বিশ্বে পারমাণবিক যুদ্ধের ঝুঁকি বাড়ছে, সতর্কতা গবেষকদের

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, ঢাকা টাইমস
  প্রকাশিত : ৩০ মার্চ ২০২৬, ০৯:৪৪
অ- অ+

বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক অস্ত্রের ঝুঁকি নতুন করে বাড়ছে বলে সতর্ক করেছেন গবেষকরা। অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার দুর্বলতা, প্রযুক্তির দ্রুত উন্নয়ন এবং ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে। বিশ্বের অনেক দেশের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়ে পড়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে৷ গবেষণা প্রতিষ্ঠান স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এসআইপিআরই) বলছে, অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ বা নজরদারি খুব দুর্বল হয়ে পড়েছে৷ পারমাণবিক অস্ত্রের বিষয়ে যখন উদ্বেগ বাড়ছে, তখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং মহাকাশ প্রযুক্তি প্রসারের ফলে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে যোগ হয়েছে নতুন মাত্রা৷

পৃথিবীর মাত্র ৯টি দেশের হাতে এই মুহূর্তে ১৪ হাজার ৯০০ পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে। আর এই বিপুল অস্ত্রসম্ভারের ৯৩ শতাংশেরই মালিক যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া। যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞানীদের সংগঠন ফেডারেশন অব আমেরিকান সায়েন্টিস্টস এই তথ্য জানিয়েছে।

পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, চীন, উত্তর কোরিয়া, ভারত, পাকিস্তান ও ইসরায়েলে। স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের পর ব্যাপক নিরস্ত্রীকরণের পরও যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার কাছে এখনো হাজার হাজার পারমাণবিক অস্ত্র রয়ে গেছে।

পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, ফ্রান্স, ও যুক্তরাজ্য পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (এনপিটি) স্বাক্ষর করেছে। ইসরাইল পারমাণবিক অস্ত্র থাকার কথা স্বীকার না করলেও অনেকেরই ধারণা দেশটির কাছে ৮০টির মতো পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে।

পারমাণবিক অস্ত্রের সঠিক সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে দ্বিমত রয়েছে। কেউ কেউ মনে করে ওপরের হিসাবের তুলনায় এ ধরনের অস্ত্রের সংখ্যা বাস্তবে আরও বেশি। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী পারমাণবিক ক্ষমতাধর ৯টি দেশের কাছে মোট ১৫ হাজার ৩৯৫টি অস্ত্র রয়েছে। ২০১৫ সালে এই সংখ্যা ছিলো ১৫ হাজার ৮৫০।

১৯৪৫ সালে বিশ্বে প্রথমবারের মত পারমাণবিক বোমা তৈরি করে যুক্তরাষ্ট্র। এর চার বছর পর ১৯৪৯ সালে রাশিয়া পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়। ২০০৬ সালে সর্বশেষ উত্তর কোরিয়া পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষা করে।

ন্যাটো চুক্তি অনুযায়ী ইউরোপের পাঁচটি দেশে পারমাণবিক অস্ত্র মোতায়েন রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র।

অর্থনৈতিক অবরোধ তুলে নেওয়ার আন্তর্জাতিক চুক্তির পর পারমাণবিক কর্মসূচি ঠেকে ফিরে আসতে সম্মত হয় ইরান।

গত বছর জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তারো আসো বলেন, পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কারিগরি জ্ঞান ও সক্ষমতা থাকলেও এমনটা করার পরিকল্পনা নেই দেশটির।

বিশ্বব্যাপী সামগ্রিকভাবে পারমাণবিক অস্ত্রের সংখ্যা কমলেও তথ্য থেকে দেখা যাচ্ছে কোন দেশই নিকট ভবিষ্যতে পুরোপুরিভাবে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের জন্য প্রস্তুত নয়।

বর্তমানে বিশ্বের নয়টি দেশের হাতে পরমাণু অস্ত্র রয়েছে৷ এর মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি দেশ পরমাণু কর্মসূচির আধুনিকায়ন চালিয়ে যাচ্ছে৷ এই আধুনিকায়নের মধ্যে রয়েছে, তাদের হাতে থাকা বর্তমান অস্ত্রগুলোর উন্নয়ন এবং এতে আধুনিক প্রযুক্তি যুক্ত করা৷

স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ২০২৫ সালে প্রকাশিত অনুসন্ধানে এই তথ্য উঠে এসেছে৷ ইয়ারবুক ২০২৫ শীর্ষক প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, ১৯৮০ সালের মাঝামাঝি সময়ে বিশ্বব্যাপী নিউক্লিয়ার ওয়্যারহেড, বোমা এবং শেলের সংখ্যা ছিল ৬৪ হাজার৷ বর্মানে এই সংখ্যা ১২ হাজার ২৪১৷ কমে আসার এই প্রবণতা এখন উল্টো দিকে ঘুরছে বলে প্রতিবেদনটিতে আশঙ্কা করা হয়৷

সংস্থাটির পরিচালক ড্যান স্মিথ ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘বর্তমানে পারমাণবিক অস্ত্রের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, এই অস্ত্রের সংখ্যা কমিয়ে আনার পদক্ষেপের বিষয়টি আর থাকছে না৷''

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, তিনি ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোকে "ধ্বংস করে দিয়েছেন"। তবে, এসব হামলার প্রকৃত প্রভাব এবং এতে ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পরিকল্পনা কতটা পিছিয়ে গেল, তা নিয়ে এখনো প্রশ্ন রয়ে গেছে।

১৯৯১ সালে সোভিয়ত ইউনিয়নের পতন এবং শীতল যুদ্ধ অবসানের পর থেকে পরমাণু অস্ত্র কমিয়ে আনার হারের চেয়ে নতুন করে তৈরি করার হার বেড়েছে৷ এদিকে পরমাণু অস্ত্রধারী দেশগুলোর মধ্যে এই অস্ত্রের আধুনিকায়নের বিষয়টি সাধারণ হলেও, স্মিথ মনে করেন, অ্যামেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার দ্বিতীয় মেয়াদের সময় থেকে এই প্রক্রিয়াটি তীব্রতর হয়েছে৷ তাছাড়া এই সময়ে নতুন প্রযুক্তির মিসাইল এবং বোমা বহনের খাতেও বিনিয়োগ বাড়ছে৷

স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষকেরা জানান, ২০২৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত বিশ্বে পারমাণবিক বোমার সংখ্যা আনুমানিক ১২ হাজার ২৪১টি৷ এর মধ্যে নয় হাজার ৬১৪টি রয়েছে সামরিক বাহিনীর ভাণ্ডারে৷ এগুলো হয় কোনো মিসাইলে যুক্ত করা রয়েছে, অথবা সক্রিয় কোনো বেস স্টেশনে রয়েছে৷ কিংবা কেন্দ্রীয় গুদামে রয়েছে, যেখান থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী মোতায়েন করা যেতে পারে৷

এদিকে আনুমানিক তিন হাজার ৯১২টি বোমা মিসাইল বা এয়ারক্রাফটে যুক্ত করা রয়েছে৷ প্রায় দুই হাজার একশ বোমা ব্যালাস্টিক মিসাইলে যুক্ত করা রয়েছে, যেন জরুরি অপারেশনের প্রয়োজনে ব্যবহার করা যায়৷ মিসাইলে বা এয়ারক্রাফটে যুক্ত থাকা বোমাগুলোর বেশিরভাগই রাশিয়া কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের হাতে৷ তবে আরেক পারমাণবিক শক্তিধর দেশ চীনও কিছু বোমা মিসাইলে যুক্ত করে রাখতে পারে বলে অনুমান করা হচ্ছে৷

গবেষকেরা বলছেন, বিশ্বের অনেক দেশই এখন পারমাণবিক বোমা বানানোর কথা বিবেচনা করছে, কিংবা বিধ্বংসী এই অস্ত্র নিজেদের কাছে রাখতে চাইছে৷ নিউক্লিয়ার শেয়ারিং চুক্তির মাধ্যমে এমনটা হতে পারে৷ উদাহরণ হিসেবে রাশিয়া-বেলারুশের কথা বলা যেতে পারে৷ ধারণা করা হচ্ছে, বেলারুশে পারমাণবিক অস্ত্র স্থাপন করেছে রাশিয়া৷ তাছাড়া ইউরোপের অনেক দেশই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক বোমা নিজেদের দেশে স্থাপন করে রাখার ইচ্ছা পোষণ করছে বলে জানা যায়৷

