স্মরণকালের শক্তিশালী ‘এল নিনো’র আশঙ্কা, বিশ্বজুড়ে বাড়তে পারে খরা-বন্যা ও দাবানলের ঝুঁকি

প্রশান্ত মহাসাগরে তৈরি হওয়া ‘এল নিনো’ স্মরণকালের অন্যতম শক্তিশালী রূপ নিতে পারে বলে সতর্ক করেছে যুক্তরাজ্যের আবহাওয়া দপ্তর। শক্তিশালী এই প্রাকৃতিক জলবায়ু পরিস্থিতির প্রভাবে বৈশ্বিক তাপমাত্রা আরও বাড়তে পারে এবং বিভিন্ন অঞ্চলে চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি তীব্র হতে পারে।
মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের সঙ্গে শক্তিশালী এল নিনোর যোগ হলে ২০২৭ সাল রেকর্ডের সবচেয়ে উষ্ণ বছর হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। খবর বিবিসির।
যুক্তরাজ্যের আবহাওয়া দপ্তরের দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাস বিভাগের প্রধান অধ্যাপক অ্যাডাম স্কেফে বলেন, এবারের পরিস্থিতি নজিরবিহীন। তার পূর্বাভাসে এর আগে এল নিনোর এমন তীব্র সংকেত দেখা যায়নি।
আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছরের শেষ দিকে এল নিনো সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। তখন প্রশান্ত মহাসাগরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি বাড়তে পারে। ১৯৫০ সাল থেকে সংরক্ষিত তথ্য অনুযায়ী, এমন মাত্রার উষ্ণতা নজিরবিহীন হতে পারে। এমনকি এটি উনিশ শতকের পর সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনো হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
বর্তমানে ওই অঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি। সমুদ্রের প্রায় ১০০ মিটার গভীরতাতেও কোথাও কোথাও স্বাভাবিকের চেয়ে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি উষ্ণ পানি পাওয়া যাচ্ছে। বিপুল পরিমাণ এই উষ্ণ পানি এল নিনোকে আরও শক্তিশালী করে তুলতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের জলবায়ু গবেষণা প্রতিষ্ঠান বার্কলি আর্থের বিজ্ঞানী ড. জেকে হাউসফাদার বলেন, এল নিনো আরও কয়েক মাস শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ রয়েছে। ফলে এটি রেকর্ড সৃষ্টিকারী ঘটনা হতে পারে।
কিছু জলবায়ু গবেষণা প্রতিষ্ঠান এর চেয়েও শক্তিশালী এল নিনোর পূর্বাভাস দিয়েছে। কোনো কোনো পূর্বাভাসে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেশি হওয়ার আশঙ্কা করা হয়েছে। এমনটা হলে এটি গত ৫০০ বা এমনকি ১ হাজার বছরের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনো হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন হাউসফাদার।
এল নিনো একটি প্রাকৃতিক জলবায়ু ঘটনা, যা সাধারণত দুই থেকে সাত বছর পরপর দেখা দেয় এবং প্রায় এক বছর স্থায়ী হয়। প্রশান্ত মহাসাগরের ওপর পূর্ব থেকে পশ্চিমে প্রবাহিত বাণিজ্যিক বায়ু দুর্বল হয়ে গেলে বা উল্টো দিকে প্রবাহিত হলে সমুদ্রের উষ্ণ পানি পূর্ব দিকে ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে সমুদ্র থেকে বিপুল পরিমাণ তাপ বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ে। বাড়তে থাকে বৈশ্বিক তাপমাত্রা এবং পরিবর্তিত হয় বৃষ্টিপাতের ধরন।
প্রশান্ত মহাসাগরের নির্দিষ্ট একটি অঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা দীর্ঘমেয়াদি গড়ের চেয়ে অন্তত ০.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি হলে সাধারণত এল নিনো পরিস্থিতি ঘোষণা করা হয়।
বিজ্ঞানীদের মতে, এল নিনোর প্রভাব ইতোমধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের আবহাওয়ায় দেখা যাচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ার বর্ষাকালে এল নিনোর কারণে বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ার প্রবণতা দেখা দিতে পারে।
প্রশান্ত মহাসাগরের কাছাকাছি অঞ্চলগুলোতে এর প্রভাবে খরা ও দাবানলের ঝুঁকি বাড়তে পারে। উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা এবং অস্ট্রেলিয়ার কিছু এলাকায় এর প্রভাব বেশি পড়তে পারে। অন্যদিকে পেরু, ইকুয়েডর ও যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলে বাড়তে পারে বন্যার ঝুঁকি।
অতীতের এল নিনো ঘটনাগুলোতে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে কফি, চাল ও কোকোর মতো কৃষিপণ্যের উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। এতে খাদ্যের দাম বেড়েছে। ফসল উৎপাদন ও বাণিজ্যে বিঘ্ন ঘটায় বিশ্ব অর্থনীতিতেও শত শত বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়েছে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থাও চলতি মাসের শুরুতে সতর্ক করে বলেছে, এবারের এল নিনোর কারণে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর কোটি কোটি মানুষ খাদ্যনিরাপত্তার গুরুতর সংকটে পড়তে পারেন।
তবে এল নিনোর প্রভাব বিশ্বের সব অঞ্চলে এক রকম নয়। ক্যারিবীয় অঞ্চল ও গ্রীষ্মমণ্ডলীয় আটলান্টিকে বাতাসের গতিপথ পরিবর্তনের কারণে ঘূর্ণিঝড়ের প্রবণতা কমতে পারে।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এল নিনোর ঘনত্ব বা শক্তি বাড়ছে—এমন প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। তবে বিষয়টি নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে গবেষণা ও বিতর্ক চলছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এল নিনোর ঘটনা বেশি ঘটছে কি না, তা নিশ্চিত না হলেও বিজ্ঞানীদের মতে, এল নিনো এখন অপেক্ষাকৃত উষ্ণ পৃথিবীর পটভূমিতে ঘটছে। ফলে এর আবহাওয়াগত প্রভাব আরও চরম হতে পারে।
মানব কর্মকাণ্ড, বিশেষ করে জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর কারণে, উনিশ শতকের শেষভাগের তুলনায় পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ইতোমধ্যে প্রায় ১ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে।
এল নিনোর সময় সমুদ্র থেকে বায়ুমণ্ডলে বিপুল তাপ ছড়িয়ে পড়ায় বৈশ্বিক তাপমাত্রা সাময়িকভাবে আরও বেড়ে যায়। যুক্তরাজ্যের আবহাওয়া দপ্তরের জলবায়ু বিজ্ঞানী ড. নিক ডানস্টোন বলেন, এল নিনোর শীতকালীন সর্বোচ্চ অবস্থার পরের ক্যালেন্ডার বছরেই এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।
তার মতে, ২০২৭ সাল খুব সম্ভবত ২০২৪ সালকে ছাড়িয়ে রেকর্ডের সবচেয়ে উষ্ণ বছর হয়ে উঠতে পারে।
(ঢাকাটাইমস/২৩ আগস্ট/আরজেড)
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন











































