ছয় সিনেমাই বাতিল! মেঘের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা কেন নয় জানতে চায় সার্টিফিকেশন বোর্ড

চলচ্চিত্র সার্টিফিকেশন বোর্ডে জমা দেওয়া নির্মাতা ও প্রযোজক মনজুরুল ইসলাম মেঘের ছয়টি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র বাতিল করা হয়েছে। মানহীন নির্মাণ, দুর্বল সংলাপ ও অভিনয়, অশ্রাব্য ভাষার ব্যবহার, অসংলগ্ন কাহিনি বিন্যাসসহ বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে সিনেমাগুলোকে প্রদর্শন অযোগ্য ঘোষণা করেছে বোর্ড। একই সঙ্গে দুটি সিনেমার ক্ষেত্রে আগে সার্টিফিকেট পাওয়া চলচ্চিত্রের নাম ও অন্যান্য তথ্য পরিবর্তন করে জমা দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
এ ঘটনায় মনজুরুল ইসলাম মেঘের বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা নেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে কৈফিয়ত তলব করেছে চলচ্চিত্র সার্টিফিকেশন বোর্ড। গত ২৭ আগস্ট বোর্ডের উপপরিচালক (সচিব) মো. মইনউদ্দিন স্বাক্ষরিত চিঠিতে এসব তথ্য জানানো হয়।
বোর্ডের নথি অনুযায়ী, মেঘের প্রযোজনায় ‘পরিণাম’, ‘রঙ্গশালা’, ‘রক্ত পিপাসা’, ‘রসু খাঁ’, ‘পাহাড়ের আর্তনাদ’ ও ‘বনদস্যু’ নামে ছয়টি চলচ্চিত্র গত ৩০ জুলাই সার্টিফিকেশনের জন্য জমা দেওয়া হয়।
এর মধ্যে ‘পরিণাম’ সিনেমাটি ১২ আগস্ট যাচাই-বাছাই করে বোর্ড। এতে চিত্রনাট্য, কাহিনি বিন্যাস, শব্দচয়ন, সংলাপ ও দৃশ্যায়নে অসংলগ্নতা রয়েছে বলে বোর্ডের মূল্যায়নে উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি মদ্যপান ও ধূমপানের দৃশ্য এবং দুর্বল নির্মাণের বিষয়ও উল্লেখ করা হয়েছে। এসব কারণে সিনেমাটি সমাজে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে উল্লেখ করে চলচ্চিত্র সার্টিফিকেশন আইন, ২০২৩-এর ৫(১২) ধারায় এটিকে সার্টিফিকেশনের অযোগ্য ঘোষণা করা হয়।
‘রঙ্গশালা’ সিনেমাটি ১৩ আগস্ট যাচাই করে বোর্ড। মূল্যায়নে বলা হয়, এটি মানহীন ভিডিও কনটেন্ট হিসেবে বিবেচিত হতে পারে, তবে কোনোভাবেই চলচ্চিত্র বলা যায় না। একই ধারায় সিনেমাটি প্রদর্শনের অযোগ্য ঘোষণা করা হয়।
১৬ আগস্ট ‘রক্ত পিপাসা’ সিনেমাটি যাচাই করে বোর্ড। এতে কাহিনি, চিত্রনাট্য ও সংলাপের পাশাপাশি মূল চরিত্রের বিকৃত মানসিকতা ও পাশবিকতানির্ভর দৃশ্যায়নের বিষয় উল্লেখ করা হয়। বোর্ডের মূল্যায়নে বলা হয়, এসব উপস্থাপন দর্শকের মধ্যে বিরক্তি তৈরি করতে পারে এবং পশুবৃত্তিকে উসকে দিতে পারে। এ কারণে সিনেমাটিকেও প্রদর্শনের অযোগ্য ঘোষণা করা হয়।
তবে ‘পাহাড়ের আর্তনাদ’ ও ‘বনদস্যু’ নিয়ে গুরুতর অভিযোগ করেছে বোর্ড। ১৭ আগস্ট ‘পাহাড়ের আর্তনাদ’ যাচাইয়ের সময় বোর্ড সদস্যরা দেখতে পান, সিনেমাটি ২০২২ সালে সার্টিফিকেট পাওয়া ‘জমজ ভূতের গল্প’ চলচ্চিত্রের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। বোর্ডের চিঠিতে বলা হয়েছে, শুধু প্রযোজক, প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের নাম ও চলচ্চিত্রের নাম পরিবর্তন করে সিনেমাটি জমা দেওয়া হয়েছে। বিষয়টিকে গুরুতর প্রতারণা হিসেবে উল্লেখ করে মেঘের বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা নেওয়া হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়েছে।
পরদিন ১৮ আগস্ট ‘বনদস্যু’ সিনেমাটি যাচাই করে বোর্ড। তাদের মূল্যায়নে বলা হয়, ২০২৩ সালে সার্টিফিকেশন পাওয়া ‘আমার অরণ্য’ চলচ্চিত্রের সঙ্গে ‘বনদস্যু’র কাহিনি, সংলাপ ও দৃশ্যের হুবহু মিল রয়েছে। এটিকেও প্রতারণা হিসেবে উল্লেখ করে সিনেমাটি বাতিল করা হয় এবং প্রযোজকের বিরুদ্ধে কেন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়।
একই দিনে ‘রসু খাঁ’ সিনেমাটিও যাচাই করে বোর্ড। মূল্যায়নে বলা হয়, গল্প, চিত্রনাট্য, অভিনয় ও সংগীত—কোনো কিছুতেই এটিকে চলচ্চিত্র হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। এটিকে মানহীন ভিডিও কনটেন্ট হিসেবে উল্লেখ করে সিনেমাটি প্রদর্শনের অযোগ্য ঘোষণা করা হয়।
প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান সিনেম্যাকিং লিমিটেডের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমকে জানানো হয়েছে, ছয়টি সিনেমার মধ্যে প্রথম তিনটির পরিচালক হিসেবে যাদের নাম রয়েছে, তাদের এটি প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। অন্য তিনটি সিনেমার পরিচালক মিজানুর রহমান লাবু।
এ বিষয়ে মিজানুর রহমান লাবুর সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। একইভাবে এম কে প্রডাকশনের পীযুষ সেনের সঙ্গেও যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তিনিও এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য দেননি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন পরিচালক অভিযোগ করেছেন, এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে আরও কয়েকজন জড়িত থাকতে পারেন। তাদের দাবি, সার্টিফিকেশন পাওয়া পুরোনো সিনেমা নতুন নামে জমা দেওয়ার বিষয়টি ইচ্ছাকৃতভাবে করা হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট সবার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
পরিচালক সমিতির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নেতা বলেন, সার্টিফিকেশন বোর্ড তদন্ত করে এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের নাম প্রকাশ করে চিঠি দিলে সমিতির পক্ষ থেকেও তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মনজুরুল ইসলাম মেঘের বক্তব্য জানা যায়নি।
কে এই মেঘ?
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মনজুরুল ইসলাম মেঘ একসময় বগুড়া পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট শাখা ছাত্রলীগের আহ্বায়ক ছিলেন। চলচিত্রাঙ্গনে আসার পর আওয়ামী লীগের অঙ্গ সংগঠন বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোটের বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির নির্বাহী সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ২০২২ সালে বগুড়া- ৪ (কাহালু-নন্দীগ্রাম) আসনে উপ-নির্বাচনে প্রার্থী হতে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছিলেন তিনি।
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন












































