৬১ দিনের গুম, ৯ বছরের নির্বাসন: নিজের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা বলতে গিয়ে কাঁদলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

অনলাইন ডেস্ক, ঢাকা টাইমস
  প্রকাশিত : ৩০ আগস্ট ২০২৬, ১২:১০
অ- অ+

২০১৫ সালে গুমের শিকার হওয়ার পর ৬১ দিনের বন্দিদশা এবং পরবর্তী সময়ে ভারতের মেঘালয়ে প্রায় নয় বছরের নির্বাসিত জীবনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে কেঁদেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।

শনিবার (২৯ আগস্ট) রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘর মিলনায়তনে ‘মায়ের ডাক’ আয়োজিত এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে নিজের জীবনের দুঃসহ অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন তিনি। আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে ‘নিখোঁজ ব্যক্তিদের ফিরিয়ে আনতে বা তাদের সন্ধান পেতে চাই আইন, ন্যায়বিচার, জবাবদিহিতা এবং মানবাধিকার’ শীর্ষক এ সভার আয়োজন করা হয়।

বক্তব্যের একপর্যায়ে ভারতে মানসিক হাসপাতালে কাটানো দিনের স্মৃতি স্মরণ করে কান্নায় ভেঙে পড়েন সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, ‘আমি বিদেশের মাটিতে পাগল অবস্থায় মারা যাব, আমার পরিবার হয়তো আমার কবরও দেখতে পারবে না—এমন ভয়ও পেয়েছিলাম।’

৬১ দিন অন্ধকার কক্ষে

২০১৫ সালের ১০ মার্চ রাজধানীর উত্তরা থেকে গুমের শিকার হওয়ার পর তাকে একটি অন্ধকার ও সংকীর্ণ কক্ষে ৬১ দিন আটকে রাখা হয়েছিল বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, কক্ষটির আকার ছিল প্রায় আট ফুট বাই চার ফুট। সেখানে একটি পানির কল এবং শৌচকার্যের জন্য নর্দমার সঙ্গে যুক্ত একটি সরু ছিদ্র ছিল। দুর্গন্ধে ওই কক্ষে থাকা অত্যন্ত কষ্টকর ছিল। মেঝেতে একটি কম্বল ও বালিশই ছিল তার শোবার ব্যবস্থা।

তীব্র গরমের মধ্যে দরজার ওপরের সামান্য ফাঁক দিয়ে আসা বাতাসই ছিল বেঁচে থাকার ভরসা। দরজার বাইরে একটি বৈদ্যুতিক পাখা চালু রাখা হতো। হৃদরোগে আক্রান্ত থাকা সত্ত্বেও বন্দিদশায় তিনি কোনো চিকিৎসা পাননি বলে জানান।

একপর্যায়ে অসুস্থ হয়ে পড়লে চোখ বেঁধে তাকে অন্য একটি স্থানে নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় বলেও জানান তিনি।

চোখ বাঁধা অবস্থায় মেঘালয়ে

ভারতে নিয়ে যাওয়ার সময়ও তার চোখ বাঁধা ছিল বলে জানান সালাহউদ্দিন। প্রথমে মাইক্রোবাস এবং পরে গভীর রাতে একটি জিপ গাড়িতে করে তাকে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়।

দীর্ঘ যাত্রার পর একপর্যায়ে হাত ও চোখ বাঁধা অবস্থায় তাকে চামচ দিয়ে নুডলস খাওয়ানো হয়। বন্দিদশায় বাইরের পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থাকায় যুদ্ধাপরাধী কামারুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবরও তিনি জানতেন না বলে জানান। বিষয়টি শুনে জিজ্ঞাসাবাদকারী কর্মকর্তাও বিস্মিত হয়েছিলেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।

পরে ভোরবেলা একটি নির্জন পাহাড়ি এলাকায় তাকে নামিয়ে দিয়ে অপহরণকারীরা দ্রুত সেখান থেকে চলে যায়। বিলবোর্ড দেখে তখন তিনি বুঝতে পারেন, জায়গাটি ভারতের মেঘালয় রাজ্যের শিলং।

স্থানীয়দের সহায়তায় পুলিশ তাকে উদ্ধার করে প্রথমে একটি বেসামরিক হাসপাতালে ভর্তি করে। পরে তাকে মানসিক ভারসাম্যহীন সন্দেহে একটি মানসিক হাসপাতালে পাঠানো হয়।

