ইথিওপিয়ায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে নিহত ৫২, আহত ৭০০

ইথিওপিয়ার উত্তরাঞ্চলের টাইগ্রে অঞ্চলের আলামাতা শহর ও আশপাশের এলাকায় তিন দিনের তীব্র সংঘর্ষে অন্তত ৫২ জন বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন। একই সময়ে আহত হয়ে ৭০০ জনের বেশি মানুষ বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক দাতব্য সংস্থা মেডসাঁ সঁ ফ্রঁতিয়ের (এমএসএফ)।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারি বাহিনী আঞ্চলিক যোদ্ধাদের কাছ থেকে আলামাতা শহরের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। এখন তারা টাইগ্রে অঞ্চলের প্রধান শহর মেকেলের দিকে অগ্রসর হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে আলামাতার বিভিন্ন সড়কে সেনাবাহিনীর ট্যাংক দেখা গেছে।
টাইগ্রে অঞ্চল নিয়ন্ত্রণকারী রাজনৈতিক শক্তি ও ইথিওপিয়ার কেন্দ্রীয় সরকারের মধ্যে কয়েক মাস ধরে উত্তেজনা চলছিল। গত সপ্তাহে সেই উত্তেজনা নতুন করে সশস্ত্র সংঘাতে রূপ নেয়। ২০২২ সালে দুই বছরের গৃহযুদ্ধের অবসান ঘটাতে যে শান্তিচুক্তি হয়েছিল, সেটি লঙ্ঘনের জন্য দুই পক্ষই পরস্পরকে দায়ী করছে।
টাইগ্রের সংঘাত এখন আশপাশের এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে লালিবেলা শহরেও এর প্রভাব পড়েছে। ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত এই শহরে গত এক সপ্তাহ ধরে ৩৩ জন পর্যটক আটকা পড়ে আছেন।
লালিবেলায় অবস্থানরত এক ব্রিটিশ পর্যটক বিবিসিকে জানান, পুরো সপ্তাহজুড়েই তারা লড়াই, গুলির শব্দ ও ভারী কামানের গোলাবর্ষণের শব্দ শুনেছেন। শহরটিতে সেনাবাহিনীর বড় উপস্থিতি রয়েছে বলেও জানান তিনি।
১৩ শতকে পাথর কেটে তৈরি ১৩টি গির্জার জন্য বিখ্যাত লালিবেলা। অর্থোডক্স খ্রিস্টানদের কাছে শহরটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও পবিত্র স্থান। গত বুধবার বিমানবন্দরটি বাণিজ্যিক ফ্লাইটের জন্য বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সেখানে থাকা বেশির ভাগ পর্যটক শহরটি ছাড়তে পারেননি।
তবে সোমবার সামরিক হেলিকপ্টারে করে ১৪ জন ইসরায়েলি পর্যটককে লালিবেলা থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এর আগের দিন আরও পাঁচজন একটি বেসরকারি সংস্থার গাড়িবহরে করে শহর ছেড়ে যান।
বিমানবন্দর বন্ধ হওয়ার সময় লালিবেলায় মোট ৫৩ জন পর্যটক ছিলেন। পরে কয়েকজনকে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হলেও এখনো বেশ কয়েকজন সেখানে আটকা রয়েছেন। তাদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের একটি বড় দল রয়েছে। এ ছাড়া ইসরায়েল, যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ কোরিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকার নাগরিকরাও রয়েছেন। ইথিওপিয়া ও নিউজিল্যান্ডের দ্বৈত নাগরিক এবং একজন মেক্সিকান নাগরিকও সেখানে আটকা রয়েছেন।
সংঘর্ষে হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। টেলিযোগাযোগব্যবস্থা বন্ধ থাকায় টাইগ্রে অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকার সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না।
আন্তর্জাতিক দাতব্য সংস্থা এমএসএফ জানিয়েছে, গত কয়েক দিনে টাইগ্রেতে তাদের সহায়তা পাওয়া হাসপাতালগুলোতে ৭০০ জনের বেশি আহত মানুষ ভর্তি হয়েছেন।
