স্ট্রোকের ঝুঁকি থেকে বাঁচবেন যেভাবে

স্বাস্থ্য ডেস্ক, ঢাকাটাইমস
  প্রকাশিত : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১০:৪৮
অ- অ+

স্ট্রোক মস্তিষ্কের রোগ। মস্তিষ্কের অভ্যন্তরে রক্তক্ষরণের ফলে অক্সিজেন সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটলে মস্তিষ্কের কোষগুলো যখন দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হয় সে অবস্থাকে স্ট্রোক বলে। স্ট্রোক মস্তিষ্কের এক ধরনের রক্তবাহী নালির দুর্ঘটনা। এই দুর্ঘটনায় রক্তনালি বন্ধও হতে পারে, আবার ফেটেও যেতে পারে। এ কারণে মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। স্ট্রোক সম্পূর্ণই মস্তিষ্কের রক্তনালির জটিলতাজনিত রোগ। সাধারণত দেহের রক্তের মাত্র ২% মস্তিষ্ক ব্যবহার করে থাকে। কিন্তু মস্তিষ্ক কোষসমূহ অত্যন্ত সংবেদনশীল। অক্সিজেন বা শর্করা সরবরাহে সমস্যা হলে দ্রুত এই কোষগুলো নষ্ট হয়ে যায়। ওই কোষগুলো শরীরের যেই অংশ নিয়ন্ত্রণ করত ওই অংশগুলো পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে যেতে পারে।

কেন স্ট্রোক

হাই প্রেশার, সুগার-সহ নানা রিস্ক ফ্যাক্টর মস্তিষ্কের রক্তবাহী ধমনীর পথ আটকে দেয়। এদিকে রক্তের মধ্যে ভেসে বেড়ানো চর্বির ডেলা আচমকা ধমনীতে আটকে গিয়ে রক্ত চলাচল বন্ধ করে দিতে পারে। ফলে মস্তিষ্কের কোষ অক্সিজেনের অভাবে নিস্তেজ হতে হতে অকেজো হয়ে যায়। এই ব্যাপারটাই স্ট্রোক। সাধারণত, দু’ধরনের স্ট্রোক হয়। ইসকিমিক আর হেমারেজিক। ইসকিমিক স্ট্রোকে রক্ত চলাচল থেমে যায়। আর হেমারেজিক স্ট্রোকে দুর্বল রক্তনালী ছিঁড়ে গিয়ে রক্তপাত হয়। এছাড়া আছে ট্র্যান্সিয়েন্ট ইসকিমিক অ্যাটাক বা টিআইএ। কোনো ছোট রক্তের ডেলা মস্তিষ্কের রক্তবাহি ধমনীতে সাময়িকভাবে আটকে গেলে কিছুক্ষণের জন্য রোগীর ব্ল্যাক আউট হবার ঝুঁকি থাকে। আপাত দৃষ্টিতে মারাত্মক না হলেও টিআইএ-র পরে বড় অ্যাটাকের ঝুঁকি থাকে।

স্ট্রোক বুঝবেন কীভাবে

যদি কথা বলতে বলতে আচমকা জিভ অসাড় হয়ে যায় অথবা অল্প সময়ের জন্যে চোখে অন্ধকার দেখেন অর্থাৎ ব্ল্যাক আউট হয়। কাজ করতে করতে হাত-পা বা শরীরের কোনো একদিক হঠাৎপক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে যায়, অথবা চোখে দেখতে সমস্যা হয়। ঝাপছা দৃষ্টি বা ডাবল ভিশন হয়। কথা বলতে অসুবিধে হয় অথবা ঢোক গেলা মুশকিল হয়ে দাঁড়ায়। মুখ থেকে লালা বেরোতে থাকে অথবা সম্পূর্ণ জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যায় রোগী।

