সাংবাদিক সমাজ নিজ অধিকারের জন্য দাঁড়াতে শঙ্কিত

সঠিকভাবে খুঁজলে দেশে শতাধিক সাংবাদিক সংগঠন পাওয়া যাবে। কিন্তু আপনি কখনোই দেখবেন না, এই সংগঠনগুলো সাংবাদিকদের অধিকার নিয়ে সংঘবদ্ধভাবে একাট্টা হয়েছে।
সাংবাদিকদের অধিকার? এ আবার কেমন ব্যাপার? তাই না?
সাংবাদিকতা এমন একটা পেশা, যা অনেকটা নেশার মতো। যারা সত্যিই এই পেশাটাকে গুরুত্বসহকারে ধারণ করেন এবং জনস্বার্থে চালিয়ে যেতে চায়, তাঁরা বেশ অগোছালো ধরনের হন। কারণ টাকা উপার্জনই তাঁদের কাছে সাংবাদিকতার মূল উদ্দেশ্য হয়না; জীবিকা নির্বাহের জন্য একটা অবলম্বন প্রয়োজন, সেই চাহিদা থেকেই তাঁরা এটাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, এই গোত্রের সাংবাদিকের সংখ্যা একেবারেই নগণ্য। আমি কোনো অনুমানের ভিত্তিতে এ দাবি করছি না; গত কয়েক বছর সাংবাদিকতা পেশায় আমার বিচরণে মেট্রোপলিটন, শহর, মফস্বল, গ্রাম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিভিন্ন সাংবাদিকের সঙ্গে দীর্ঘ আলাপ ও পরিচয়ের সূত্রেই এ কথা লিখছি।
তাই এই গোত্রের সাংবাদিক যারা আছেন, তাঁরা পেশাটিকে সর্বোচ্চ সম্মান দিয়ে পালন করার চেষ্টা করেন; ফলে সবচেয়ে বেশি ভুগতে হয় তাঁদেরই। কারণ ফরমায়েশি কোনো কাজ বা নীতিবিরুদ্ধ কোনো কিছুর সঙ্গে আপনি তাঁদের জড়াতে পারবেন না—পারবেন না মানে একেবারেই না। তাঁরা মরে যাবেন, তবু নীতির সঙ্গে আপস করবেন না।
আপনি তাঁদের কোনো সংগঠনে দেখবেন না, কারণ এসবের ধারেকাছে তাঁরা ঘেঁষেন না। বড় মিডিয়া আউটলেটে স্টার বা তারকা সাংবাদিক পাবেন বটে, কিন্তু নিজের নীতির সওদা করে না—এমন সাংবাদিক খুঁজে পাওয়া বেশ দুরূহ। আর বিলিয়নেয়ার মালিকপক্ষ ঠিক এই সুযোগটাই কাজে লাগায়।
তারা ভালো করেই জানে, প্রধান সম্পাদক বা প্রধান নির্বাহীকে দেওয়া ৩–২০ লাখ টাকার মাসিক বেতন তো সবাইকে দিতে হয় না; হাতে গোনা কয়েকজন সিনিয়রের নিয়মিত ৮০ হাজার–১.৫ লাখ টাকা বেতন দিলেও মাঝারি সারির ও জুনিয়র সাংবাদিকদের বেতন দিতেই তাদের আপত্তি। অনেক মিডিয়া হাউস তো সরাসরি বলে দেয়, “ম্যানেজ করে নিতে।” আর এ কারণেই ইদানিং বিশ্ববিদ্যালয়-শিক্ষিত সাংবাদিকদের এই পেশায় খুব বেশি আসতে দেখবেন না।
এই বিলিয়নেয়ার সংবাদপত্র মালিকরা ৪০০–৮০০% ট্যাক্স দিয়ে নিত্যনতুন মডেলের গাড়ি আমদানি করতে পারেন, প্রাইভেট জেট ভাড়া করে দুনিয়া দাপাতে পারেন; কিন্তু সাংবাদিকদের বেতনটা দিতে পারেন না।
কিন্তু আমাদের দেশের মেরুদণ্ডহীন সাংবাদিক সমাজ এই মালিকপক্ষের জন্য যথার্থ। নিজ অধিকারের জন্য যারা দাঁড়াতে শঙ্কিত, যারা নীতি-নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে রীতিমতো মালিকপক্ষের দাসে পরিণত হয়েছে, তাদের কাছ থেকে আপনি আর কীই বা আশা করতে পারেন? যাদের কলম সত্যের বদলে চলে মালিকপক্ষের চাপিয়ে দেওয়া ন্যারেটিভে, আর জেনেশুনে জনসাধারণকে ভুল তথ্যের স্রোতে ভাসিয়ে দেয়; যখন তাদের ওপরই খড়্গ নেমে আসে, তখন নীরবতায় নিজেকে বিসর্জন দেওয়া ছাড়া তাদের সামনে আর কিছু করার থাকে না।
লেখক: অনুসন্ধানী সাংবাদিক
(ঢাকাটাইমস/১২ সেপ্টেম্বর/আরজেড)
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













