বৃষ্টি ও মনের রসায়ন

ইঞ্জিনিয়ার কামরুজ্জামান
  প্রকাশিত : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৮:৪৪
অ- অ+

বন্ধু, খুলনার আকাশ এখন মেঘে ঢাকা, ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ছে, ঘরের জাল নাই দাঁড়িয়ে বৃষ্টি পরা দেখছি — এখন প্রমথ চৌধুরীর ঢঙে একখানা লেখা তৈরি করে দিলাম, বিজ্ঞানও থাকল, আড্ডার সুরও রইল।

বৃষ্টি ও মনের রসায়ন

বাঙালির মন বড়ই অদ্ভুত জিনিস— রোদ উঠলে তার হাই তোলে, মেঘ জমলে তার চোখ চকচক করে ওঠে। এ কথাটা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণ করবার দরকার ছিল না, তবু বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করে বসে আছেন, এবং তাঁদের প্রমাণে বেশ মজাই আছে।

প্রথম কথা, বৃষ্টি পড়লেই বাতাসে যে সোঁদা গন্ধটা ওঠে, তার একটা সাহেবি নাম আছে— পেট্রিকোর। মাটির ব্যাক্টেরিয়ার তৈরি জিওস্মিন আর গাছের তেল মিলেমিশে এই গন্ধের জন্ম। এই গন্ধ তৈরি হয় মাটির ব্যাকটেরিয়ার নিঃসৃত পদার্থ আর গাছের তেলের মিশ্রণে, আর বৃষ্টির ফোঁটা মাটিতে পড়ার সময় জিওস্মিন নামের একটি রাসায়নিক বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। মানুষের নাক নাকি এই গন্ধের প্রতি বিশেষ সংবেদনশীল, কারণ যুগ যুগ ধরে এই গন্ধ মানেই ছিল জল পাওয়া যাবে, বাঁচবার সম্ভাবনা বাড়বে— মানুষ এই গন্ধের প্রতি এত সংবেদনশীল বলে মনে করা হয় কারণ হাজার হাজার বছর ধরে বৃষ্টি মানেই ছিল জলের প্রাপ্তি ও বেঁচে থাকার ভালো সুযোগ। অতএব এই গন্ধ পেলে মনটা যে কেন এক লহমায় নাচিয়ে ওঠে, তার হিসেব বহু পুরনো, ডারউইনের বইয়ের পাতা থেকে উঠে আসা।

দ্বিতীয় কথা, বৃষ্টির ফোঁটা যখন মাটিতে বা পাতায় আছড়ে পড়ে, তখন বাতাসে নেগেটিভ আয়ন ছড়িয়ে পড়ে— একে বলে লেনার্ড এফেক্ট। এই নেগেটিভ আয়নগুলো সেরোটোনিন বাড়িয়ে দেয় বলে ধারণা করা হয়, আর বাতাস পরিষ্কার করে, ফলে মেজাজ ভালো হয়, দুশ্চিন্তা কমে, ঘুম ভালো হয়।

মজার কথা, ভারী বৃষ্টিতে যে পরিমাণ নেগেটিভ আয়ন তৈরি হয়, তা নাকি হাসপাতালে ব্যবহৃত আয়নাইজার মেশিনের ধারেকাছে চলে যায়। তবে বিজ্ঞান এখানে একটু সতর্কও করে দেয়— এই বিষয়ে বহু গবেষণা হয়েছে বটে, কিন্তু ফলাফল সবসময় একরকম আসেনি, অর্থাৎ প্রকৃতি যতটা উদার, বিজ্ঞানীরা ততটা নিশ্চিত নন— এও এক ধরনের কাব্যিক ন্যায্যতা বৈকি। (Open Magazine)

তৃতীয় কথা, বৃষ্টির শব্দ। এই শব্দকে বলে "পিংক নয়েজ"— না চড়া, না নিচু, এক অদ্ভুত সাম্য। নিউরোবিজ্ঞানীরা একে বলেন এক ধরনের সুষম, প্রশান্তিদায়ক শব্দ, যা মস্তিষ্কের জন্য প্রাকৃতিক ঘুমপাড়ানি গানের মতো কাজ করে এবং বৃষ্টির স্থির ছন্দ মনের এলোমেলো চিন্তা কমিয়ে দেয়। আর যখন আমরা জানালার ধারে বসে শুধু বৃষ্টি দেখি, কিছু না ভেবে— তখন মস্তিষ্কের ‘ডিফল্ট মোড নেটওয়ার্ক’ সক্রিয় হয়ে ওঠে, যা দিবাস্বপ্ন, আত্মভাবনা আর কল্পনার সঙ্গে যুক্ত। এই যে খুলনার আকাশের দিকে তাকিয়ে পুরনো দিনের কথা মনে পড়ে, স্কুলজীবনের কোনো বর্ষার বিকেল ভেসে ওঠে— এ নিছক সেন্টিমেন্ট নয়, মস্তিষ্কের নিজস্ব এক লীলাখেলা।

তবে সব মানুষের কাছে বৃষ্টি সমান আনন্দের নয়, এ কথাও বিজ্ঞান স্বীকার করে। রোদের পরিমাণই আসলে আবহাওয়ার সবচেয়ে বড় মুড-নির্ধারক, বৃষ্টি নিজে নয়, আর আলোর অভাব সেরোটোনিনের মাত্রা কমিয়ে দেয়। কারো মন বৃষ্টিতে গান গায়, কারো মন গুটিয়ে যায়— এটা নির্ভর করে স্বভাব আর পুরনো স্মৃতির ওপর।

সব মিলিয়ে বলা যায়— বর্ষা শুধু ঋতু নয়, এ এক রাসায়নিক কবিতা। প্রকৃতি বাতাসে আয়ন ছড়ায়, নাকে গন্ধ পাঠায়, কানে ছন্দ বাজায়, আর মস্তিষ্ক তাতে সেরোটোনিনের সুর মিলিয়ে গল্প বানায়। রবীন্দ্রনাথ যা কবিতায় বলে গেছেন, বিজ্ঞান তা এখন ল্যাবরেটরিতে বসে মেপে দেখাচ্ছে— শুধু ভাষাটা বদলে গেছে, অনুভূতিটা একই আছে।

লেখক: বিএডিসির সাবেক প্রধান প্রকৌশলী

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
এমপিওভুক্ত শিক্ষকরাও নতুন পে-স্কেলে বেতন পাবেন
মোটরসাইকেলসহ গাড়ির মালিক-চালকদের বড় সুখবর দিল বিআরটিএ
সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা পরিদর্শনে মার্কিন রাষ্ট্রদূত
পিএসজি ছেড়ে অ্যাস্টন ভিলায় সেনেগাল উইঙ্গার
বিশেষ প্রতিবেদন তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা