তাত্ত্বিক আলোয় বিএনপি’র চার দশক: ইতিহাস, অর্জন ও নতুন যুগের অভিযাত্রা

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে চার দশকেরও বেশি সময় ধরে অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে ভূমিকা পালন করে আসছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর এক ঐতিহাসিক ও জটিল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই দলের আত্মপ্রকাশ ঘটে। একটি সদ্য স্বাধীন ও যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের রাজনৈতিক মেরুকরণ, ক্ষমতার রূপান্তর এবং ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যে নতুন দর্শনের জন্ম হয়েছিল, তার নির্মোহ তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ রাজনৈতিক বিজ্ঞান ও সুশাসনের দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। দলটির প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর এই ক্ষণে এর জন্ম ইতিহাস, মূল আদর্শিক ভিত্তি, শাসনতান্ত্রিক সাফল্য এবং বর্তমান ও ভবিষ্যৎ পথরেখার একটি বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন সমকালীন রাজনীতির গতিপ্রকৃতি বুঝতে সাহায্য করে। প্রখ্যাত ফরাসি দার্শনিক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অ্যালেক্সিস ডি টকভিল (Alexis de Tocqueville) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ Democracy in America-তে লিখেছেন, “An institution is the lengthened shadow of one man, but its durability depends on how it captures the spirit of its times” [একটি প্রতিষ্ঠান মূলত একজন মানুষের দীর্ঘায়িত ছায়া মাত্র, তবে এর স্থায়িত্ব নির্ভর করে এটি সমকালের চেতনাকে কতটা ধারণ করতে পারে তার ওপর]। বিএনপি’র চার দশকের পথচলাতেও এই তাত্ত্বিক সত্যটি সমভাবে প্রযোজ্য।
পটভূমি ও জন্ম ইতিহাস: সংকটের আবর্তে নতুন সমীকরণ
১৯৭৫ সালের পটপরিবর্তন-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক ধরনের গভীর শূন্যতা ও দিকভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল। তৎকালীন সেনাপ্রধান ও পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে এসে বেসামরিকীকরণের (Demilitarization) একটি সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া শুরু করেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, স্থায়ী স্থিতিশীলতার জন্য একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম অপরিহার্য। এই লক্ষ্য নিয়ে প্রথমে ১৯৭৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে ‘জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল’ (জাগদল) এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন মতাদর্শের দল ও ব্যক্তির সমন্বয়ে ‘জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট’ গঠিত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল’ (বিএনপি)-র আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন। তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে, এই দলের জন্ম ছিল বামপন্থী, ডানপন্থী এবং মধ্যপন্থী—সব ধারার political শক্তির এক অভূতপূর্ব মহাসমন্বয় (Syncretism)। বিখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্যামুয়েল পি. হান্টিংটন (Samuel P. Huntington) তাঁর Political Order in Changing Societies গ্রন্থে সামাজিক রূপান্তরের সময় রাজনৈতিক প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের ওপর জোর দিয়েছেন। হান্টিংটনের তত্ত্বের আলোকে বলা যায়, জিয়াউর রহমানের এই রাজনৈতিক উদ্যোগ ছিল মূলত ভঙ্গুর ও খণ্ডিত একটি সমাজকে একটি সুসংগঠিত কাঠামোর মাধ্যমে স্থিতিশীলতায় রূপান্তরের সফল প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়াস।
দর্শন, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য: বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের তাত্ত্বিক ভিত্তি
