খালেদা জিয়াকে কারাগারে নেওয়া সেই ফরিদা ইয়াসমিন এখনও ডিএমপির গুরুত্বপূর্ণ পদে

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিএনপি চেয়ারপারসন (প্রয়াত) বেগম খালেদা জিয়াকে কারাগারে নিয়ে যাওয়া আলোচিত পুলিশ কর্মকর্তা ফরিদা ইয়াসমিন ডিএমপির প্রশাসন বিভাগের যুগ্ম কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর এই পদায়ন নিয়ে পুলিশের একটি অংশে আলোচনা ও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
বেগম খালেদা জিয়াকে কারাগারে নিয়ে যাওয়ার স্বীকৃতি স্বরুপ ২০ ব্যাচের কর্মকর্তা ফরিদা ইয়াসমিনকে দেওয়া হয় ‘বাংলাদেশ পুলিশ পদক-বিপিএম’।
অভিযোগ উঠেছে, আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ফরিদাকে ডিএমপিতে পদায়ন করা হয়। এরপর থেকেই তিনি ডিএমপির প্রশাসন বিভাগের যুগ্ম-কমিশনারের দায়িত্বে রয়েছেন। কারান্তরীণ ডিএমপির সাবেক কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়ার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ফরিদার মাধ্যমে পুলিশের গুরুত্বপূর্ণ অনেক তথ্য বিদেশে পলাতক সাবেক কর্মকর্তাদের কাছে চলে যাচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
জানা গেছে, তৎকালীন বিএনপি চেয়ারপারসন ও তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি মিথ্যা মামলায় পাঁচবছরের সাজা দেওয়া হয়। এদিন পুরানো ঢাকার বকশীবাজারে স্থাপিত বিশেষ জজ আদালত প্রাঙ্গণ থেকে ঢাকা মেট্রো ঘ-১১-৭০৪৪ সাদা রঙের গাড়িতে নাজিম উদ্দিন রোডের কেন্দ্রীয় কারাগারে তাকে নেয়া হয়। খালেদা জিয়াকে বহনকারী গাড়িটি ফরিদা ইয়াসমিনের দাপ্তরিক ব্যবহারের পাজেরো ছিল। ফরিদা তখন ডিএমপির উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) ছিলেন; যিনি ডিসি পদমর্যাদার হলেও পাজেরো গাড়িতে চড়তেন।
রায়ের দিন কারাগারে নেওয়ার সময় সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া বসেছিলেন গাড়ির পেছনের আসনে। তাঁর পাশে বসেছিলেন গৃহকর্মী ফাতেমা বেগম এবং তার পাশে ছিলেন পুলিশ কর্মকর্তা অতিরিক্ত ডিআইজি সালমা সৈয়দ পলি। আর পাজেরো গাড়ির সামনের আসনে ছিলেন ডিএমপির তৎকালীন ডিসি (বর্তমান যুগ্ম কমিশনার, প্রশাসন) ফরিদা ইয়াসমিন।
গত ২৮ জুন অতিরিক্ত ডিআইজি সালমা সৈয়দ পলিকে রংপুর রেঞ্জ ডিআইজির কার্যালয়ে সংযুক্ত করা হলেও ডিএমপিতে বহাল রয়েছেন ফরিদা।
সূত্র বলছে, ডিএমপিতে যখন যে কমিশনার এসেছে তাকে ম্যানেজ করে নিজের চেয়ার পোক্ত করে রেখেছেন ফরিদা। এই ফরিদার স্বামী আরেক পুলিশ কর্মকর্তা মো. আশরাফুল ইসলাম বর্তমানে পুলিশ সদরদপ্তরে ক্রাইম মেট্রো বিভাগের অতিরিক্ত ডিআইজি। আওয়ামী লীগ সরকার তাকেও বিপিএম পদক দিয়েছে।
পুলিশ কর্মকর্তা আশরাফুল ইসলাম ২০১৬ সালের ৬ নভেম্বর গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে চিনিকল-সংক্রান্ত উচ্ছেদ অভিযানের সময় জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন। ওই অভিযানে পুলিশের গুলিতে তিনজন সাঁওতাল নিহত হন এবং পরবর্তীতে সাঁওতাল পল্লীতে অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে। এসব ঘটনায় তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে।
ফরিদার স্বামী আশরাফুল
পরবর্তীতে তাকে চাকরিচ্যুত না করে খাগড়াছড়ির মহালছড়িতে ৬ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নে বদলি করা হয়। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নিজেকে বঞ্চিত পুলিশ কর্মকর্তা দাবি করে আশরাফুল ইসলাম ঢাকায় পুলিশ সদরদপ্তরে পদায়ন করিয়ে নেন। আর তার স্ত্রী নেন ডিএমপিতে।
নথিতে পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ফরিদা ইয়াসমিন ২০১৫ সালের ১০ জুন থেকে ২০২২ সালের ১৩ জুলাই পর্যন্ত ডিএমপিতে কর্মরত ছিলেন। এ সময় তিনি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে মিলে বিরোধী দলকে দমনে কাজ করেছেন বলে অভিযোগ আছে।
পুলিশের গুরুত্বপূর্ণ নথি পর্যালোচনা করে আরও দেখা গেছে, ২০১৮ সালে ৪ মার্চ ডিএমপির তৎকালীন ডিসি ফরিদা ইয়াসমিন নিজের ব্যবহৃত পাজেরোর জন্য ৪৮৬ লিটার অকটেন বরাদ্দ নিয়েছিলেন। কারণ, আগে থেকেই তৎকালীন সরকার খালেদা জিয়াকে কী সাজা দেওয়া হবে তা অবগত করেন ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়াকে। সেই অনুযায়ী প্রস্তুতিও নিতে বলা হয়েছিলো। যার অংশ হিসেবে রায় ঘোষণার আগে সব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নিয়ে বৈঠক করেন ডিএমপি কমিশনার।
ফরিদার ব্যবহৃত পাজেরোতে কারাগারে নেওয়া হচ্ছে খালেদা জিয়াকে: ফাইল ফটো
সেখানে বেগম খালেদা জিয়াকে কারাগারে নিতে নিজের গাড়ি ব্যবহারের আগ্রহ দেখান ফরিদা ইয়াসমিন। এরপরেই তেল নেয়া থেকে সবধরণের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়। নিজের গাড়ি ব্যবহার করে খালেদা জিয়াকে কারাগারে রেখে আসার পর নিজে দম্ভ করে বলতেন ‘আমি ছাত্রলীগ করা নেত্রী। আমার চেয়ার ধরে টানবে কে?’
খালেদা জিয়াকে বহনকারী সেই পাজেরো এখন কোথায়?
অনুসন্ধান বলছে, মিথ্যা মামলায় সাজা দিয়ে বেগম খালেদা জিয়াকে যেই পাজেরো গাড়িতে নেওয়া হয় সেটি ব্যবহার করতেন ডিএমপির তৎকালীন ডিসি ফরিদা ইয়াসমিন। পরবর্তীতে তিনি ডিএমপি থেকে অন্যত্র বদলি হলে গাড়িটি পুলিশ সদরদপ্তরে চলে যায়। বর্তমানে পুলিশ সদরদপ্তরে গাড়িটি রয়েছে। যাতে এখন কেউ চড়েন না।
পুলিশের একটি অংশ বলছে, বেগম খালেদা জিয়ার স্মৃতি হিসেবে গাড়িটি সংরক্ষণ করা উচিত। কারণ, এই গাড়িতে করেই খালেদা জিয়াকে মিথ্যা মামলায় সাজা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়।
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন












































