ভরা মৌসুমেও ইলিশের আকাল, কেজি ৩ হাজার ২০০ টাকা

অনলাইন ডেস্ক, ঢাকা টাইমস
  প্রকাশিত : ২২ জুলাই ২০২৬, ১০:৪৫
অ- অ+

বাংলাদেশের জাতীয় মাছ ইলিশ। মাছের রাজা ইলিশ স্বাদে যেমন অতুলনীয়, তেমনি পুষ্টিতে ভরপুর। ইলিশ মাছ শুধুমাত্র এর অনন্য স্বাদ এবং সুঘ্রাণের কারণে দেশবাসীর কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়। প্রতিবেশী ভারতের বাংলাভাষী মানুষের কাছেও ইলিশ খুবই লোভনীয় মাছ।

সামুদ্রিক মাছের মধ্যে ইলিশের আকাশচুম্বী দামের মূল কারণ হলো এর স্বাদ এবং জনপ্রিয়তা। তবে অন্যান্য অনেক মাছ আছে যেগুলোর পুষ্টিগত মান খুবই ভালো কিন্তু দাম তুলনামূলকভাবে কম।

ক্রেতার মানসিকতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় তারা সাধারণত স্বাদের জন্যই বেশি অর্থ দিতে প্রস্তুত থাকে। তবে পুষ্টিগুণের দিক থেকে যারা সচেতন, তারা হয়তো খাদ্যমানকেও মূল্যায়ন করেন। কিন্তু বেশিরভাগ ভোক্তাই স্বাদের জন্যই বেশি অর্থ খরচ করতে রাজি থাকেন।

বাজারে ইলিশের এ অস্বাভাবিক দাম অনেককে হতবাক করেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে মা ইলিশ এবং জাটকা রক্ষায় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া ছাড়া দাম নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।

একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, বেশিরভাগ ভোক্তারা যখন বাজারে কেনাকাটা করেন, তখন তারা দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয় স্বাদ এবং সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার ওপর ভিত্তি করে, পুষ্টিগুণ নিয়ে খুব বেশি ভাবেন না। স্বাদ অনেক ক্ষেত্রে মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে অন্য সব কিছুর চেয়ে এগিয়ে থাকে।

বর্তমানে ইলিশ মাছের ভরা মৌসুমে নিম্নবিত্ত তো বহুদূর, অনেক মধ্যবিত্তের পাতেও ওঠে না ইলিশ। এর মূল কারণ উচ্চমূল্য। ক্রেতাদের অভিযোগ, কোনো উৎপাদন খরচ না থাকলেও এই মাছ নিয়ে বরাবরের মতো এবারও বাজারে এক ধরনের সিন্ডিকেট সক্রিয়। তারা ইলিশ ধরা থেকে বাজারে বিক্রি পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে দাম বাড়িয়ে দেয়। ফলে পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকলেও সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে চলে যায় এই সুস্বাদু মাছ। মৎস্য অধিদপ্তরের বক্তব্যও প্রায় একই রকম। কিন্তু মাছ ধরা জেলেসহ ব্যবসায়ীদের দাবি, ইলিশ ধরতে খরচ বেশি বলে বাজারে দাম বাড়তি দেখা যায়।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে চাঁদপুরে ইলিশের সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। নদীতে জেলেদের মাছ ধরার কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় বাজারে তৈরি হয়েছে ইলিশের সংকট। এর ফলে এক কেজি ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ৩ হাজার ২০০ টাকা দরে।

মঙ্গলবার (২১ জুলাই) রাতে চাঁদপুর শহরের বড় স্টেশন মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র ও সদর উপজেলার হরিণা ফেরিঘাট সংলগ্ন মাছঘাটে ২৪ জন আড়তদার থাকলেও বর্তমানে মাছের আমদানি খুবই কম। সারাদিনে বড় আকারের ইলিশ এসেছে মাত্র প্রায় দুই মণ। সরবরাহ কম থাকায় এক কেজি ওজনের ইলিশ কেজিপ্রতি ৩ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে।