বিএনপি’র রাজনীতির মূল ভিত্তি হলো ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’। এর আগে ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’-এর যে ধারণা প্রচলিত ছিল, তার সঙ্গে এই দর্শনের মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। বাঙালি জাতীয়তাবাদ মূলত ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর জোর দেয়, যা ভৌগোলিক সীমানার বাইরেও বিস্তৃত হতে পারে। পক্ষান্তরে, বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ রাষ্ট্রীয় সীমানা, ধর্ম, বর্ণ ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীসহ ভূখণ্ডে বসবাসকারী সব নাগরিকের অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিচয়কে ধারণ করে। রাজনীতি বিজ্ঞানের পরিভাষায় একে ‘রাষ্ট্রিক জাতীয়তাবাদ’ (State Nationalism) বলা যেতে পারে। বিখ্যাত তাত্ত্বিক বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসন (Benedict Anderson) জাতীয়তাবাদকে একটি ‘কাল্পনিক সম্প্রদায়’ (Imagined Community) হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। অ্যান্ডারসনের এই তাত্ত্বিক কাঠামোর সাথে মিল রেখে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ একটি আধুনিক ভূখণ্ডভিত্তিক বহুত্ববাদী রাজনৈতিক পরিচয় তৈরি করেছে, যা বিভাজিত সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করার মূল চালিকাশক্তি। বিএনপি’র মূল লক্ষ্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনরুত্থান, মুক্তবাজার অর্থনীতি এবং জনগণের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও সর্বধর্মের সহাবস্থান নিশ্চিত করা।
নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা ও নতুন যুগের উদয়: আস্থার রাজনীতি
একটি রাজনৈতিক দলের অন্যতম প্রধান শক্তি হলো প্রতিকূলতার মুখে পুনরুত্থানের সক্ষমতা এবং নেতৃত্বের সফল রূপান্তর। ১৯৮১ সালে প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর দলটির অস্তিত্ব বড় ধরনের হুমকিতে পড়েছিল। পরবর্তীতে বেগম খালেদা জিয়ার আপসহীন ও অবিচল নেতৃত্ব ধ্বংসস্তূপ থেকে দলকে পুনর্গঠিত করে জনগণের দোরগোড়ায় নিয়ে যায়। তবে সমকালীন ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় রচিত হয়েছে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের (Tarique Rahman) সুদূরপ্রসারী ও দূরদর্শী নেতৃত্বের মাধ্যমে। দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে তীব্র দমন-পীড়ন ও রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মাঝেও তিনি যেভাবে দলের সাংগঠনিক ঐক্য ধরে রেখেছেন, তা সমকালীন রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এক অনন্য কেস স্টাডি। তাঁর সুযোগ্য নির্দেশনায় দল আজ তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত সুসংগঠিত ও আধুনিক প্রযুক্তিমনস্ক। দীর্ঘ নির্বাসন ও নানামুখী চক্রান্তের বেড়াজাল ছিন্ন করে তাঁর স্বদেশে প্রত্যাবর্তন এবং ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনে দলটিকে ইতিহাস সৃষ্টিকারী দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ল্যান্ডস্লাইড বিজয় এনে দেওয়া প্রমাণ করে—দেশবাসী ও তরুণ প্রজন্মের গভীর আস্থা এখন তাঁর সুযোগ্য ও দূরদর্শী নেতৃত্বের ওপর। বিখ্যাত মার্কিন তাত্ত্বিক ও নেতৃত্ব বিশেষজ্ঞ জন সি. ম্যাক্সওয়েল (John C. Maxwell) বলেছেন, “A leader is one who knows the way, goes the way, and shows the way” [নেতা তিনিই যিনি পথ চেনেন, সেই পথে হাঁটেন এবং অন্যকে পথ দেখান]। তারেক রহমান আজ বাংলাদেশের রাজনীতিতে সেই পথপ্রদর্শকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন, যিনি ক্রান্তিকাল পেরিয়ে দলকে সুশাসন ও টেকসই উন্নয়নের নতুন যুগে প্রবেশ করিয়েছেন।
সফলতা ও অবদান: উন্নয়ন ও কূটনীতির মাইলফলক
একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনায় বিএনপি’র অবদান ও সাফল্য সুদূরপ্রসারী। অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ক্ষেত্রে দলটির ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। জিয়াউর রহমানের হাত ধরেই বাংলাদেশে মুক্তবাজার অর্থনীতির সূচনা হয়। তৈরি পোশাক শিল্প (RMG) খাতের বিকাশ এবং মধ্যপ্রাচ্যে জনশক্তি রপ্তানির মাধ্যমে রেমিট্যান্স অর্থনীতির যে মজবুত ভিত্তি আজ বাংলাদেশের জিডিপি-কে টিকিয়ে রেখেছে, তার প্রাতিষ্ঠানিক সূচনা হয়েছিল বিএনপি’র শাসনামলেই। দক্ষিণ এশিয়ার সাতটি দেশের মধ্যে regional সহযোগিতা ও সম্প্রীতি বৃদ্ধির লক্ষ্যে ‘সার্ক’ (SAARC) গঠনের ধারণাটি ছিল জিয়াউর রহমানের এক দূরদর্শী কূটনৈতিক মাস্টারস্ট্রোক। পরবর্তীতে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি সরকার প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক ও অবৈতনিক করে এবং ছাত্রীদের জন্য দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত উপবৃত্তি চালু করে। বিশ্বখ্যাত অর্থনীতিবিদ ও নোবেলজয়ী অমর্ত্য সেন (Amartya Sen) তাঁর Development as Freedom গ্রন্থে মানবসম্পদ উন্নয়ন, বিশেষ করে নারী শিক্ষার প্রসারের মাধ্যমে অর্থনৈতিক স্বাধীনতার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। বিএনপি’র নীতিগত সংস্কারগুলো অমর্ত্য সেনের এই উন্নয়ন তত্ত্বেরই বাস্তব প্রতিফলন, যা বাংলাদেশের সামাজিক সূচকের অভূতপূর্ব উন্নতি সাধন করেছে।
নতুন যুগের অভিযাত্রা: সুশাসন ও রাষ্ট্র সংস্কারের পরীক্ষা
দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠনের পর বিএনপি ও তারেক রহমানের নেতৃত্বের সামনে এখন এক নতুন ও ঐতিহাসিক সুযোগ তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিনের স্বৈরাচারী ও প্রাতিষ্ঠানিক ভাঙনের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং মানবাধিকারের সুরক্ষাই এখন সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে এসে বিশ্বরাজনীতি ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ব্যাপক গুণগত পরিবর্তন এসেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, যুব সমাজের মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর এবং নতুন প্রজন্মের তীব্র গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার সাথে তাল মিলিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার নতুন ন্যারেটিভ তৈরি করতে হবে। ভারতের রাষ্ট্রনায়ক জওহরলাল নেহেরু (Jawaharlal Nehru) তাঁর ঐতিহাসিক Tryst with Destiny ভাষণে বলেছিলেন, “The achievement we celebrate today is but a step, an opening of opportunity, to the greater triumphs and achievements that await us” [আজ আমরা যে অর্জন উদযাপন করছি তা কেবল একটি ধাপ, একটি সুবর্ণ সুযোগের উন্মোচন মাত্র—ভবিষ্যতের আরও বড় বিজয় ও সাফল্যের পানে এগিয়ে যাওয়ার জন্য]। বিশাল ম্যান্ডেট নিয়ে সরকারে আসা বিএনপি’র জন্য এই ঐতিহাসিক বিজয় হলো রাষ্ট্র সংস্কার ও জনগণের নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার এক অভূতপূর্ব সুযোগ।
সুশাসন ও মানবাধিকারের প্রেক্ষাপটে আগামীর সমীকরণ
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। একটি দল তখনই জনগণের মাঝে দীর্ঘকাল প্রাসঙ্গিক থাকে, যখন তারা অতীতের অর্জনের ওপর ভর করে এবং বর্তমানের বিপুল জনসমর্থনকে কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতের একটি আধুনিক ও কল্যাণমুখী রূপরেখা প্রণয়ন করতে পারে। অপরাধবিজ্ঞান ও সুশাসনের একজন গবেষক হিসেবে আমি মনে করি, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বর্তমান সরকারের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত একটি আধুনিক, জবাবদিহিমূলক এবং মানবাধিকারবান্ধব রাষ্ট্রীয় কাঠামো গড়ে তোলা। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল (Winston Churchill) বলেছিলেন, “The price of greatness is responsibility” [মহানত্বের মূল্য হলো দায়িত্বশীলতা]। বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাতা বার্ষিকীর এই ঐতিহাসিক ক্ষণে দলটির প্রতি দেশবাসীর প্রত্যাশা- অতীতের সকল মেঘ কেটে গিয়ে বর্তমানের সুবর্ণ সুযোগে তারা তাত্ত্বিক দূরদর্শিতা ও বাস্তবমুখী কৌশলের সমন্বয়ে বাংলাদেশের টেকসই গণতন্ত্র, সুশাসন ও অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত করতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে।
লেখক: উপাচার্য, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয়, সোমালিয়া এবং অপরাধবিজ্ঞান, সুশাসন ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ
(ঢাকাটাইমস/৩১ আগস্ট/আরজেড)
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













































