বেসরকারি মেডিকেল কলেজ তাহলে কী জন্যে? স্বাস্থ্যমন্ত্রী-সচিব শুনছেন?

আরিফুর রহমান দোলন
| আপডেট : ০৬ মে ২০২০, ১৪:২৬ | প্রকাশিত : ০৬ মে ২০২০, ১৩:৩৪

গুরুতর একটি প্রশ্ন তুলতে চাই। দেশে যে ৭০টি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল রয়েছে সেগুলো আসলে কী জন্যে? স্নাতক পর্যায়ে মেডিকেল শিক্ষা? মানে এমবিবিএস চিকিৎসক তৈরি করা। আর চিকিৎসা সেবা দেওয়া? মাননীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। এ বিষয়ে সদুত্তর নিশ্চয়ই দেবেন স্বাস্থ্য সচিবও। পরিষ্কার কথা আমরা জানতে চাই বুঝতে চাই যে বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে আসলে কী হয়।

কোটি টাকা খরচ করে একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ থেকে যে শিক্ষার্থী একজন চিকিৎসক হিসেবে বের হন দেশের সামগ্রিক চিকিৎসা সেবায় তার ভূমিকা কতখানি আমাদের এখন সেটি জানতে হবে। একইভাবে সরকার যেসব চিকিৎসা সেবা দেওয়ার শর্তে বেসরকারি পর্যায়ে মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল স্থাপনের অনুমতি দেয় তার কতটুকু প্রতিপালন করা হয়, সেটিও জানা জরুরি এখন। আর সরকারি শর্তের যথাযথ প্রতিপালন না হলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কী করেছে বর্তমান প্রেক্ষাপটে স্বাস্থ্যমন্ত্রী, সচিবের কাছে সেই প্রশ্নের উত্তর চাওয়াও খুব প্রাসঙ্গিক এখন।

সাদা চোখে আমরা যা দেখছি, বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল দেশে বর্তমান যে প্রকট স্বাস্থ্য সেবা সমস্যা তার বিন্দুমাত্র ভার নেওয়ার মত উপযোগী বা তৈরি নয়। এমনকি স্বাভাবিক যে চিকিৎসা সেবা সেটিও কি কখনো বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালগুলোতে পাওয়া যায়? বিস্ময়করভাবে আমরা লক্ষ করছি যে কোভিড-১৯ রোগের পরীক্ষা, চিকিৎসার জন্যে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে যেসব হাসপাতাল ভুক্তভোগীদের সেবা দিচ্ছে এর মধ্যে কোন বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল নেই। এমনকী কোভিড-১৯ রোগের চিকিৎসার জন্য নির্ধারিত হাসপাতালগুলোতে নানা সতর্কতার কারণে স্বাভাবিক কিছু রোগের চিকিৎসায় এক ধরনের সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। কিন্তু এই সীমাবদ্ধতাকে কাটিয়ে ওঠানোর জন্য বেসরকারি মেডিকেল কলেজ যে উদ্যোগী হয়েছে বা কোন সক্ষমতা অর্জন করেছে এমন কিছুও আমরা কেউ জানি না।

তাহলে বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলোর কাজ আসলে কী? ফি বছর মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে শিক্ষার্থী ভর্তি করা? আর টাকার বিনিময়ে শিক্ষার্থী ভর্তি করা? আর টাকার বিনিময়ে চিকিৎসক তৈরির ব্যবস্থা করা। শোনা যায়, বেসরকারি মেডিকেল কলেজে একজন শিক্ষার্থী ভর্তি হতে পরীক্ষার ব্যবস্থা থাকলেও ক্ষেত্রভেদে ৩০ থেকে ৫০ লাখ টাকা খরচ হয়। পাশাপাশি প্রভাবশালী মহলের তদবিরও লাগে। এক একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজে ন্যূনতম ৫০ জন শিক্ষার্থী প্রতি বছর ভর্তি হয়। শিক্ষার্থী ভর্তি করে মেডিকেল কলেজগুলো যে কোটি কোটি টাকা আয় করে সেটি আসলে যায় কোথায়? চিকিৎসা শিক্ষা, চিকিৎসা সেবা অবকাঠামোয় ব্যয় হয় না ওই অর্থ? নাকি অধিকাংশ টাকাই ঢুকে যায় পরিচালনা পর্ষদ নামধারী মালিকদের পাকেটে? চিকিৎসা শিক্ষা, সেবার মূল উদ্দেশ্য পুরণে বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল যদি পুরোপুরি ব্যর্থই হয় তাহলে এই দায় কার? স্রেফ বাণিজ্য করা, অতি মুনাফা করার জন্য যদি এসব চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা হতে থাকে তাহলে আমরা সেটি মেনেই বা নেবো কেনো? অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এ তো আমাদের মৌলিক অধিকার। এই প্রশ্নে কি আর ছাড় দেওয়ার কোনো সুযোগ আছে?

