২০২৭ সালে দেখা যাবে শতাব্দীর বিরল সূর্যগ্রহণ, দিনের বেলায় নামবে গভীর অন্ধকার

আগামী বছর পৃথিবী প্রত্যক্ষ করতে যাচ্ছে বিরল ও দীর্ঘস্থায়ী এক পূর্ণ সূর্যগ্রহণ। ২০২৭ সালের ২ আগস্ট মিশরের ঐতিহাসিক শহর লুক্সরের আকাশে দিনের বেলায় নেমে আসবে গভীর অন্ধকার। পূর্ণগ্রহণের সময় সেখানে প্রায় ৬ মিনিট ২৩ সেকেন্ড সূর্য পুরোপুরি চাঁদের আড়ালে থাকবে।
নাসার তথ্য অনুযায়ী, ২১১৪ সালের আগে পৃথিবীর অন্য কোনো স্থানে এর চেয়ে দীর্ঘ সময় পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দেখা যাবে না। এ কারণে ২০২৭ সালের এই গ্রহণকে ইতোমধ্যে ‘শতাব্দীর সূর্যগ্রহণ’ হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে।
পূর্ণ সূর্যগ্রহণটি উত্তর আফ্রিকা, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তীর্ণ অঞ্চল থেকে দেখা যাবে। আটলান্টিক মহাসাগর থেকে গ্রহণের ছায়া এগিয়ে প্রথমে স্পেনের দক্ষিণাঞ্চল ও জিব্রাল্টারে পড়বে। এরপর ছায়াপথ মরক্কোর উত্তরাঞ্চল, আলজেরিয়া, তিউনিসিয়া, লিবিয়া ও মিশরের ওপর দিয়ে অতিক্রম করবে।
পরে গ্রহণের ছায়া সৌদি আরব, ইয়েমেন ও সোমালিয়া অতিক্রম করে ভারত মহাসাগরে গিয়ে শেষ হবে। পূর্ণগ্রহণের পথটির সর্বোচ্চ প্রস্থ হবে প্রায় ২৫৯ কিলোমিটার বা ১৬১ মাইল।
স্পেনের কাদিজ, মরক্কোর টাঙ্গিয়ার, আলজেরিয়ার ওরান, লিবিয়ার বেনগাজি ও সৌদি আরবের জেদ্দাসহ বিভিন্ন শহর থেকেও পূর্ণগ্রহণের বিরল দৃশ্য দেখা যাবে। তবে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় গ্রহণ দেখার সুযোগ থাকবে মিশরের লুক্সরে।
প্রাচীন মিশরের গুরুত্বপূর্ণ নগরী থিবসের ওপর গড়ে ওঠা লুক্সর বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক পর্যটনকেন্দ্র। শহরটির এক পাশে রয়েছে ভ্যালি অব দ্য কিংস এবং অন্য পাশে ভ্যালি অব দ্য কুইন্স। এই প্রাচীন স্থাপনার মাঝেই দিনের আলো কয়েক মিনিটের জন্য মিলিয়ে যাবে।
এটি হবে ১৯৯১ সালের পর স্থলভাগ থেকে দেখা সবচেয়ে দীর্ঘ পূর্ণ সূর্যগ্রহণ।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক রজার ডেভিসও লুক্সর থেকে এই গ্রহণ দেখার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তার মতে, ৬ মিনিট ২৩ সেকেন্ড পূর্ণগ্রহণের জন্য অত্যন্ত দীর্ঘ সময়। এতক্ষণ অন্ধকার থাকায় মানুষের চোখও ধীরে ধীরে ওই পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সুযোগ পাবে।
সাধারণত পূর্ণ সূর্যগ্রহণের সময় উজ্জ্বল কয়েকটি তারা ও গ্রহ দেখা যায়। এবারের দীর্ঘস্থায়ী গ্রহণে আরও বেশি মহাজাগতিক বস্তু দৃশ্যমান হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
গ্রহণ দেখার জন্য লুক্সরের অন্যতম সুবিধা হলো আগস্টে সাধারণত পরিষ্কার আকাশ থাকার সম্ভাবনা বেশি। কানাডীয় আবহাওয়াবিদ জে অ্যান্ডারসনের মতে, গ্রীষ্মকালে লুক্সরে মেঘের পরিমাণ সাধারণত খুবই কম থাকে। তবে সাহারা ও আরব মরুভূমি থেকে উড়ে আসা ধুলা দৃশ্যমানতায় কিছুটা প্রভাব ফেলতে পারে।
আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ প্রচণ্ড গরম। আগস্টে লুক্সরের দিনের তাপমাত্রা প্রায়ই ৪১ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যায়। গ্রহণের সময় তাপমাত্রা কিছুটা কমলেও ক্যামেরা ও অন্যান্য বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতির ওপর অতিরিক্ত তাপের প্রভাব পড়তে পারে।
স্থানীয় সময় সকাল ১১টা ৪০ মিনিটের পর আংশিক সূর্যগ্রহণ শুরু হওয়ার কথা। দুপুর ১টা ৫ মিনিটের দিকে পূর্ণগ্রহণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে।
লুক্সরে পর্যটকের ঢল, বাড়ছে হোটেল ভাড়া
বিরল এই মহাজাগতিক ঘটনা দেখতে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ লুক্সরে ছুটে যেতে পারেন। আর এটিই এখন বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মেঘ বা ধুলার চেয়েও পর্যটকদের অতিরিক্ত ভিড় গ্রহণ দেখার ক্ষেত্রে বড় সমস্যা তৈরি করতে পারে।
একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক মানুষ লুক্সরে জড়ো হলে হোটেল সংকট ও তীব্র যানজট তৈরি হতে পারে। এরই মধ্যে হোটেল বুকিংয়ে এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। বুকিং ডটকমের তথ্য অনুযায়ী, আগামী বছরের গ্রহণের সময় লুক্সরে প্ল্যাটফর্মটিতে থাকা ৯০ শতাংশের বেশি থাকার জায়গা ইতোমধ্যে বুক হয়ে গেছে।
অবশিষ্ট কিছু হোটেলের এক রাতের ভাড়া ২ হাজার পাউন্ডেরও বেশি, যা প্রায় ২ হাজার ৬৯৫ ডলার।
সূর্যগ্রহণকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিশেষ ভ্রমণ প্যাকেজও চালু করেছে। অধ্যাপক রজার ডেভিসের সঙ্গে নয় দিনের একটি ভ্রমণ প্যাকেজের মূল্য শুরু হয়েছে ৪ হাজার ৯৫০ পাউন্ড বা প্রায় ৬ হাজার ৬০০ ডলার থেকে। সেই প্যাকেজও পুরোপুরি বুক হয়ে গেছে।
হার্ভার্ড অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের এক সপ্তাহের বিশেষ ভ্রমণ কর্মসূচিতে জনপ্রতি খরচ প্রায় ২৬ হাজার ৯৫০ ডলার। এতে লন্ডন থেকে ব্যক্তিগত উড়োজাহাজে গিজা হয়ে লুক্সরে যাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ২০২৭ সালের এই সূর্যগ্রহণ আফ্রিকার ‘অ্যাস্ট্রো-ট্যুরিজম’ বা মহাকাশভিত্তিক পর্যটনকে আরও জনপ্রিয় করে তুলতে পারে। আলোকদূষণের কারণে বিশ্বের অনেক অঞ্চলে রাতের আকাশের নক্ষত্র ও মিল্কিওয়ে স্পষ্ট দেখা যায় না। তবে আফ্রিকার বেশ কয়েকটি অঞ্চলে এখনো তুলনামূলকভাবে অন্ধকার ও পরিষ্কার আকাশ রয়েছে।
নামিবিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকা ইতোমধ্যে অ্যাস্ট্রো-ট্যুরিজমের জনপ্রিয় গন্তব্য হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে। দক্ষিণ আফ্রিকার কারু মরুভূমির আকাশ এতটাই পরিষ্কার যে টেলিস্কোপ ছাড়াই প্রায় ২৫ লাখ আলোকবর্ষ দূরের কিছু মহাজাগতিক বস্তু দেখা সম্ভব।
সব মিলিয়ে, ২০২৭ সালের ২ আগস্টের পূর্ণ সূর্যগ্রহণ শুধু একটি বিরল মহাজাগতিক ঘটনাই নয়; প্রাচীন মিশরের ঐতিহাসিক স্থাপনার পটভূমিতে কয়েক মিনিটের এই অন্ধকার বিশ্বজুড়ে জ্যোতির্বিজ্ঞানী, পর্যটক ও মহাকাশপ্রেমীদের জন্য হয়ে উঠতে পারে এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা।
(ঢাকাটাইমস/২০ আগস্ট/আরজেড)
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন












































