শাহজালাল বিমানবন্দরে যাত্রী ভোগান্তি ও সুশাসনের দায়

একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কেবল আকাশপথের সংযোগস্থল নয়; এটি রাষ্ট্রের লোগো, জাতীয় নিরাপত্তা এবং সুশাসনের প্রথম মনস্তাত্ত্বিক প্রতিচ্ছবি। বিশেষত বিদেশী বিনিয়োগকারী, আন্তর্জাতিক পর্যটক এবং দেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি প্রবাসী রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের কাছে বিমানবন্দরই রাষ্ট্রের চরিত্র নির্ধারণ করে। বাংলাদেশের প্রধান প্রবেশদ্বার, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে ঘিরে দশকের পর দশক ধরে পুঞ্জীভূত অব্যবস্থাপনা ও যাত্রী হয়রানি আজ কেবল একটি সেবামূলক ব্যর্থতা নয়। অপরাধবিজ্ঞান ও ভূ-রাজনীতির গভীর নিরিখে, এটি আমাদের জাতীয় অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে দেওয়ার এবং বহির্বিশ্বে রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ভূলুণ্ঠিত করার এক সুগভীর অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের অংশ। এই ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে বিমানবন্দরে একটি প্রকৃত ‘ওয়েলকামিং’ ও সাবলীল পরিবেশ নিশ্চিত করা আজ জাতীয় নিরাপত্তার অবিকল্প শর্ত।
ভোগান্তির দীর্ঘ ইতিহাস ও গণআকাঙ্ক্ষা
শাহজালাল বিমানবন্দরকে কেন্দ্র করে দেশের সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে প্রবাসীদের ক্ষোভ ও দীর্ঘদিনের আর্তি আজ দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার শামিল। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাগেজের জন্য অপেক্ষা, কাস্টমস ও ইমিগ্রেশনে অহেতুক জেরা, ট্রলি সংকট, এবং একশ্রেণীর কর্মকর্তা-कर्मचारियों অনাকাঙ্ক্ষিত ও রুক্ষ আচরণ সাধারণ নাগরিকদের আত্মমর্যাদাকে প্রতিনিয়ত ক্ষুণ্ন করছে। যে প্রবাসীরা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখছেন, নিজ ভূমিতে পা রাখামাত্রই তাদের বরণ করা হয় এক মনস্তাত্ত্বিক আতঙ্ক ও শোষণের বেড়াজালে। আধুনিক তৃতীয় টার্মিনাল নির্মিত হওয়ার পরও দৃশ্যমান সেবার মানের কোনো গুণগত পরিবর্তন না হওয়ায় জনগণের গভীর আকাঙ্ক্ষা আজ তীব্র হতাশায় রূপ নিয়েছে। জনগণ আজ এমন এক বিমানবন্দর চায়, যেখানে পা রাখামাত্রই ভয়ের পরিবর্তে মিলবে নাগরিক অধিকার ও পরম আতিথেয়তা।
তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ: কেন এই প্রাতিষ্ঠানিক পঙ্গুত্ব?
অপরাধবিজ্ঞান এবং সুশাসনের তাত্ত্বিক কাঠামো দিয়ে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শাহজালাল বিমানবন্দরের এই সংকট প্রধানত ত্রিমুখী ব্যাধিতে আক্রান্ত:
পাবলিক চয়েস থিওরি (Public Choice Theory): এই তত্ত্বানুযায়ী, বিমানবন্দরে নিয়োজিত বিভিন্ন সংস্থার (সিভিল এভিয়েশন, কাস্টমস, ইমিগ্রেশন পুলিশ ও একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা) কর্মকর্তারা অনেক সময় জনস্বার্থের চেয়ে নিজস্ব প্রাতিষ্ঠানিক বা ব্যক্তিগত স্বার্থকে প্রাধান্য দেন। একটি ‘একক ও সমন্বিত জবাবদিহিমূলক কমান্ড স্ট্রাকচার’ না থাকায় সংস্থাগুলোর পারস্পরিক কাদা-ছোড়াছুড়ি ও দায় এড়ানোর সংস্কৃতি চরম আকার ধারণ করেছে।
রুটিন অ্যাক্টিভিটিজ থিওরি (Routine Activities Theory):
অপরাধবিজ্ঞানের এই তত্ত্ব নির্দেশ করে যে—উপযুক্ত অভিভাবকত্ব বা সেন্ট্রাল মনিটরিংয়ের অভাব (Absence of a Capable Guardian) এবং জবাবদিহিতার শিথিলতার কারণেই বিমানবন্দরে কুলি, মধ্যস্বত্বভোগী ও লজিস্টিকস সিন্ডিকেটের মতো প্রাতিষ্ঠানিক অপরাধের (Institutional Crime) জন্ম হয়েছে।
হসপিটালিটি ডেফিসিট ও মানবাধিকার লঙ্ঘনঃ আন্তর্জাতিক এভিয়েশন গাইডলাইন (ICAO) এবং মানবাধিকারের সার্বজনীন নীতি অনুযায়ী, রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিক এবং বিদেশী অতিথি বিমানবন্দরে সর্বোচ্চ সম্মান পাওয়ার অধিকারী। কিন্তু এখানে কাস্টমার সার্ভিসের তীব্র অপেশাদারত্ব এবং আচরণগত দেউলিয়াত্ব (Hospitality Deficit) রাষ্ট্রকে বহির্বিশ্বে একটি 'অবন্ধুসুলভ' ও 'অনুнят' রাষ্ট্র হিসেবে উপস্থাপন করছে, যা গভীর ভূ-রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রকারীদের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে।
জাতীয় স্থিতিশীলতা ও ভাবমূর্তি রক্ষায় আশু করণীয়
কালক্ষেপণ না করে রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের মর্যাদা alamuন্নত রাখতে অবিলম্বে নিম্নোক্ত কৌশলগত ও কঠোর পদক্ষেপসমূহ গ্রহণ করতে হবে:
১. একক প্রশাসনিক কমান্ড গঠন: বিমানবন্দরে নিয়োজিত সব সংস্থাকে একটি একক সেন্ট্রাল কমান্ডের অধীনে আনতে হবে, যা সরাসরি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নির্বাহী উইং বা একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন স্বাধীন টাস্কফোর্সের কাছে জবাবদিহি করবে। সংস্থাসমূহের অভ্যন্তরীণ সমন্বয়হীনতা দূর করার এটিই একমাত্র পথ।
২. ৬ হাজার আন্তর্জাতিক মানের দক্ষ কর্মী মোতায়েন: প্রাক্কলিত আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, ৪ শিফটে কঠোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ৪ হাজার এবং বিশ্বমানের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ও কাস্টমার সার্ভিসের জন্য ২ হাজার—সর্বমোট ৳ হাজার উচ্চ প্রশিক্ষিত ও সুশিক্ষিত স্থায়ী জনবল দ্রুত নিয়োগ ও পদায়ন করতে হবে।
৩. বাধ্যতামূলক আচরণগত রূপান্তর ও মনস্তাত্ত্বিক প্রশিক্ষণ: বিমানবন্দরে নিয়োজিত প্রতিটি কর্মীকে বাধ্যতামূলকভাবে মানবাধিকার-বান্ধব যোগাযোগ, বহুভাষিক দক্ষতা এবং আধুনিক এভিয়েশন আতিথেয়তার কঠোর প্রশিক্ষণ নিতে হবে। যাত্রীদের অবমাননা করা রাষ্ট্রকে অবমাননা করার শামিল—এই বার্তা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
৪. জিরো টলারেন্স ও তাৎক্ষণিক জুডিশিয়াল অ্যাকশন: লাগেজ চুরি, ইচ্ছাকৃত হয়রানি বা বকশিশের নামে ঘুষ আদায়ের বিরুদ্ধে পূর্ণাঙ্গ ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বাস্তবায়ন করতে হবে। ২৪ ঘণ্টা সচল বিশেষ মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে অপরাধীদের তাৎক্ষণিক চাকরিচ্যুতি ও কঠোর ফৌজদারি সাজার ব্যবস্থা করতে হবে।
৫. স্মার্ট ও এআই-চালিত নজরদারি: পুরো বিমানবন্দরকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) চালিত সিসিটিভি এবং ডিজিটাল লাগেজ ট্র্যাকিং সিস্টেমের আওতায় এনে দালাল ও সিন্ডিকেট চক্রের প্রবেশাধিকার চিরতরে রুদ্ধ করতে হবে।
অতএব, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে নিয়ে যেকোনো ধরনের অভ্যন্তরীণ অযোগ্যতা বা নেতিবাচক চিত্র আমাদের জাতীয় অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে দেওয়ার আন্তর্জাতিক চক্রান্তকে উস্কে দেয়। রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে কোনো ধরনের শৈথিল্য বা আপসের সুযোগ নেই। কঠোর প্রশাসনিক ও কৌশলগত সংস্কারের মাধ্যমে বিমানবন্দরের প্রতিটি প্রবেশদ্বারকে দেশের জন্য অহংকার, আতিথেয়তা ও নিরাপত্তার অভেদ্য দুর্গ হিসেবে গড়ে তুলতেই হবে। এটি কেবল একটি সেবামূলক সংস্কার নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তা অক্ষুণ্ন রাখার ও ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করার অবিকল্প লড়াই।
লেখক: উপাচার্য, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয়, সোমালিয়া; অপরাধবিজ্ঞান, সুশাসন ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ
(ঢাকাটাইমস/৫ অক্টোবর/আরজেড)
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