আলামাতা জেনারেল হাসপাতালের এক চিকিৎসক বিবিসিকে জানান, শনিবার থেকে সোমবার পর্যন্ত আলামাতা শহর ও আশপাশের এলাকায় ব্যাপক লড়াই হয়েছে। এ সময় ভারী বিস্ফোরক ও কামান ব্যবহার করা হয়। কয়েকটি হামলায় আবাসিক বাড়িঘরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ওই চিকিৎসকের ভাষ্য অনুযায়ী, নিহতদের মধ্যে মাত্র তিন দিন বয়সী একটি শিশুও রয়েছে। নারী ও গবাদিপশু চরানো মানুষও নিহত হয়েছেন। আলামাতার একটি বাজারে চালানো এক হামলায় একসঙ্গে ১২ জন নিহত হয়েছেন বলেও জানান তিনি।
সাম্প্রতিক সংঘর্ষ কে শুরু করেছে, তা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ রয়েছে। টাইগ্রে পিপলস লিবারেশন ফ্রন্ট (টিপিএলএফ) দাবি করছে, কেন্দ্রীয় সরকারের হামলার জবাবেই তারা পাল্টা আক্রমণ চালিয়েছে। ওই হামলায় ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছিল বলেও দাবি করেছে তারা।
অন্যদিকে ইথিওপিয়ার সরকার বলছে, টাইগ্রের বাহিনীই প্রথম হামলা চালিয়েছে। সরকারি বক্তব্য অনুযায়ী, টাইগ্রের বাহিনী বিমানবন্দরগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর সংঘর্ষ শুরু হয়।
টিপিএলএফের যোদ্ধারা টাইগ্রের বাইরে আফার অঞ্চলসহ আরও কয়েকটি এলাকায় লড়াই করছে। আফার ইথিওপিয়ার জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি অঞ্চল। এটি স্থলবেষ্টিত ইথিওপিয়াকে প্রতিবেশী জিবুতি এবং দেশটির গুরুত্বপূর্ণ বন্দরগুলোর সঙ্গে যুক্ত করেছে।
লড়াইয়ের সঙ্গে আমহারা অঞ্চলের একটি মিলিশিয়াও জড়িয়ে পড়েছে। ওই মিলিশিয়া টাইগ্রের যোদ্ধাদের সঙ্গে জোট করেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সেপ্টেম্বরের শুরুতে তারা আরও কয়েকটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে মিলে সাত সদস্যের একটি জোট গঠন করে। জোটটির ঘোষিত লক্ষ্য ছিল রাজধানী আদ্দিস আবাবায় থাকা সরকারকে সরিয়ে দেওয়া।
ইরিত্রিয়াকে ঘিরেও উদ্বেগ
সংঘাতের পরিধি আরও বাড়লে প্রতিবেশী ইরিত্রিয়াও এতে জড়িয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ইথিওপিয়ার সরকার অভিযোগ করেছে, ইরিত্রিয়া বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সহায়তা করছে। তবে ইরিত্রিয়া এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
২০২০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত টাইগ্রে অঞ্চলে চলা গৃহযুদ্ধে ইথিওপিয়া ও ইরিত্রিয়ার বাহিনী একদিকে এবং টিপিএলএফ অন্যদিকে অবস্থান নিয়েছিল। দুই বছরের সেই যুদ্ধের পর ২০২২ সালে শান্তিচুক্তির মাধ্যমে সংঘাতের অবসান ঘটে।
সাম্প্রতিক উত্তেজনা নতুন করে সেই সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি করেছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতি কতটা বিস্তৃত হয়েছে, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
বিবিসি জানিয়েছে, সরাসরি সংবাদ সংগ্রহের সুযোগ না থাকায় টাইগ্রে ও আশপাশের এলাকায় সংঘর্ষের প্রকৃত পরিস্থিতি নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। যোগাযোগব্যবস্থা বন্ধ থাকায় হতাহতের সংখ্যা, সামরিক অগ্রগতি এবং বিভিন্ন এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে পাওয়া তথ্যও সীমিত।
ব্যাংকিং ও যোগাযোগব্যবস্থা বন্ধ
লড়াই শুরুর পর টাইগ্রে অঞ্চলে ব্যাংকিং সেবা বন্ধ করে দিয়েছে সরকার। ইন্টারনেট ও মোবাইল যোগাযোগও বন্ধ রয়েছে। তবে এসব সেবা বন্ধের সিদ্ধান্ত কে নিয়েছে, তা স্পষ্ট নয়।
আলামাতার একটি সূত্র বিবিসিকে জানিয়েছে, শহরের মানবিক পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি হচ্ছে। সংঘর্ষ থেকে পালিয়ে আসা মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকায় শহরটি এখন অনেকটা ভিড়ে পূর্ণ।