১৮ এপ্রিল একটি ইংরেজি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী পরবর্তী দুই সপ্তাহের মধ্যে ঢাকার আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ, ইউনিভার্সেল মেডিকেল ও সাহাবুদ্দিন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কোভিড-১৯ রোগ পরীক্ষা ও চিকিৎসার জন্য প্রস্তুত থাকার কথা। একইভাবে খুলনার গাজী মেডিকেল কলেজ ও ঢাকার গ্রীন লাইফ মেডিকেল কলেজও প্রস্তুত হবে। আর একটু দেরিতে প্রস্তুত হবে সিরাজগঞ্জ ও সিলেটের দুটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। কিন্তু ওই ঘোষণা কাগুজে ঘোষণাই থেকে গেছে। অদ্যবধি এর কোন বাস্তবায়ন বাস্তবায়নের কোন উদ্যোগ আমরা দেখিনি। সরকারি- বেসরকারি পর্যায়ে কোন প্রচারণার লক্ষ্য করিনি। বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ওনার্স এসোসিয়েশনের সভাপতি মনিরুজ্জামান ভূইয়া ইংরেজী দৈনিকটির সঙ্গে আলাপকালে বলেছেন, অনুমতি দিলে বেসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতে না-কি প্রতিদিন ২৫ হাজার কোভিড-১৯ রোগ নির্ণয় পরীক্ষা সম্ভব। যেখানে সরকারি হাসপাতালগুলোতে এই পরীক্ষা করছে গড়ে প্রতিদিন এখন ৩ হাজার।

তাহলে সমস্যাটি আসলে কোথায়? সরকারি অনুমোদন, সহযোগিতা মিলছে না বলেই বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালগুলো কোভিড-১৯ রোগীর চিকিৎসা সেবা দিতে পারছে না? না-কি সেই সক্ষমতা, সদিচ্ছা তাদের নেই? কারণ যা-ই হোক না কেন এজন্য তো ভুগছে সাধারণ মানুষ। বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ওনার্স এসোসিয়েশনের সভাপতি মনিরুজ্জামান ভূইয়ার ভাষ্য, তারা সরকারের সঙ্গে কথা বলেছেন অনুমতির জন্যে। আর এ জন্য দুসপ্তাহের মতো সময় লাগতে পারে। দুটো হাস্যকর কথা। কোভিড-১৯ পরীক্ষার জন্য সরকারের অনুমতি আর অনুমোদন লাগতে পারে। কিন্তু চিকিৎসার জন্য কি আদৌ নতুন করে কোন অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন আছে? প্রয়োজন ছিল প্রয়োজনীয় প্রস্তুতির। হয়তো তার ঘাটতি ছিল বলেই সরকারি অনুমতির প্রয়োজনীয়তার এই বাহানা। দ্বিতীয়ত, অনুমতি পেতে দুই সপ্তাহ লাগার বিষয়টিও অযৌক্তিক আর অবিশ্বাস্য। এরকম একটি অতি জরুরি বিষয়ে অনুমতি দিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের দুই সপ্তাহ সময়ই বা কেনো লাগবে? এটা যদি হয় এতো চরম অবহেলা, অদক্ষতা আর পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তোলার চেষ্টার সুপষ্ট নজির। সর্বশেষ যেটা জানা গেছে যে বেসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলো তাদের কাঙ্ক্ষিত অনুমতি, অনুমোদন পায়নি।

আমাদের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান প্রাইভেট মেডিকেল ওনার্স এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক। এপ্রিল মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে তিনি গণমাধ্যমকে বলেছেন, সবগুলো বেসরকারি মেডিকেল কলেজ দিবারাত্রি খোলা আছে। এই হাসপাতালগুলো কোভিড-১৯ এর রোগীসহ সব ধরনের রোগীর চিকিৎসা করার জন্য প্রস্তুত। কিন্তু বাস্তবে আমরা কী পেলাম? কোভিড-১৯ রোগী তো দূরের কথা প্রাইভেট হাসপাতাল সাধারণ রোগীও ফেরত দিচ্ছে। হৃদরোগ, কিডনি, ডায়াবেটিস রোগের রোগী একাধিক বেসরকারি হাসপাতাল ঘুরে চিকিৎসা পারননি, ভর্তি হতে পারেননি। মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছেন এমন অনেক অভিযোগ গণমাধ্যমে ভুক্তভোগীর পরিবার করেছে। জাতিসংঘের একজন কর্মকর্তা খোদ প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিচার দিয়েছেন রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে। ওই কর্মকর্তা দাবি করেছেন, তার মায়ের মৃত্যু হয়েছে, ইউনাইটেড হাসপাতালের অবহেলায়। আইসিইউতে থাকা রোগীকে করোনা আক্রান্ত সন্দেহে ইউনাইটেড হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জোরপূর্বক ছাড়পত্র দিয়েছিল বলে অভিযোগে জানানো হয়।

যে প্রশ্নটি সরাসরি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রীকে করতে চাই, মন্ত্রীর পদে থেকে তিনি কি মালিক পক্ষের প্রতিনিধিত্ব করতে পারেন? তিনি কি কোনোভাবেই বেসরকারি মেডিকেল কলেজ এসোসিয়েশনের সাধারণ পদাধিকারী হতে পারেন, একজন মন্ত্রী হয়ে? তিনি তো সংবিধান ছুয়ে শপথ নিয়েছেন। এটি কি সাংঘাতিক না? মন্ত্রী এবং বেসরকারি মেডিকেল কলেজের চেয়ারম্যান, এক সঙ্গে দুইটি লাভজনক পদে থাকা কি আমাদের সংবিধান সম্মত? মোটেও না। তাহলে কিভাবে এটি সম্ভব হচ্ছে? সংবিধান লঙ্ঘন হলে এটি রক্ষার দায়িত্বে যারা তারা করছেনটা কি?

এনাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের মালিক/চেয়ারম্যান আমাদেও দুর্যোগ ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী মহোদয়। তার মেডিকেল কলেজসহ দেশের ৭০টি মেডিকেল কলেজে প্রতি বছর ৬ হাজার ৩৩৬ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হয়। পাঠক, শুধু হিসাব করেন যে তাহলে বেসরকারি পর্যায়ে কতজন শিক্ষার্থী প্রতি বছর চিকিৎসক হয়ে বের হয়। এর যৎসামান্য বিদেশি শিক্ষার্থী। এতজন চিকিৎসক তৈরির কারখানা যেসব মেডিকেল কলেজ তাহলে তার নূন্যতম অবকাঠামো সুবিধা কেমন হওয়া উচিত। হ্যাঁ, এ বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা, নির্দেশাবলী, শর্ত আছে।

বেসরকারি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার অবকাঠামোগত শর্তাবলীর ২.৫ অনুচ্ছেদে বলা আছে ৫০ শয্যা বিশিষ্ট একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ একাডেমিক কার্যক্রম শুরু হওয়ার কমপক্ষে ২ বৎসর পূর্ব হতে প্রস্তাবিত ক্যাম্পাসে প্রয়োজনীয় ভৌত অবকাঠামোসহ নূন্যতম ২৫০ শয্যার একটি আধুনিক হাসপাতাল (৭০ শতাংশ বেড অকুপেন্সিসহ) চালু থাকতে হবে। পরবর্তীতে চিকিৎসা শিক্ষার জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ প্রশিক্ষণ হাসপাতালে রূপান্তর করা যায়। হাসপাতালে দরিদ্র জনগণের জন্য বিনা ভাড়ায় অন্তত ১০ শতাংশ বেড সংরক্ষণসহ ফ্রি চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকতে হবে। হাসপাতালে সমস্ত আধুনিক সুযোগ সুবিধাসহ সার্বক্ষণিক জরুরি চিকিৎসা সেবা কার্যক্রম থাকতে হবে।

কেউ কি বলতে পারেন, রাজধানীর কোনো বেসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বিনা ভাড়ায় প্রকৃত কোনো দরিদ্র রোগীর চিকিৎসা সেবা হয়েছে? বেসরকারি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার শিক্ষা কার্যক্রম চালুর শর্তাবলীর ৩.৬ অনুচ্ছেদে বলা আছে, কলেজের ৫ শতাংশ আসন দরিদ্র মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদেও জন্য সংরক্ষিত থাকতে হবে এবং উল্লিখিত ভর্তিকৃত ছাত্র-ছাত্রীদের তালিকা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর/মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করতে হবে। তাদের নিকট থেকে সরকারি মেডিকেল কলেজের অনুরূপ ফিস আদায় করা যেতে পারে। প্রশ্ন, এই শর্ত আদৌ প্রতিপালন হয়?

বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল আমাদের চিকিৎসা সেবায় কতটুকু ভূমিকা রাখছে এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়াটা এখন খুব জরুরি। শুধুমাত্র বাণিজ্যিক কারণে এই প্রতিষ্ঠানগুলো টিকে থাকবে এটি মেনে নেওয়ার যায় না। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে দুর্বল পরিবীক্ষণ আর নিয়ন্ত্রণের কারণে যদি বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলো অতি মুনাফালোভী ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের রূপ পায় তাহলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী-সচিব পদে আছেন কী করতে?

লেখক: সম্পাদক, দৈনিক ঢাকা টাইমস, ঢাকা টাইমস টোয়েন্টিফোর ডটকম এবং সাপ্তাহিক এই সময়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

রাজপাট বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :