সংবাদ নয়, সময়ের ভাষ্য

শামসুল আলম
  প্রকাশিত : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:১৩
অ- অ+

রাষ্ট্রও ছুটছে, মানুষও ছুটছে—কেউ যেন কারও জন্য দাঁড়িয়ে নেই। রাষ্ট্রের হাতে উন্নয়নের নকশা, ঋণচুক্তি ও সংস্কারের খাতা; মানুষের হাতে বাজারের থলে, মাসের হিসাব আর আগামীকালের চিন্তা। মজার ব্যাপার হলো, দুজনেরই গন্তব্য প্রায় এক—একটু স্বস্তি। সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক সূচকে সেই স্বস্তির আভাসও মিলছে: মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমেছে, রেমিট্যান্স প্রবাহ ধরে রাখার উদ্যোগ জোরদার হচ্ছে, বৈদেশিক মুদ্রার অবস্থাও আগের চেয়ে স্বস্তিদায়ক। অর্থাৎ গাড়ি চলছে—এখন দরকার চালক, যাত্রী ও রাস্তা যেন পরস্পরের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলে।

কিন্তু মানুষের দৌড়ের সবচেয়ে বড় বাধা প্রায়ই কোনো মহাসড়কে নয়, বাজারের মুদি দোকানে। কাঁচামরিচ, সুগন্ধি চাল, চিনি, মাংস ও নানা মসলার অস্বাভাবিক দাম নিয়ে যে আলোচনা চলছে, তাতে বোঝা যায়—কাগজে অর্থনীতির উন্নতি আর রান্নাঘরের অর্থনীতি সবসময় একই গতিতে হাঁটে না। বাজার তদারকিতে টাস্কফোর্সের অভিযান চলছে; এখন তার সুফলটি যেন খুচরা বাজারের থলিতেও পৌঁছায়। বাজারের এই অদৃশ্য দৌড়ে সিন্ডিকেট নামের প্রাণীটি বড় চঞ্চল—তাকে ধরতে হলে শুধু অভিযান নয়, সরবরাহব্যবস্থা, প্রতিযোগিতা ও নিয়মিত নজরদারিরও দরকার। নাগরিকের প্রত্যাশা খুব বেশি নয়; তিনি শুধু চান, বাজারে গিয়ে যেন মনে না হয় তিনি ভুল করে অর্থনীতির কোনো পরীক্ষার হলে ঢুকে পড়েছেন।

অন্যদিকে রাষ্ট্রের দৌড়ের আরেকটি ছবি বেশ আশাব্যঞ্জক। বাংলাদেশের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্পে ফরাসি উন্নয়ন সংস্থা AFD-এর সঙ্গে ৩০৩ মিলিয়ন ডলারের ঋণচুক্তি হয়েছে। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগিতার এই আস্থা আমাদের জন্য যেমন সুযোগ, তেমনি দায়িত্বও—ঋণ মানে শুধু টাকা পাওয়া নয়, সময়মতো প্রকল্প শেষ করা, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করা এবং মানুষের জীবনে তার ফল পৌঁছে দেওয়া। একই সময়ে রপ্তানিমুখী শিল্প, বিশেষ করে পোশাক খাতে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করার বিষয়টি সামনে এসেছে। সম্পাদকীয়গুলোও বন্ধ থাকা তেল ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র দ্রুত চালুর প্রয়োজনীয়তার কথা বলছে। কারণ কারখানার চুলা নিভে গেলে শুধু কারখানা অন্ধকার হয় না; রপ্তানি, কর্মসংস্থান এবং শেষ পর্যন্ত ডলারের প্রবাহেও তার ছায়া পড়ে।

ব্যাংকিং খাতেও তাই দৌড়টা একটু গোছানো দরকার। রেমিট্যান্স ধরে রাখা, ডলারবাজারে স্থিতি আনা এবং খেলাপি ঋণ আদায়ে কঠোর হওয়ার উদ্যোগ একই অর্থনীতির তিনটি দিক। বিদেশে থাকা মানুষ তাঁর ঘামের টাকা দেশে পাঠাচ্ছেন—এটি অর্থনীতির জন্য আশীর্বাদ; সেই টাকা যেন দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহৃত হয়, সেটি রাষ্ট্র ও ব্যাংকিং ব্যবস্থার দায়িত্ব। আর যে ঋণ ফেরত আসে না, তার বোঝা শেষ পর্যন্ত কোনো না কোনোভাবে সাধারণ মানুষের ঘাড়েই পড়ে। সুতরাং আর্থিক শৃঙ্খলা আসলে কাগজের হিসাব নয়; এটি মানুষের সংসারেরও হিসাব।