স্ট্রোক প্রতিরোধে নিয়মিত খাদ্যাভাস

স্ট্রোক আটকাতে অবশ্যই প্রেশার, সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। ক্ষুধা পেলেই প্যাকেটবন্দি নোনতা কুকিজ বা চিপস খাওয়ার অভ্যাস থাকলে তা বন্ধ করুন। কারণ এতে মিশে থাকা অতিরিক্ত লবণ স্ট্রোক ডেকে আনছে নীরবেই! অতিরিক্ত লবণের প্রভাবে রক্তচাপ বাড়ে এবং তা মস্তিষ্কে রক্ত সংবহনে বাধা দেয়। ফলে আজই রাশ টানুন অতিরিক্ত লবণ মেশানো খাবারে।

২০১৭-য় ‘স্ট্রোক’ জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণা জানাচ্ছে, দিনের পর দিন সকালের প্রথম খাবারে কোনো সিরিয়াল বা প্যানকেক খেয়ে চলেছেন, তারাও দাঁড়িয়ে রয়েছেন বিপদপথে। এসব সিরিয়াল ও প্যানকেক পেস্ট্রিতে অতিরিক্ত চিনি থাকে। ইস্কিমিক স্ট্রোকের ক্ষেত্রে এগুলোর ভূমিকা রয়েছে।

‘দ্য ল্যানসেট’-এ প্রকাশিত ২০১৯-এর একটি গবেষণা বলছে, ধূমপান, মদ্যপান করেন না ও স্বাস্থ্যকর খাবার খান তারা স্ট্রোকের থেকে অনেকটাই নিরাপদে থাকেন। তুলনামূলকভাবে মদ্যপায়ীরা রয়েছেন বিপদে। শরীরে ভিটামিন সি-এর কোনো অভাব পড়ছে কি না, সে দিকে খেয়াল রাখুন। হেমোরহ্যাজিক স্ট্রোককে ডেকে আনে এই ভিটামিনের ঘাটতি। পাতে রাখুন ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার। সাধারণ নরম পানীয় ছেড়ে ডায়েট পানীয়কে বেছে নেন অনেকেই। কিন্তু এতে অতিরিক্ত চিনি মেশানো থাকে। যা হার্টের জন্যও ক্ষতিকর। মেদ ও কোলেস্টেরলও বাড়ায়। স্ট্রোক ডেকে আনতেও এর জুড়ি নেই। শীত হোক বা গরম, শরীরকে শুষ্ক করে দেওয়া চলবে না মোটেই। তাই পানি খেতে হবে পর্যাপ্ত। শরীরে পানির অভাব যাতে না হয়, তার খেয়ালও রাখতে হবে।

মানসিক অবসাদও স্ট্রোক ডেকে আনার অন্যতম কারণ। হাতশা ও মানসিক অবসাদ হৃদযন্ত্রে যেমন চাপ ফেলে, তেমনই মস্তিষ্কের কোষে রক্ত সঞ্চালনে বাধা দেয়। ঘন ঘন হতাশায় ভোগেন যারা, তারা দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। একটু আধটু ব্যথা হলেই মুঠো মুঠো ব্যথানাশক ওষুধ খান? এতে থাকা স্টেরয়েড ভাস্কুলার ডেথ, হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের মতো অসুখের আশঙ্কাকে বাড়িয়ে দেয় কয়েক গুণ। কাজেই অতিরিক্ত এ সব খাওয়ার অভ্যাস থাকলে তা পরিত্যাগ করুন আজই।

দিনে সাত-ঘণ্টা একই জায়গায় বসে কাজ করলে তাদের মস্তিষ্কে অক্সিজেনের জোগান কম হয়। তাই চিকিৎসকদের পরামর্শ, মাঝে মাঝেই সিট ছেড়ে উঠুন, হাঁটাহাঁটি করে আসুন। অতিরিক্ত রেড মিট স্ট্রোকের প্রায় ২৮ শতাংশ আশঙ্কা বাড়িয়ে দেয়। কোলেস্টেরল বাড়ানোতেও এর জুড়ি নেই। বদ্ধ ঘরে সারাক্ষণ এসি চালিয়ে বসে থাকেন? তা হলেও সাবধান হোন। মাঝে মাঝেই খুলে দিন জানালা। বাইরের হাওয়াবাতাস ঢুকতে দিন ঘরে। ঘরের ভেতরের হাওয়া যাতে দূষিত না থাকে সে দিকেও নজর দিন।