৮০০ থেকে ৯০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৮০০ টাকা কেজি দরে। অন্যদিকে ছোট আকারের ইলিশ, যেখানে ৬ থেকে ৭টি মিলে এক কেজি হয়, সেগুলোর দাম ছিল কেজিপ্রতি ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা।

চাঁদপুর মৎস্য বণিক সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক হাজী শবে বরাত সরকার বলেন, সারাদিনে বড় স্টেশন মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে প্রায় ২০ মণ ইলিশের আমদানি হয়েছে। গত এক সপ্তাহে এর চেয়েও কম পরিমাণ মাছ এসেছে।

তিনি বলেন, প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে জেলেরা নিয়মিত নদীতে যেতে পারছেন না। তবে আবহাওয়া অনুকূলে এলে মাছ ধরার কার্যক্রম স্বাভাবিক হবে। তখন ইলিশের সরবরাহ বাড়বে এবং দামও কিছুটা কমতে পারে।

পাইকারি বাজারদরের তথ্য দিয়ে তিনি জানান, এক কেজি ওজনের ইলিশ প্রতিমণ ১ লাখ ১৫ হাজার থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে। ৮০০ থেকে ৯০০ গ্রাম ওজনের ইলিশের দাম ছিল প্রতিমণ ৯০ থেকে ৯৫ হাজার টাকা। আর তিনটি মিলে এক কেজি হয় এমন আকারের ইলিশ বিক্রি হয়েছে প্রতিমণ ৪২ থেকে ৪৫ হাজার টাকায়।

চাঁদপুর মৎস্য বণিক সমবায় সমিতির সভাপতি আব্দুল বারি জমাদার মানিক বলেন, বর্তমানে ইলিশের আমদানি অত্যন্ত কম। সরবরাহ সংকটের কারণেই বাজারে দাম অনেক বেড়েছে। আবহাওয়া স্বাভাবিক হলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, সাম্প্রতিক ঝড়-বৃষ্টি ও নদীতে বৈরী পরিবেশের কারণে ইলিশ ধরা কমে গেছে। ফলে বাজারে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় দাম ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে।

চাঁদপুরের জেলা প্রশাসক জানিয়েছেন, দাম বাড়াতে ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট তৈরি করছেন, যা সরকারিভাবে মনিটর করে থামাতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে ব্যবসায়ীরা সরবরাহ কম এবং খরচ বেশি হওয়ায় দাম বাড়াতে বাধ্য হচ্ছেন বলে জানিয়েছেন।

সার্বিকভাবে ইলিশের দাম এতটা চড়া থাকার পেছনে রয়েছে সরবরাহ সংকট, চাহিদা বৃদ্ধি, সিন্ডিকেট এবং ইলিশ সংরক্ষণের যথাযথ বাস্তবায়ন না হওয়া।

বাংলাদেশে বিশ্বের মোট ইলিশের ৮০ শতাংশের বেশি আহরণ হয়। প্রতি বছর উৎপাদন বেড়েছে ৫ লাখ টনেরও বেশি। তবুও সরবরাহ ও বাজার ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম এবং সিন্ডিকেটের প্রভাবেই ইলিশের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সব মিলিয়ে ভরা মৌসুমেও ইলিশ যেন অনেকের জন্য স্বপ্নের মাছ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে মা ইলিশ ও জাটকা রক্ষায় কঠোর ব্যবস্থা এবং কার্যকর বাজার মনিটরিং ছাড়া এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।

(ঢাকাটাইমস/২২ জুলাই/আরজেড)

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
এয়ারবাসের ১০ উড়োজাহাজ কিনছে বাংলাদেশ, চুক্তি আগস্টে
এস আলম গ্রুপ পাচার করেছে সোয়া ২ লাখ কোটি টাকা, বিএফআইইউর চাঞ্চল্যকর তথ্য
দেশের সব মাদরাসায় চারটি ফুটবল দল গঠনের নির্দেশ
সবুজবাগে বিএনপির কর্মীকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা
বিশেষ প্রতিবেদন তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা