কথা ছিল চোখের চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরবেন, ফিরলেন লাশ হয়ে

কথা ছিলো চোখের চিকিৎসা শেষে শনিবার বাড়ি ফিরবেন বাগবাড়ি সরকারি বালিকা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রনজিলা পারভীন। কথা ছিল, রবিবার শিক্ষার্থীরা সবাই পৌছার আগেই রনজিলা বিদ্যালয়ে তার চেয়ারে গিয়ে বসবেন। দেখা হবে তার সহকর্মীদের সাথে। রনজিলা পারভীন ফিরেছেন। গিয়েছেন তার প্রিয় কর্মস্থলেও। তবে সেটি অ্যাম্বুলেন্সে। নিথর দেহে! ছিনতাইকারীদের হাতে নিহত রনজিলার মরদেহ রবিবার (৩০ আগস্ট) বাগবাড়ি সরকারি বালিকা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নেয়ার পর তাকে ঘিরে সহকর্মী আর শিক্ষার্থীদের যেন আনন্দ তা যেন ভেসে যাচ্ছিলো বোবা কান্নায়। রনজিলাকে হারানোর পাহাড়সম কষ্ট আর ছিনতাইকারীদের প্রতি ঘৃনা কাজ করছিলো রনজিলার স্বজন, সহকর্মী আর শিক্ষার্থীদের মাঝে।
রনজিলা পারভীন তার চোখের চিকিৎসার জন্য স্বামীর সাথে শুক্রবার রাতের গাড়িতে ঢাকায় যান। ঢাকার ফার্মগেট এলাকার ইস্পাহানী ইসলামিয়া চক্ষু ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে চিকিৎসক দেখানোর কথার ছিল। সেই উদ্দেশ্যেই শনিবার (২৯ আগস্ট) সকাল সাড়ে ৬টায় ঢাকায় পৌঁছে তারা রিকশায় হাসপাতালে যাচ্ছিলেন। পথে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার সামনে একটি মোটরসাইকেলে থাকা ছিনতাইকারীরা রিকশা পাশ থেকে তার ব্যাগ ধরে টান দেয়। এতে রনজিনা পারভীন রিকশা থেকে সড়কে পড়ে যান। মাথায় গুরুতর আঘাত পান তিনি। পরে তাকে উদ্ধার করে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
রনজিলা পারভীনের বাড়ি বগুড়া শহরের রহমাননগর এলাকায়। সেখানে স্বামী আব্দুল মতিন ও তাদের একমাত্র মেয়ে রাইসা আক্তারকে নিয়ে থাকতেন তিনি। শনিবার দিবাগত রাতে তার মরদেহ বগুড়ায় পৌঁছায়। আজ বাদ যোহর বাগবাড়ি সরকারি বালিকা প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে রনজিলা পারভীনের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর বাদ আসর গাবতলীর তরফসরতাজ গ্রামে দ্বিতীয় জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
রনজিলা পারভীনের নবম শ্রেণীতে পড়ুয়া একমাত্র কন্যা রাইসা আক্তার বলেন, আমার মতো আর যেন কাউকে এভাবে মা হারাতে না হয়। আমি আমার মায়ের হত্যার বিচার চাই।
রনজিলা পারভীনের স্বামী আব্দুল মতিন বলেন, এ ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। তিনি প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
রনজিলা পারভীনের সহকর্মী সহকারী শিক্ষক মেহেনাজ আফরীন ও মাছুমা খাতুন বলেন, রনজিলা পারভীন সবার আগে বিদ্যালয়ে আসতেন। প্রধান শিক্ষক হয়েও নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করতেন। শিক্ষকদের নানা বিষয়ে খোঁজখবর নিতেন। তার চলে যাওয়ায় তারা যেন একজন অভিভাবক হারিয়েছেন।
আরেক সহকর্মী রিজবোনা আক্তার স্মৃতিচারণ করে বলেন, ২৬ আগস্ট ঈদে মিলাদুন্নবীর ছুটির দিনে আমরা ছয়জন শিক্ষিকা স্কুলে গিয়ে মিলাদ মাহফিলে অংশ নিই। পরে তার অনুরোধে সবাই মিলে তার মোবাইল ফোনে একটি গ্রুপ ছবি তুলি। ছবিটি এখনো তার মোবাইলেই আছে। তিনি বলেন, সেদিন তিনি বলেছিলেন- শুক্রবার রাতে চোখের ডাক্তার দেখাতে ঢাকায় যাবেন। এরপর আমরা সবাই একসঙ্গে স্কুল থেকে বের হয়ে যে যার বাড়িতে ফিরে যাই। পরে আর কোনো কথা হয়নি। কিন্তু আজ খবর পেলাম, তিনি আর নেই।
গাবতলী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা কামরুল হাসান বলেন, আমার কাছে ছুটির দরখাস্ত দিয়ে তিনি ঢাকায় গিয়েছিলেন। আমি জানতাম, তার পায়ে চোট লেগেছিল এবং সেখান থেকে চোখে সমস্যা দেখা দিয়েছিল। এজন্য তিনি ঢাকায় চোখের ডাক্তার দেখাতে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে এমন একটি মর্মান্তিক ঘটনা ঘটবে, তা কল্পনাও করতে পারিনি।
তিনি আরও বলেন, প্রধান শিক্ষিকা রনজিনা পারভীনের আকস্মিক মৃত্যুতে আমরা অত্যন্ত শোকাহত ও মর্মাহত। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। বিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ উন্নয়ন, শিক্ষার্থীদের প্রতি দায়িত্ববোধ এবং সহকর্মীদের সঙ্গে সুন্দর আচরণের মাধ্যমে তিনি সবার কাছে একজন প্রিয় মানুষ হয়ে উঠেছিলেন।
উপজেলা শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, রনজিলা পারভীন ১৯৮৮ সালের জানুয়ারিতে সহকারী শিক্ষক হিসেবে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চাকরিতে যোগ দেন। পরে পদোন্নতি পেয়ে বাগবাড়ি সরকারি বালিকা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হন। তিন দশকের বেশি সময় যে মানুষটি প্রতিদিন বিদ্যালয়ে এসেছেন শিশুদের পড়াতে, সহকর্মীদের আগলে রাখতে, সেই বিদ্যালয়েই আজ তার শেষ বিদায়। চোখের চিকিৎসা শেষে তার বাড়ি ফেরার কথা ছিল। ফিরলেন তিনি, তবে আর কোনো দিন ক্লাসে যাওয়ার জন্য নয়।
(ঢাকা টাইমস/৩০আগস্ট/এসএ)
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন









