বায়ুদূষণ থেকে বাঁচতে যা যা করণীয়, তা করুন। বায়ুদূষণও স্ট্রোকের অন্যতম কারণ। খাবার পাতে দুগ্ধজাত জিনিস রাখুন। যারা ল্যাকটোজেন সহ্য করতে পারেন না, তারাও এর বিকল্প কোনো খাবার জেনে নিন চিকিৎসকের থেকে। দুধ থেকে তৈরি জিনিস প্রতিদিন পাতে রাখলে তা স্ট্রোকের শঙ্কা ঠেকায় অনেকটাই। ভিটামিন ডি-এর উৎকৃষ্টতম ও প্রায় একমাত্র উৎস সূর্যালোক। সারাক্ষণ এসিতে না থেকে মাঝে মাঝে সূর্যের আলো লাগান শরীরে। ভিটামিন ডি-এর অভাবও স্ট্রোক ডেকে আনে।

ভিটামিন ডি-এর অভাব হাড়ের অসুখেরও অন্যতম কারণ। এর অভাব ঘোচাতে বেশ কিছু ওষুধও মেলে। চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে খেতে পারেন সেসব।

স্ট্রোকের চিকিৎসা গোল্ডেন আওয়ার

মাথা ব্যথা বা অ্যাসিডিটির মতো সেলফ মেডিকেশন আমাদের মজ্জাগত। কিন্তু টিআইএ বা স্ট্রোকের ক্ষেত্রে এটা-ওটা করতে গিয়ে সময় নষ্ট করলেই মহাবিপদ। প্রাণে বাঁচার ঝুঁকি ক্রমশ কমে যায় তো বটেই, সঙ্গে আর দুই প্রাণে বাঁচলেও জবুথবু হয়ে পড়ে থাকার সম্ভাবনা বাড়ে। তাই স্ট্রোকের লক্ষণ দেখলেই যত দ্রুত সম্ভব হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা করানো প্রয়োজন।

স্ট্রোক হওয়ার পর সাড়ে চার ঘণ্টা হল গোল্ডেন আওয়ার। ইংরেজিতে বলা হয় স্ট্রোকের ক্ষেত্রে ভাবুন ফাস্ট বা এফ.এ.এস.টি। ফাস্ট বা এফ.এ.এস.টি পরীক্ষাটি হলো সবচেয়ে সহজে স্ট্রোকের লক্ষণগুলো মনে রাখা আর চিনতে পারার উপায়। ফাস্ট পরীক্ষাটি করতে নিচের প্রশ্নগুলো করুন।

ফেইস বা মুখ: খেয়াল করে দেখুন, মুখ কি বাঁকা হয়ে গেছে?

আর্মস বা হাত: তারা কি দুই হাতই উপরের দিকে তুলতে পারছে?

স্পিচ বা কথা: তার কি কথা জড়িয়ে যাচ্ছে?

টাইম বা সময়: এই লক্ষণগুলো মিলে গেলে সময় নষ্ট না করে হাসপাতালে নিয়ে যান।

যত দ্রুত এর চিকিৎসা করবেন ততোই রোগীর জন্য ভালো, নাহলে মস্তিষ্কে চাপের কারণে রোগী প্যারালাইসিস হয়ে যেতে পারে। স্ট্রোকের দ্রুত চিকিৎসা হলে পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠা সম্ভব।

(ঢাকাটাইমস/১৩সেপ্টেম্বর/আরজেড/জেবি)

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
Error!: SQLSTATE[42000]: Syntax error or access violation: 1064 You have an error in your SQL syntax; check the manual that corresponds to your MySQL server version for the right syntax to use near ') ORDER BY entry_time DESC,id DESC LIMIT 4' at line 4