২০০৭ সালে জার্মানির মিউনিখে অনুষ্ঠিত নিরাপত্তা সম্মেলনে দেওয়া বক্তৃতায় রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুটিন যুক্তরাষ্ট্র প্রভাবিত বিশ্বব্যবস্থার উপর নির্ভর না করার কথা জানান৷ সেইসাথে পূর্বদিকের দেশগুলোতে ন্যাটোর বিস্তৃতির বিষয়ে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি প্রদর্শন করেন পুটিন৷

এমন হুমকি সত্ত্বেও ২০০৯ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণের কথা বলেন৷ চেক রিপাবলিকের রাজধানী প্রাগ শহরে দেওয়া এক বক্তৃতায় ওবামা বলেন, ‘‘স্নায়ুযুদ্ধের সময় থেকে আসা সবচেয়ে ভয়ঙ্কর জিনিস হলো পারমাণবিক অস্ত্র৷'' এমন উক্তি অবশ্য সেসময় তাকে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেতে সহায়তা করে৷

তিনি বলেন, ‘‘পারমাণবিক অস্ত্রবিহীন একটি বিশ্ব গড়ে তুলতে শক্তিশালী পদক্ষেপ নেবে যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়ার সাথে একটি ‘স্ট্র্যাটেজিক রিডাকশন ট্রিটি' নামে চুক্তি করা হবে৷'' অবশ্য স্বাক্ষরের পর চুক্তিটি ২০১১ সালে কার্যকর হয়৷

২০২২ সালে রাশিয়া ইউক্রেনে হামলা চালানোর পর বাইডেন প্রাশাসনের প্রকাশিত নিউক্লিয়ার রিভিউতে দেখা যায়, পারমাণবিক অস্ত্র আধুনিকীকরণের বিষয়টি অগ্রাধিকার দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র৷ এমন অবস্থার প্রেক্ষিতে ২০২৩ সালে পুটিন ওবামার সময়ে করা চুক্তি থেকে সরে আসতে একটি আইন পাশ করে৷

গবেষক স্মিথের মতে, ২০০৭-২০০৮ সাল থেকে শুরু করে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ধীরে ধীরে নিরাপত্তাহীণতার জোয়ার গড়ে উঠতে থাকে এবং ২০২২ সালে তা আছড়ে পড়ে৷

স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের মতে, চীনের কাছে বর্তমানে অন্তত ছয়শ পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে এবং অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় চীন দ্রুত গতিতে তার পারমাণবিক অস্ত্রের ভাণ্ডার প্রসারিত করছে৷

গবেষণা প্রতিষ্ঠানটির অনুমান, ভারতও ২০২৪ সালে পারমাণবিক অস্ত্রের ভাণ্ডার কিছুটা সমৃদ্ধ করেছে৷ একই কাজ করছে পাকিস্তানও৷ পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান জড়ো করছে দেশটি৷

ইসরায়েল অবশ্য নিজেদের পারমাণবিক অস্ত্রের বিষয়ে কখনোই স্পষ্ট তথ্য দেয়নি৷ তবে পারমাণবিক অস্ত্রের ভাণ্ডার আধুনিকায়ন করছে দেশটি- এমন সন্দেহ গবেষকদের৷

(ঢাকাটাইমস/৩০ মার্চ/আরজেড)

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
গুলশানে নিষিদ্ধ আ. লীগের মিছিলে অংশ নেওয়া ৩২ নেতা-কর্মী গ্রেপ্তার
ডেঙ্গু প্রতিরোধে তরুণদের সপ্তাহে এক ঘণ্টা সময় দেওয়ার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর
দেশের বাজারে বাড়লো স্বর্ণের দাম
পদ্মায় পানি বেড়ে ৩ জেলায় বন্যা, পানিবন্দি লক্ষাধিক মানুষ