জনপ্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা নিয়েও একই কথা। জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা মানে কেবল বড় কোনো ঘোষণা নয়; একজন নাগরিক থানায় গিয়ে, অফিসে গিয়ে কিংবা কোনো সরকারি সেবা নিতে গিয়ে যেন অনুভব করেন—ব্যবস্থাটি তাঁর জন্যই তৈরি। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, সৎ ও পেশাদারভাবে কাজ করার পরিবেশ তাই প্রশাসনের জন্য যেমন প্রয়োজন, সরকারের জন্যও তেমনি জরুরি। রাষ্ট্রযন্ত্রকে প্রতিদিন কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে লাভ নেই; বরং যন্ত্রটি যাতে ঠিকমতো চলে, সেই তেল-চাকা-নাটবল্টুগুলো ঠিক আছে কি না—সেটি দেখা বুদ্ধিমানের কাজ। গাড়ি থামিয়ে তার ইঞ্জিনের বিচার করতে করতে যেন গন্তব্যটাই হারিয়ে না যায়।

সামাজিক মাধ্যমে আরেক ধরনের দৌড় চলছে—সত্যের সঙ্গে AI-এর দৌড়। মার্কিন রাজনীতিকে ঘিরে ডোনাল্ড ট্রাম্পের চাঁদের মালিকানা দাবি এবং তার পর হোয়াইট হাউজের AI-নির্মিত ভিডিও নিয়ে বিশ্বজুড়ে হাসি-তামাশা কম হয়নি। রাজনীতির লোকেরা আগে পৃথিবী ভাগাভাগি করতেন; এখন চাঁদ নিয়েও প্রতিযোগিতা শুরু হলে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা নিশ্চয়ই একটু চিন্তিত। আসল শিক্ষা অবশ্য হাসির আড়ালে—AI এখন শুধু ছবি বানাচ্ছে না, জনমত ও রাজনৈতিক আলোচনার বাস্তবতাকেও প্রভাবিত করছে। তাই ভবিষ্যতের নাগরিকের হাতে বাজারের থলের পাশাপাশি আরেকটি জিনিসও থাকা দরকার—সন্দেহ করার ক্ষমতা।

বিশ্বও থেমে নেই। ইরানের জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি ও হরমুজ প্রণালী ঘিরে উত্তেজনা আবার মনে করিয়ে দিচ্ছে, পৃথিবীর এক প্রান্তের ভূরাজনীতি অন্য প্রান্তের বাজারে গিয়ে কাঁচামরিচের দামের সঙ্গে বসে পড়তে পারে। ইন্দোনেশিয়ার আনাক ক্রাকাতোয়া আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত, আর ইউরোপের রাজনীতিতে কট্টর ডানপন্থার উত্থান—সব মিলিয়ে পৃথিবীও যেন একই সঙ্গে বহু দিকে ছুটছে। আমাদের জন্য শিক্ষা একটাই: নিজের অর্থনীতি, জ্বালানি, খাদ্য ও প্রতিষ্ঠানকে যতটা সম্ভব স্থিতিশীল রাখা। ঝড় থামার অপেক্ষায় বসে থাকা নয়; বরং নৌকাটিকে শক্ত করে বাঁধা।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি তাই রাষ্ট্র কোথায়, জনগণ কোথায়—এমন নয়। দুজনেই একই রাস্তায়। রাষ্ট্রের গতি যদি উন্নয়ন ও সংস্কারের দিকে থাকে, জনগণের গতি যদি স্বস্তি ও নিরাপত্তার দিকে থাকে, তবে মাঝখানের দূরত্বটুকু কমিয়ে আনাই আসল কাজ। রাষ্ট্র মানুষের আগে ছুটে গিয়ে তাকে হারিয়ে ফেলবে না, মানুষও রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা হারিয়ে পথের বাইরে চলে যাবে না—এই ভারসাম্যটুকুই সুস্থ সমাজের লক্ষণ। রাষ্ট্রও ছুটুক, মানুষও ছুটুক; শুধু দুজনের গন্তব্য যেন একই থাকে—একটি নিরাপদ, স্বস্তির এবং সম্ভাবনাময় বাংলাদেশ।

লেখক: সাবেক সিনিয়র সচিব

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
Error!: SQLSTATE[42000]: Syntax error or access violation: 1064 You have an error in your SQL syntax; check the manual that corresponds to your MySQL server version for the right syntax to use near ') ORDER BY entry_time DESC,id DESC LIMIT 4' at line 4