মিলাদুন্নবীর দর্শন: সুশাসন, মানবাধিকার ও অপরাধমুক্ত সমাজ

প্রফেসর ড. আসিফ মিজান
  প্রকাশিত : ২৭ আগস্ট ২০২৬, ১০:৩৭
অ- অ+

মানব ইতিহাসের গতিপথকে অন্ধকারের অতল গহ্বর থেকে আলোর উদ্ভাসে ফিরিয়ে আনার লক্ষে আজ থেকে চৌদ্দশত বছর পূর্বে এক যুগান্তকারী ও ঐশ্বরিক বিপ্লব সাধিত হয়েছিল। ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দের ১২ই রবিউল আউয়াল মানবতার মুক্তির দিশারী, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পবিত্র ধরাধামে আগমন বা মিলাদুন্নবী (সা.) কেবল একটি তিথি বা পর্ব নয়; বরং এটি শোষিত, লাঞ্ছিত এবং অবদমিত মানবতাকে শৃঙ্খলমুক্ত করার এক শাশ্বত ও তাত্ত্বিক মহাকাব্য। সমকালীন সমাজবিজ্ঞান, সুশাসন এবং অপরাধবিজ্ঞানের আধুনিক ব্যাকরণ দিয়ে যদি আমরা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনদর্শন ও মদিনা রাষ্ট্রের শাসনপদ্ধতি ব্যবচ্ছেদ করি, তবে দেখব বর্তমান বিশ্বের চলমান সমস্ত সংকট—মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন, ক্রমবর্ধমান অপরাধপ্রবণতা এবং ভঙ্গুর সুশাসনের এক কালজয়ী ও প্রায়োগিক সমাধান নিহিত রয়েছে তাঁরই প্রদর্শিত আদর্শে।

তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট: জাহেলিয়াত বনাম ইনসাফভিত্তিক সমাজকাঠামো

ঐতিহাসিক ও সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে প্রাক-ইসলামী আরব সমাজ বা 'আইয়ামে জাহেলিয়াত' ছিল প্রাতিষ্ঠানিক নৈরাজ্য, গোত্রীয় সংঘাত, কাঠামোগত বৈষম্য এবং নৈতিক অবক্ষয়ের এক নিকষ কালো উপাখ্যান। সেখানে আইনের শাসন ছিল অনুপস্থিত, এবং সবল কর্তৃক দুর্বলের ওপর নিপীড়ন ছিল এক অলিখিত সামাজিক চুক্তি। এই চরম নৈরাজ্যিক পরিস্থিতিতে মহানবী (সা.) সমাজ পুনর্গঠনের যে তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক রূপরেখা দাঁড় করান, তা আধুনিক অপরাধবিজ্ঞানের ‘সোশ্যাল ডিসঅর্গানাইজেশন থিওরি’ বা সামাজিক বিশৃঙ্খলা তত্ত্বের সমস্ত নেতিবাচক সূচককে আমূল বদলে দেয়। তিনি রক্তের সম্পর্কের ঊর্ধ্বে উঠে আদর্শভিত্তিক এক সর্বজনীন ভ্রাতৃত্ববোধ ও সামাজিক সংহতির বুনিয়াদ গড়ে তোলেন। এই সংহতিই সমাজে অপরাধের মূল উৎপাটন করেছিল, যা অপরাধবিজ্ঞানের তাত্ত্বিক ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলক।

মদিনা সনদ: সুশাসন ও সাংবিধানিকতাবাদের আদি ইশতেহার

সুশাসনের প্রধান শর্ত হলো অন্তর্ভুক্তি, বহুত্ববাদ এবং জবাবদিহিতা। মহানবী (সা.) কর্তৃক প্রণীত ৪৭ ধারার ‘মদিনা সনদ’ মানব ইতিহাসের প্রথম লিখিত সংবিধান, যা আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ‘সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট’ বা সামাজিক চুক্তির চেয়েও অনেক বেশি প্রগতিশীল ও ভারসাম্যপূর্ণ ছিল। এই সনদের মাধ্যমে তিনি একটি বহু-ধর্মীয়, বহু-গোত্রীয় ও বহু-সাংস্কৃতিক সমাজে অভূতপূর্ব রাজনৈতিক সুশাসন প্রতিষ্ঠা করেন। মদিনা সনদে প্রতিটি নাগরিকের ধর্মীয় স্বাধীনতা, জানমালের নিরাপত্তা এবং বহিঃশত্রুর বিরুদ্ধে যৌথ প্রতিরোধের যে আইনি বাধ্যবাধকতা ছিল, তা আজকের আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মূল স্তম্ভ। পক্ষপাতহীন বিচারব্যবস্থা এবং ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে তিনি এমন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলেছিলেন, যেখানে রাষ্ট্রপ্রধান থেকে শুরু করে সাধারণ নাগরিক—সবাই আইনের দৃষ্টিতে সমানাধিকার ভোগ করত।

মানবাধিকারের কালজয়ী মশাল: বিদায় হজের ভাষণ

১২১৫ সালের ম্যাগনা কার্টা বা ১৯৪৮ সালের জাতিসংঘের সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্র প্রণয়নের বহু শতাব্দী আগে, বিদায় হজের ভাষণে রাসূলুল্লাহ (সা.) মানবাধিকারের এক শাশ্বত ও বৈশ্বিক মশাল উপহার দিয়েছিলেন। তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন, "কৃষ্ণাঙ্গের ওপর শ্বেতাঙ্গের কিংবা অনারবের ওপর আরবের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই।" বর্ণবাদ, গোত্রবাদ এবং জাতিগত অহমিকাকে চরমভাবে চূর্ণ করে তিনি মানবমর্যাদার যে সমতার তত্ত্ব প্রচার করেন, তা আজকের বৈষম্যহীন বিশ্ব গড়ার প্রধান পাথেয়। নারীর অধিকার, শ্রমিকের অধিকার এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় তাঁর আইনি ও নৈতিক নির্দেশনাগুলো বর্তমান ‘হিউম্যান রাইটস ল’ বা মানবাধিকার আইনের এক নিখুঁত ও তাত্ত্বিক ভিত্তি।

অপরাধ দমন ও সংশোধনমূলক বিচারব্যবস্থা

অপরাধবিজ্ঞানের সমকালীন ধারায় শুধু শাস্তির চেয়ে অপরাধ প্রতিরোধ এবং অপরাধীর মনস্তাত্ত্বিক সংশোধনের ওপর অধিক জোর দেওয়া হয়। মহানবী (সা.)-এর বিচারিক দর্শনে এই ‘রিস্টোরেটিভ জাস্টিস’ বা সংশোধনমূলক বিচারব্যবস্থার চরম উৎকর্ষ দেখা যায়। তিনি সমাজ থেকে ক্ষুধা, দারিদ্র্য এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করে অপরাধের পেছনের চালিকাশক্তি বা ‘রুট কজ’ নির্মূল করেছিলেন। তিনি এমন এক সমাজ বিনির্মাণ করেছিলেন যেখানে সততা ছিল সামাজিক পুঁজি এবং অপরাধ ছিল সামাজিকভাবে চরম নিন্দিত। ফলে, শাস্তির কঠোর প্রয়োগের চেয়ে মানুষের আত্মিক ও নৈতিক জাগরণের মাধ্যমেই সমাজ থেকে অপরাধের বিলুপ্তি ঘটেছিল।

বর্তমান বিশ্বসংকট ও নবীজির প্রাসঙ্গিকতা

আজকের একবিংশ শতাব্দীর বিশ্ব যখন সুশাসনের অভাব, ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, মানবাধিকারের চরম বিপর্যয় এবং নৈতিক স্খলনের এক গভীর সংকটে নিমজ্জিত, তখন ঈদুল মিলাদুন্নবী (সা.) কেবল আনুষ্ঠানিক উদযাপনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। আমাদের জ্ঞানতাত্ত্বিক পরিমণ্ডলে, রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণে এবং সামাজিক চালচিত্রে মহানবীর (সা.) সেই মানবিক ও সাম্যবাদী সুশাসনের নীতিমালার প্রতিফলন ঘটাতে হবে। উপাচার্য ও একজন অপরাধবিজ্ঞান গবেষক হিসেবে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, যদি আমরা একটি শান্তিপূর্ণ, অপরাধমুক্ত এবং মানবিক বিশ্ব ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাই, তবে বিদায় হজের মানবাধিকারের দর্শন এবং মদিনা রাষ্ট্রের সুশাসনের মডেলকে আমাদের প্রতিটি স্তরে পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। তবেই সার্থক হবে এই পবিত্র দিবসের তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক তাৎপর্য।

লেখক : উপাচার্য, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয়, মোগাদিশু, সোমালিয়া এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি, অপরাধবিজ্ঞান, সুশাসন ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ

(ঢাকাটাইমস/২৭ আগস্ট/আরজেড)

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
ডিএমপির অভিযানে ২৪ ঘণ্টায় ৫৬০ জন গ্রেপ্তার, মামলা ৪৬
বরিশাল উত্তর জেলা বিএনপির দফতরের দায়িত্ব পেলেন রফিকুল ইসলাম কাজল
ইলিয়াস কাঞ্চনের মৃত্যুর গুজবে তীব্র প্রতিবাদ, দায়ীদের আইনের আওতায় আনার দাবি
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন বসছে আজ
বিশেষ প্রতিবেদন তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা