এলজিইডির জ্যেষ্ঠতার তালিকায় ‘সাত বছর এগিয়ে’ কর্মকর্তা

১৫৯ জনকে পেছনে ফেলে সামনে নির্বাহী প্রকৌশলী শহীদুজ্জামান, অভিযোগ বিধি লঙ্ঘনের

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা টাইমস
  প্রকাশিত : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৭:৫৭
অ- অ+

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) জ্যেষ্ঠতার তালিকা নিয়ে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। ৩১ আগস্ট প্রকাশিত সর্বশেষ তালিকায় নির্বাহী প্রকৌশলী শহীদুজ্জামান খানের জ্যেষ্ঠতা আগের খসড়া তালিকার তুলনায় আরও ওপরে তুলে আনা হয়েছে।

অভিযোগ উঠেছে, এতে বিদ্যমান আইন ও বিধিবিধান উপেক্ষা করে ১৫৯ জন কর্মকর্তাকে পেছনে ফেলে শহীদুজ্জামান খানকে সামনের সারিতে নেওয়া হয়েছে।

শুধু জ্যেষ্ঠতার অবস্থান পরিবর্তন নয়, তার প্রকল্পে যোগদানের সালও সাত বছর এগিয়ে দেখানোর অভিযোগ উঠেছে। ২০০৪ সালে প্রকল্প থেকে রাজস্ব খাতে যোগ দেওয়া এই কর্মকর্তার ক্ষেত্রে সর্বশেষ তালিকায় প্রকল্পে যোগদানের সময় ১৯৯৭ সাল দেখানো হয়েছে। এ নিয়ে এলজিইডির প্রকৌশলীদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, জ্যেষ্ঠতার তালিকায় এ ধরনের পরিবর্তন ভবিষ্যতে পদোন্নতির ক্ষেত্রে বড় প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে প্রধান প্রকৌশলী পদে কে আগে বিবেচিত হবেন, তা নির্ধারণে জ্যেষ্ঠতার তালিকা গুরুত্বপূর্ণ। ফলে একজন কর্মকর্তাকে অস্বাভাবিকভাবে সামনে এনে দেওয়ার পেছনে ‘বিশেষ সুবিধা’ দেওয়ার চেষ্টা রয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

২০২৪ সালের খসড়ায় ছিলেন ১৯৯ নম্বরে

এলজিইডি সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন আগে করা জ্যেষ্ঠতার তালিকার পর ২০১৫ ও ২০২৪ সালে আরও দুটি খসড়া তালিকা করা হয়েছিল। তবে সেগুলোর কোনোটিই চূড়ান্ত অনুমোদন পায়নি। চলতি বছরের এপ্রিল থেকে আগস্ট পর্যন্ত কয়েক দফা কাটাছেঁড়ার পর গত সোমবার (৩১ আগস্ট) নতুন জ্যেষ্ঠতার তালিকা প্রকাশ করা হয়।

ওই তালিকায় শহীদুজ্জামান খানের অবস্থান নিয়ে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে। ২০২৪ সালের খসড়া তালিকায় শহীদুজ্জামান খানের জ্যেষ্ঠতা ছিল ১৯৯ নম্বরে। পরে এপ্রিলের খসড়ায় তাকে ৬৮ নম্বরে আনা হয়। আর সর্বশেষ ৩১ আগস্টের তালিকায় তার অবস্থান আরও ওপরে উঠে দাঁড়ায় ৪০ নম্বরে। অর্থাৎ কয়েক মাসের ব্যবধানে জ্যেষ্ঠতার তালিকায় তার অবস্থানের ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে।

২০০৪ সালে রাজস্ব খাতে, যোগদানের সাল ১৯৯৭?

নথিপত্র অনুযায়ী, শহীদুজ্জামান খান ২০০৪ সালে প্রকল্প থেকে রাজস্ব খাতে যোগদান করেন। কিন্তু সর্বশেষ জ্যেষ্ঠতার তালিকায় প্রকল্পে যোগদানের সময় হিসেবে ১৯৯৭ সাল দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তাদের প্রশ্ন, ২০০৪ সালে রাজস্ব খাতে যোগ দেওয়া একজন কর্মকর্তার ক্ষেত্রে প্রকল্পে যোগদানের সাল ১৯৯৭ দেখিয়ে তাকে সাত বছর এগিয়ে দেওয়ার সুযোগ কোথায়?

এ পরিবর্তনের ফলে ১৯৯৭ সালের পিএসসি ব্যাচের তালিকায় থাকা আবদুস সাত্তারসহ অন্তত ২৯ জন কর্মকর্তা জ্যেষ্ঠতার বিচারে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

এলজিইডির একাধিক প্রকৌশলী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, জ্যেষ্ঠতার তালিকায় যার আগে থাকার কথা, তাকে পেছনে এবং যার পেছনে থাকার কথা, তাকে সামনে নিয়ে আসা হলে পুরো পদোন্নতি কাঠামোই প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

জ্যেষ্ঠতার তালিকা নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ তুলে ক্ষুব্ধ প্রকৌশলীরা স্থানীয় সরকার বিভাগের শুনানিতে বিষয়টি তুলে ধরেন। এ ছাড়া এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী এবং স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিবের কাছেও লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

তবে অভিযোগকারীদের দাবি, এসব অভিযোগের যথাযথ নিষ্পত্তি না করেই সর্বশেষ তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। বরং সর্বশেষ তালিকায় শহীদুজ্জামানের অবস্থান আরও ওপরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এতে ক্ষোভ আরও বেড়েছে।

শহীদুজ্জামান খানের বিরুদ্ধে শুধু জ্যেষ্ঠতার তথ্য পরিবর্তনের অভিযোগই নয়, জন্মস্থান পরিবর্তনের অভিযোগও উঠেছে। প্রকল্পে যোগদানের সময় তার জন্মস্থান গোপালগঞ্জ দেখানো হলেও পরে ২০০৪ সালে তা খুলনা করা হয়েছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের। এ পরিবর্তনের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা।

এ ছাড়া আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা ছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে। ২০০৯ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য সাজেদা চৌধুরীর উপস্থিতিতে ফরিদপুর প্রেসক্লাবে সংগঠনটিতে তার আনুষ্ঠানিকভাবে যোগদানের অভিযোগও সামনে এসেছে।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন শহীদুজ্জামান খান।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এলজিইডিতে নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয় ও পছন্দের কর্মকর্তারা সুবিধা পেয়েছেন। শহীদুজ্জামানও ওই সময়ে ময়মনসিংহ ও ফরিদপুরে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করেছেন বলে তারা উল্লেখ করেন।

এমনকি অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তৎকালীন উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াকে ‘ম্যানেজ’ করে চট্টগ্রাম বিভাগ প্রশস্ত ও শক্তিশালীকরণ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালকের পদ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এ বিষয়ে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)—এমন তথ্যও উঠে এসেছে।

তবে এসব অভিযোগও অস্বীকার করেছেন শহীদুজ্জামান খান। নিজের পক্ষে খুলনা বিএনপি ও ফরিদপুর প্রেসক্লাবের প্রত্যয়নপত্রের কথা উল্লেখ করে তিনি গণমাধ্যমে বলেন, ‘তার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ করা হচ্ছে, সেগুলো সত্য নয়।’

শহীদুজ্জামান বলেন, ‘তিনি ১৯৯৭ সালেই উপজেলা প্রকৌশলী হয়েছিলেন কি না, সেটি যাচাই করলেই তার জ্যেষ্ঠতার বিষয়টি পরিষ্কার হবে।’

এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী মো. বেলাল হোসেন বলেন, জ্যেষ্ঠতার তালিকা তৈরির ক্ষেত্রে বিভিন্ন দিক যাচাই করা হয়েছে।

বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদসহ কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ ধরনের কোনো তালিকা তাদের কাছে নেই। তবে প্রমাণিত রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা থাকলে এমন ব্যক্তিকে পদোন্নতি দেওয়া হয়নি বলেও জানান তিনি।

স্থানীয় সরকার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব ড. আবু নাসর মোহাম্মদ আবদুল্লাহ গণমাধ্যমে বলেন, বিধি অনুযায়ী অভিযোগ পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তবে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের প্রশ্ন, অভিযোগ পাওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হলেও এরই মধ্যে বিতর্কিত জ্যেষ্ঠতার তালিকা প্রকাশ করা হলো কেন? বিশেষ করে ২০২৪ সালের খসড়ায় ১৯৯ নম্বরে থাকা একজন কর্মকর্তার অবস্থান কয়েক মাসের ব্যবধানে ৬৮ এবং পরে ৪০ নম্বরে উঠে আসার ব্যাখ্যা কী—সেই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তরও চান তারা।

তাদের আশঙ্কা, এভাবে জ্যেষ্ঠতার তালিকা পরিবর্তন করা হলে সামনে পদোন্নতিতেও এর প্রভাব পড়বে। আর বিধি লঙ্ঘন করে পদোন্নতি দেওয়া হলে ২০০৪ সালের আগের কয়েকটি ব্যাচের প্রকৌশলীরা প্রধান প্রকৌশলী হওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে পারেন।

এলজিইডির প্রকৌশলীদের একাংশ বলছেন, একটি প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ভিত্তি হলো স্বচ্ছতা ও জ্যেষ্ঠতার নিরপেক্ষতা। সেখানে তথ্য পরিবর্তন করে কাউকে সামনে আনা হলে শুধু কয়েকজন কর্মকর্তা নন, পুরো প্রতিষ্ঠানের ওপরই এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
Error!: SQLSTATE[42000]: Syntax error or access violation: 1064 You have an error in your SQL syntax; check the manual that corresponds to your MySQL server version for the right syntax to use near ') ORDER BY entry_time DESC,id DESC LIMIT 4' at line 4