মানসিক হাসপাতালে দুঃসহ দিন

সালাহউদ্দিনের ভাষ্য অনুযায়ী, মানসিক হাসপাতালে তাকে অন্য রোগীদের সঙ্গে রাখা হয়। সেখানে তাকে জোর করে মানসিক রোগের ওষুধ খাওয়ানো হতো। এমনকি তার চোখের চশমাও কেড়ে নেওয়া হয়েছিল।

দাড়ি-চুল কেটে দেওয়ার পর নিজের পরিচয় হারিয়ে ফেলার আশঙ্কায় তিনি আরও ভেঙে পড়েছিলেন। একপর্যায়ে তার মনে হয়েছিল, বিদেশের মাটিতেই হয়তো তাকে পাগল অবস্থায় মৃত্যুবরণ করতে হবে।

এর মধ্যে একদিন হাসপাতালে তার স্ত্রীর ফোন আসে। ফোনে স্ত্রীর কান্নার আওয়াজ শুনে তিনি বুঝতে পারেন, তার পরিবার তার বেঁচে থাকার খবর পেয়েছে।

পরে সিভিল হাসপাতালে স্থানান্তরের সময় সাংবাদিকদের ক্যামেরার সামনে নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে তিনি চিৎকার করে বলেন, ‘ইয়েস, আই অ্যাম সালাহউদ্দিন।’

দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে দেশে ফেরা

ভারতে অবস্থানকালে অবৈধ অনুপ্রবেশের অভিযোগে সালাহউদ্দিন আহমদের বিরুদ্ধে ফরেনার্স অ্যাক্টে মামলা করে দেশটির পুলিশ। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর ২০১৮ সালের ২৬ অক্টোবর শিলংয়ের নিম্ন আদালত তাকে খালাস দেন। পরে ২০২৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি আপিল আদালতও তাকে খালাস দেন।

ভারতে অবস্থানকালেই বিএনপির ষষ্ঠ কাউন্সিলে তাকে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য করা হয়।

দীর্ঘ নয় বছর ভারতে অবস্থানের পর ২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশের গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশে ফেরেন তিনি। নিজের বক্তব্যে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া ছাত্র-জনতার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে সালাহউদ্দিন বলেন, ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান হওয়ায় ভারত থেকে আমি দেশে ফিরতে পেরেছি। যারা জুলাই যুদ্ধ করেছেন, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা।’

রাজনীতি ও গুমের ঘটনা

সালাহউদ্দিন আহমদ ১৯৯১ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার একান্ত সচিবের দায়িত্ব পালন করেন। পরে চাকরি ছেড়ে রাজনীতিতে যোগ দেন। ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কক্সবাজার থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান।

২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জনের পর বিএনপির মুখপাত্র হিসেবে দলের আন্দোলন পরিচালনার সময় ২০১৫ সালের ১০ মার্চ রাজধানীর উত্তরা থেকে সাদা পোশাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে কয়েকজন তাকে তুলে নিয়ে যায় বলে অভিযোগ ওঠে। এরপর দীর্ঘ সময় তার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।

দুই মাস পর ভারতের শিলংয়ে তার সন্ধান মেলে। এরপর শুরু হয় নতুন অধ্যায়- মামলা, হাসপাতালের জীবন এবং দীর্ঘ আইনি লড়াই। শেষ পর্যন্ত আদালত থেকে মুক্তি পাওয়ার পরও দেশে ফেরার জন্য তাকে আরও কয়েক বছর অপেক্ষা করতে হয়।

শনিবারের আলোচনা সভায় নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, গুমের প্রতিটি ঘটনার বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটাতে রাষ্ট্রীয়ভাবে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

(ঢাকাটাইমস/৩০ আগস্ট/আরজেড)

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
জুরাইনে ইয়াবা-পুলিশের লুট হওয়া গুলিসহ গ্রেপ্তার ১
বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় নিতে চায় সরকার: এলজিআরডি মন্ত্রী
কোন হিন্দু যদি মনে করেন ভারতে মুসলিম থাকবে না, সে হিন্দু নয়: আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত
পতেঙ্গায় লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনালের নির্মাণকাজ শুরু
বিশেষ প্রতিবেদন তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা