কমিটির কাছে পাঠানো হবে। পরবর্তী সময়ে যাচাই-বাছাই শেষে চূড়ান্তভাবে গুণী শিক্ষকদের নির্বাচন করা হবে।
বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েও একই ধরনের প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) গঠিত সার্চ কমিটি প্রতিটি সম্মাননার জন্য তিনজন শিক্ষকের প্যানেল প্রস্তুত করবে। সেখান থেকে নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় যোগ্য শিক্ষকদের চূড়ান্ত করা হবে।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, বিশ্ব শিক্ষক দিবসকে কেন্দ্র করে শুধু একটি দিনের আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং সারা বছর শিক্ষকদের কল্যাণে কার্যকর উদ্যোগ ও পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে সরকার।
শিক্ষাবিদরা মনে করেন, একটি দেশের উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ নির্মাণে শিক্ষকদের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অগ্রগতির পাশাপাশি একটি মূল্যবোধসম্পন্ন প্রজন্ম গড়ে তুলতে শিক্ষকদের মর্যাদা, নিরাপত্তা ও পেশাগত স্বাধীনতা নিশ্চিত করা জরুরি।
তাদের মতে, শিক্ষকরা যদি সম্মানজনক পরিবেশে কাজ করতে পারেন এবং পেশাগতভাবে নিরাপদ থাকেন, তাহলে শিক্ষার মানও বাড়বে। তাই বিশ্ব শিক্ষক দিবস কেবল শিক্ষকদের অভিনন্দন জানানোর দিন নয়; বরং তাদের অধিকার, মর্যাদা ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার অঙ্গীকারের দিনও।
দিবসটি উপলক্ষে জাতীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কমিটিগুলো নিজ নিজ এলাকায় বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করবে। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও থাকবে আলোচনা সভা, র্যালি, সম্মাননা প্রদানসহ নানা আয়োজন।
শিক্ষকদের অবদান স্মরণ, তাদের সামাজিক মর্যাদা আরও সুসংহত করা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গঠনে তাদের ভূমিকার গুরুত্ব তুলে ধরার মধ্য দিয়ে পালিত হবে এবারের বিশ্ব শিক্ষক দিবস।
(ঢাকাটাইমস/৫ অক্টোবর/আরজেড)
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













