এক মাস আগে
চাকরিচ্যুত ফরিদা কীভাবে এখনো ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার?

চাকরি নেই, সরকারি দায়িত্বও নেই—তবু ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) সরকারি ওয়েবসাইটে এখনো যুগ্ম কমিশনার হিসেবে রয়ে গেছে ফরিদা ইয়াসমিনের নাম। ডিএমপির ‘সিনিয়র অফিসার ডিরেক্টরি’তে প্রশাসন বিভাগের যুগ্ম কমিশনারদের তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে তার নাম ও পদবি দেখা যাচ্ছে।
গত ২৩ জুলাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে অতিরিক্ত ডিআইজি ফরিদা ইয়াসমিনকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। এরপর প্রায় এক মাস পেরিয়ে গেলেও ডিএমপির ওয়েবসাইটে তার নাম ও পদবি হালনাগাদ করা হয়নি। সরকারি একটি ওয়েবসাইটে চাকরিচ্যুত একজন কর্মকর্তার নাম ও পদবি বহাল থাকায় পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ে বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ফরিদা ইয়াসমিন পুলিশের ২০তম ব্যাচের কর্মকর্তা। ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে কারাগারে নেওয়ার দায়িত্ব পালন করছিলেন তিনি। ওই দিন পুরান ঢাকার বকশীবাজারে বিশেষ জজ আদালত থেকে বেগম খালেদা জিয়াকে নাজিম উদ্দিন রোডের পুরোনো কেন্দ্রীয় কারাগারে নেওয়া হয়।
পুলিশের নথি ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তথ্য অনুযায়ী, খালেদা জিয়াকে যে সাদা রঙের পাজেরো গাড়িতে করে কারাগারে নেওয়া হয়েছিল, সেটি ফরিদা ইয়াসমিন দাপ্তরিক কাজে ব্যবহার করতেন। গাড়িটির নম্বর ছিল ঢাকা মেট্রো ঘ-১১-৭০৪৪।
২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়ার সাজা ঘোষণার পর তাকে কারাগারে নেওয়া হয়। সেদিন ব্যবহৃত পাজেরো গাড়িটির সামনের আসনে ছিলেন তৎকালীন ডিএমপির ডিসি ফরিদা ইয়াসমিন। গাড়িটির পেছনের আসনে খালেদা জিয়ার সঙ্গে ছিলেন তাঁর গৃহকর্মী ফাতেমা বেগম। তাদের পাশে ছিলেন পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি সালমা সৈয়দ পলি। পরবর্তীতে ফরিদাকে তার কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ‘বাংলাদেশ পুলিশ পদক-বিপিএম’ দেয় তৎকালীন সরকার।
নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, কারাগারে নেওয়ার দায়িত্ব হিসেবে ২০১৮ সালের ৪ মার্চ ফরিদা ইয়াসমিন তার ব্যবহৃত পাজেরোর জন্য ৪৮৬ লিটার অকটেন বরাদ্দ নিয়েছিলেন।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ফরিদা ইয়াসমিনকে আবারও ডিএমপিতে পদায়ন করা হয়। পরে তিনি প্রশাসন বিভাগের যুগ্ম কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। গত ২৩ জুলাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করে। একই সময়ে পুলিশের আরও কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়। কিন্তু ফরিদা ইয়াসমিনের চাকরিচ্যুতির এক মাস পরও ডিএমপির ওয়েবসাইটে তার নাম ও পদবি পরিবর্তন করা হয়নি।
বর্তমানে ডিএমপির ‘সিনিয়র অফিসার ডিরেক্টরি’তে যুগ্ম কমিশনারদের তালিকায় দ্বিতীয় নামটি ফরিদা ইয়াসমিনের। ওয়েবসাইটটি নিয়মিত হালনাগাদ হলেও কেন নাম রয়ে গেছে ফরিদার, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ জানিয়ে পুলিশের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ঢাকাটাইমসকে বলেন, চাকরিচ্যুত একজন কর্মকর্তার নাম ও পদবি কীভাবে এক মাস ধরে ডিএমপির মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠানের সরকারি ওয়েবসাইটে বহাল থাকে, তা বোধগম্য নয়। তাদের মতে, সরকারি প্রজ্ঞাপনে চাকরির অবসান হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার নাম, পদবি ও দায়িত্বের তথ্য দ্রুত হালনাগাদ করা প্রশাসনিক নিয়মেরই অংশ। অথচ ফরিদা ইয়াসমিনের ক্ষেত্রে বিষয়টি এখনো সংশোধন না হওয়া দুঃখজনক ও প্রশ্নবিদ্ধ। এতে সাধারণ মানুষের কাছে ভুল তথ্য যাওয়ার পাশাপাশি ডিএমপির ওয়েবসাইটের তথ্য হালনাগাদ ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের দক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে। চাকরি নেই, অথচ সরকারি ওয়েবসাইটে এখনো যুগ্ম কমিশনার এ ধরনের ‘দুই পরিচয়’ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়, বলেন তারা।
ডিএমপির একজন উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘ওয়েবসাইট থেকে কোনো কর্মকর্তার নাম অটোমেটিকভাবে সরে যায় না, সংশ্লিষ্টদেরই তা সরাতে হয়। চাকরিচ্যুতির পরও ফরিদা ইয়াসমিনের নাম ও পদবি বহাল থাকার বিষয়টি হয়তো এখনো সংশ্লিষ্ট কারও নজরে আসেনি। তবে একজন চাকরিচ্যুত কর্মকর্তার নাম এতদিন ধরে সরকারি ওয়েবসাইটে থাকা অবশ্যই অনাকাঙ্ক্ষিত এবং দায়িত্বজ্ঞানহীন।’
পুলিশের নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১৫ সালের ১০ জুন থেকে ২০২২ সালের ১৩ জুলাই পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে ফরিদা ইয়াসমিন ডিএমপিতে দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের দমনে তার ভূমিকা ছিল এমন অভিযোগ রয়েছে।
ফরিদা ইয়াসমিনের স্বামী পুলিশ কর্মকর্তা মো. আশরাফুল ইসলামও পুলিশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি পুলিশ সদর দপ্তরের ক্রাইম মেট্রো বিভাগের অতিরিক্ত ডিআইজি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
২০১৬ সালের ৬ নভেম্বর গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে রংপুর চিনিকল-সংক্রান্ত উচ্ছেদ অভিযানের সময় আশরাফুল ইসলাম জেলার পুলিশ সুপার ছিলেন। ওই অভিযানে পুলিশের গুলিতে তিনজন সাঁওতাল নিহত হন। পরে সাঁওতালদের বসতিতে অগ্নিসংযোগের অভিযোগও ওঠে।
ওই ঘটনায় আশরাফুল ইসলামের বিরুদ্ধেও অভিযোগ উঠেছিল। তবে তাকে চাকরিচ্যুত না করে পরে অন্যত্র বদলি করা হয়। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিএনপি ও অন্যান্য বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের দমনে তার ভূমিকা ছিল এমন অভিযোগও রয়েছে।
চাকরিচ্যুতির পরও ডিএমপির ওয়েবসাইটে ফরিদা ইয়াসমিনের নাম কেন বহাল রয়েছে, সে বিষয়ে জানতে ডিএমপি কমিশনারসহ দায়িত্বশীল একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হয়। তবে তাদের কেউই ফোন ধরেননি। ফলে বিষয়টি নিয়ে ডিএমপির আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সর্বশেষ সন্ধ্যা সোয়া ছয়টায় এ রিপোর্ট পর্যন্ত ফরিদা ইয়াসমিনের নাম ও পদবি ডিএমপির ওয়েবসাইটে বহাল ছিল।
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













