আশপাশের এলাকার বাসিন্দারা হেঁটে আলামাতায় আসছেন। কেউ কেউ প্রায় এক ঘণ্টা পর্যন্ত হেঁটে শহরে পৌঁছেছেন। তাদের ধারণা ছিল, আলামাতা তুলনামূলক নিরাপদ। কিন্তু সেখানে এসে তারা ব্যাংকিং সেবা, টাকা পাঠানোর ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট ও ফোন—কোনোটিই স্বাভাবিকভাবে চালু পাননি।
ফলে খাবার, অর্থ ও অন্যান্য জরুরি প্রয়োজন মেটাতে সাধারণ মানুষকে বড় ধরনের সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।
টাইগ্রের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সরকারি বিধিনিষেধের প্রভাব অঞ্চলটির বাইরে থাকা টাইগ্রিয়ানদের ওপরও পড়েছে। কয়েকজন গ্রাহক বিবিসিকে জানিয়েছেন, টাইগ্রেতে খোলা তাদের ব্যাংক হিসাব বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে অথবা সেগুলোর ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
টাইগ্রের এক সাবেক বাসিন্দা জানান, উত্তেজনা বাড়তে থাকায় তিনি দুই মাস আগে রাজধানী আদ্দিস আবাবায় চলে আসেন। সম্প্রতি আদ্দিস আবাবা থেকে আদামা যাওয়ার পথে মোবাইলের মাধ্যমে টাকা পরিশোধ করতে গিয়ে তিনি সমস্যায় পড়েন।
বিবিসির তিগরিনিয়া সার্ভিসকে তিনি বলেন, টাইগ্রে থেকে পালিয়ে আসা তার মতো অনেক মানুষের জন্য ব্যাংকিং সেবা বন্ধ হয়ে যাওয়া বড় সমস্যা তৈরি করেছে।
লালিবেলায় পর্যটকদের আতঙ্ক
লালিবেলায় আটকে থাকা এক ব্রিটিশ পর্যটক জানান, গত দুই দিনে সেখানকার পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়েছে। তবে বিমানবন্দর এখনো সামরিক বাহিনী ব্যবহার করছে।
বৃহস্পতিবার বিমানবন্দরটি আবার বাণিজ্যিকভাবে চালু হতে পারে—এমন কিছু ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে বলে জানান তিনি। তবে স্থানীয় মানুষের মধ্যে এখনো ভয় ও উদ্বেগ রয়েছে।
ওই পর্যটক জানান, শহরে সেনাবাহিনীর উপস্থিতি রয়েছে এবং একটি বড় সামরিক দলকে উত্তরের দিকে যেতে দেখা গেছে। বিমানবন্দর বন্ধ হওয়ার কারণে পর্যটকদের অনেকেই শহর ছাড়তে পারেননি।
নগদ অর্থের সংকটও দেখা দিয়েছে। অনলাইন ব্যাংকিং কিছুটা সচল থাকলেও নগদ টাকা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানান ওই পর্যটক।
টেলিযোগাযোগব্যবস্থা বন্ধ থাকায় টাইগ্রেতে আটকে থাকা মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য আদ্দিস আবাবাভিত্তিক টাইগ্রে ব্রডকাস্টিং সার্ভিস (টিবিএস) একটি উদ্যোগ নিয়েছে।
টেলিভিশন চ্যানেলটি জানিয়েছে, টাইগ্রের বাইরে থাকা স্বজনদের কাছ থেকে টেলিগ্রাম চ্যানেলের মাধ্যমে ভিডিও বার্তা সংগ্রহ করা হবে। পরে সেসব বার্তা স্যাটেলাইট টেলিভিশনে প্রচার করা হবে।
যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার এই সময়ে পরিবারগুলোর সঙ্গে শুভেচ্ছা ও সাম্প্রতিক খবর বিনিময়ের সুযোগ তৈরি করতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে সংঘর্ষ অব্যাহত থাকায় টাইগ্রের সাধারণ মানুষের জন্য মানবিক পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠছে। ব্যাংকিং ও যোগাযোগব্যবস্থা বন্ধ, বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট বিচ্ছিন্নতা এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি—সব মিলিয়ে অঞ্চলটিতে জরুরি সহায়তার প্রয়োজন বাড়ছে।
এদিকে সরকারি বাহিনী আলামাতার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর মেকেলের দিকে অগ্রসর হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানা গেছে। ফলে সামনে সংঘর্ষ আরও বাড়তে পারে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে পরিস্থিতির সামগ্রিক চিত্র এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়।
(ঢাকাটাইমস/১ অক্টোবর/আরজেড)
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন












