বাবাকে হারিয়ে সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা আনসার খান পাঠানের আবেগঘন স্মৃতিচারণ

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার সমন্বয়ক ও সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা আনসার উদ্দিন খান পাঠানের পিতা মোহাম্মদ আলী খান পাঠান মারা গেছেন। গত ২৩ আগস্ট সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলার বৈরাটি ইউনিয়নের কাজলা গ্রামের নিজ বাড়িতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৯০ বছর।
বাবার মৃত্যুর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে নিয়ে আবেগঘন স্মৃতিচারণ করেছেন আনসার উদ্দিন খান পাঠান। পোস্টে তার বাবার জীবন, মূল্যবোধ ও সন্তানদের মানুষ করার সংগ্রামের কথা তুলে ধরেছেন তিনি।
ঢাকা টাইমস পাঠকদের জন্য তার ফেসবুক পোস্টটি হুবহু তুলে ধরা হলো:
আমার বাবা মোহাম্মদ আলী খান পাঠান , গত ২৩ আগষ্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা সাড়ে ৭ টায় তাঁর নিজ গ্রাম কাজলায় ৯০ বছর বয়সে বয়সজনিত জটিলতায় মৃত্যুবরণ করেন। পরিণত বয়সই বলতে হবে কিন্তু তাঁর অন্তর্ধানের শোকটা সন্তান হিসেবে কোন যুক্তিতেই সামান্যতম কমাতে পারছি না।
যে গ্রামে তাঁর জন্ম , ব্রিটিশ ,পাকিস্তান আর বাংলাদেশ , তিন পতাকার তলে ৯ দশক কাটিয়ে সেই গ্রামেরই আকাশ-হেলানো শ্যামল প্রান্তরের এক কোণায় 'পূবের বন্দে'র শিমূল গাছের তলায় এক জোনাক-জ্বলা কবরে শুয়ে আছেন।
গ্রামের এক অতি সাধারণ মানুষ ছিলেন তিনি, লেখাপড়া তাঁর তেমন ছিল না কিন্তু সুখ স্বাচ্ছন্দ আর দীর্ঘ নিরোগ জীবন যাপনের মন্ত্র তাঁর জানা ছিল দৈবক্রমে।
সেইকালে সেই দূর্গম গ্রামে থেকেও তাঁর পণ ছিল সন্তানরা যেন লেখাপড়া করে। তিনি নিজে ৬ বছর বয়সে পিতা হারান , তাঁর বড় তিন ভাই লেখাপড়া শিখে কলকাতা, রাজশাহী আর ঢাকায় সম্মানজনক চাকুরিতে বহাল হলেও পিতাহীন তাঁকে থাকতে হয় গ্রামেই, বিধবা মায়ের সাথে । সেই বঞ্চনাই একটি মাত্র জেদের দিকে তাঁকে ঠেলে দিয়েছিল , সন্তানদের পড়াশোনা করাতে হবে। তাঁর একান্ত চেষ্টা আর শ্রমে তিন ভাইবোন আমরা গ্রাম থেকে এসে বিরাট শহরে প্রতিকূলতার সাথে যুদ্ধ করতে করতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী নেই, বাকিরাও পড়াশোনা করেছে সাধ্যমত।
আমার বাবাকে অন্তত ৮০ বছর বয়স পর্যন্ত কখনো অসুস্থ হতে দেখিনি , কোনদিন অষুধপত্তর নিতে দেখিনি। বাবার জীবনে কয়েকটি অদ্ভুত গুণ দেখেছি। দীর্ঘ নিরোগ জীবনলাভে সেসব গুণের চর্চার বড্ড প্রয়োজন দেখি। শারীরিক পরিশ্রম , পরিমিত সময়মাফিক খাবার , অখন্ড ঘুম , উৎকন্ঠাহীন সময়, চিন্তায়-কথনে পজিটিভিটি , এসবই ছিল বাবার জীবনাচারের লক্ষনীয় দিক। এসবের সুফল হিসেবেই হয়ত ডায়াবেটিস , উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ ,স্থূলতা , স্মৃতিভ্রম বা জটিল কোন ব্যাধি শরীরে দীর্ঘকাল বাসা বাঁধার ফুসরত পায়নি।
তাঁকে কখনো কোনকিছু না পাওয়ার জন্য আফসোস করতে দেখিনি। আমার নিজের চাকুরিতে প্রায় দুই দশকের বিপর্যয়কালেও তিনি আমাকে সাহস যুগাতেন, , আশাহত হতে নিষেধ করতেন। আমার দূর্ভাগ্যের জন্য দায়ীদের আমি নিজে বিরবির করে গালি দিলেও তিনি কখনো তাতে সায় দিতেন না। অন্যের ভালত্বে বা প্রাপ্তিতে কখনো ঈর্ষান্বিত হতে দেখিনি। কারো প্রতি রাগ , ক্ষোভ , ঘৃণা আর দু:শ্চিন্তা পোষে রাখতে দেখিনি। সবকিছুতেই সবসময়ই 'ভাল আছি'। যা আছে আমার কাছে তাই যথেষ্ট আর কিছুর প্রয়োজন নেই, চাওয়া পাওয়া ছোট হলে শান্তি দীর্ঘ হয় এই তাঁর বিশ্বাস।
নিজ গ্রামের মাঠ প্রান্তর, খালবিল, গাছপালা , প্রাণীকুল , আত্মীয় , মসজিদ, এসবেই তাঁর পরম শান্তি , এর বাইরের জগত তাঁকে টানতো না। ঢাকা আর ঢাকার বাইরে নামকরা শহরে আমার কর্মস্থলে বেড়িয়ে যাওয়ার আমন্ত্রণ তিনি প্রত্যাখ্যান করতেন এই বলে ' 'আমি তোমার কাছে বেড়াতে গিয়ে যত আনন্দ পাব তার চেয়ে বেশী পাব যদি সময় করে তুমি আমার কাছে একটুখানি আসতে পার।' অগত্যা তাই করতে হত আমাকে।
কবি Alexander Pope এর Ode on Solitude এর সেই বিখ্যাত কয় লাইনের কথা মনে পড়ে...
Happy the man, whose wish and care
A few paternal acres bound,
Content to breathe his native air,
In his own ground.
কবিতার শেষটায় ছিল...
Thus unlamented let me die;
Steal from the world, and not a stone
Tell where I lie.
একজন সুখী আর দীর্ঘজীবী মানুষকে সবুজ ঘাসের তলায় শুইয়ে দিয়ে এলাম। অনন্তলোকেও তাঁর সুখ আর আনন্দ অব্যাহত থাকুক, সন্তান হিসেবে এই আমার প্রার্থনা।
বন্ধু ,সজন , শুভানুধ্যায়ী , সহকর্মী আর আত্মীয় যাঁরা ফোন করেছেন, ম্যাসেজ দিয়েছেন, বিভিন্ন গ্রুপে, সামাজিক মাধ্যমে আমার বাবার মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন, শেষ যাত্রার আনুষ্ঠানিকতায় সশরীরে হাজির হয়েছেন তাঁদের সকলের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা। অনেককে আলাদা করে উত্তর দিতে পারিনি , ক্ষমা করবেন।
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













































