নেপালে হঠাৎ বন্যার ভয়াবহতা, বিজ্ঞানীদের প্রাথমিক বিশ্লেষণে যা জানা গেল

অনলাইন ডেস্ক, ঢাকা টাইমস
  প্রকাশিত : ২৭ আগস্ট ২০২৬, ০৮:২১
অ- অ+

নেপালে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় নিহতের সংখ্যা দেড়শ ছাড়িয়েছে। এ ঘটনায় নিখোঁজ রয়েছেন প্রায় ৪০০ জন। দেশটির নেপাল-চীন সীমান্তবর্তী রাসুওয়া, সিন্ধুপালচোকসহ অন্তত তিনটি জেলা ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

স্থানীয় সময় বুধবার (২৬ আগস্ট) ভুটেকোশি নদী ও এর উপনদীগুলোতে হঠাৎ পানির প্রবাহ বেড়ে যাওয়ার পর এ বন্যা দেখা দেয়। মুহূর্তের মধ্যে নদীর পানি, কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ ভাটির দিকে ধেয়ে গিয়ে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়।

আকস্মিক এ বন্যার কারণ অনুসন্ধানে কাজ শুরু করেছেন নেপাল ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের আবহাওয়া, ভূতত্ত্ব ও হিমবাহ বিশেষজ্ঞরা। প্রাথমিকভাবে শক্তিশালী তুষারধস ও ভূমিধসকেই সবচেয়ে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

স্থানীয় সংবাদমাধ্যম দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হিমবাহের বড় একটি অংশ পাহাড়ের ঢাল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে লহেন্দে খোলা নদীতে পড়ে। এতে নদীর প্রবাহ সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। বরফ, পাথর ও অন্যান্য ধ্বংসাবশেষ মিলে সেখানে এক ধরনের প্রাকৃতিক বাঁধ তৈরি হয়।

পরে ওই বাধা ভেঙে বিপুল পরিমাণ পানি ও ধ্বংসাবশেষ একসঙ্গে ভাটির দিকে নেমে আসে। এতে ভুটেকোশি নদীতে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হয়।

নেপালের পানিবিদ্যা ও আবহাওয়া অফিসের বন্যা পূর্বাভাস বিভাগের প্রধান বিনোদ পরাজুলির প্রাথমিক তথ্যেও একই ধরনের চিত্র উঠে এসেছে। চীনা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পাওয়া ঘটনার আগে ও পরের স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, মিতেরি সেতুর প্রায় ২০ কিলোমিটার উজানে বরফ ও ধ্বংসাবশেষ নদীর প্রবাহ আটকে দিয়েছিল। সেখানে সাময়িক জলাধারের মতো পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার পর বাধাটি ভেঙে যায়।

পরাজুলি বলেন, তুষার ও ভূমিধসের পর ধ্বংসাবশেষ মিলে একটি জলাধার তৈরি হয়েছিল। পরে সেটি ভেঙে হঠাৎ করে বিপুল পানি ছেড়ে দেয়। পানির সঙ্গে বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ মিশে যাওয়ায় স্রোতের গভীরতা ও শক্তি অনেক বেড়ে যায়।

বন্যার সময় ওই এলাকায় উল্লেখযোগ্য বৃষ্টিপাতের খবরও পাওয়া যায়নি। নেপালের পানিবিদ্যা ও আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, মঙ্গলবার ও বুধবার রাসুওয়া এলাকায় ভারী বৃষ্টিপাত হয়নি। স্যাটেলাইট ও আবহাওয়া কেন্দ্রের তথ্য বিশ্লেষণেও গত এক সপ্তাহে সেখানে ব্যাপক বৃষ্টিপাতের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

ঘটনার সময় বুধবার সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটের দিকে নেপাল-চীন সীমান্ত এলাকায় শক্তিশালী কম্পন অনুভূত হয়। প্রথমে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) এটিকে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্প হিসেবে শনাক্ত করেছিল। পরে সংস্থাটি জানায়, সেটি ভূমিকম্প নয়; বরং শক্তিশালী ভূমিধসের কারণে ওই কম্পন সৃষ্টি হয়েছিল। ভূমিধসটির শক্তি প্রায় ৫ দশমিক ২ মাত্রার ভূমিকম্পের সমতুল্য ছিল।

ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ববিদ বিজ্ঞানী ড্যানিয়েল শুগার বলেন, ঘটনাটির পূর্ণ কারণ নিশ্চিত করতে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। তাঁর ধারণা, পাহাড় থেকে দ্রুত নেমে আসা বরফ ও পাথরের স্রোত পথে থাকা মাটি ও পলিমাটি সঙ্গে নিয়ে নদীতে পড়ে। বর্ষাকালের কারণে মাটি আগে থেকেই পানিতে সিক্ত থাকায় বিপুল পরিমাণ পানি ও ধ্বংসাবশেষ একসঙ্গে ভাটির দিকে ধেয়ে যায়।

এদিকে শুরুতে হিমবাহ হ্রদ ভেঙে বন্যা হয়েছে কি না, সেই সম্ভাবনাও বিবেচনা করা হয়েছিল। তবে জার্মানির ফ্রেই ইউনিভার্সিটি বার্লিনের ভূ-রূপবিদ্যার অধ্যাপক ভলফগ্যাং শোয়াংহার্ট বলেন, এখন পর্যন্ত পাওয়া স্যাটেলাইট ছবিতে বন্যার উৎসের উজানে বড় কোনো হিমবাহ হ্রদের অস্তিত্ব দেখা যাচ্ছে না।

তবে কাঠমান্ডু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রিজান ভক্ত কায়স্থ বলেন, কোনো হিমবাহ হ্রদ এতে ভূমিকা রেখেছিল কি না, তা নিশ্চিত হতে আরও কয়েক দিন সময় লাগতে পারে। কারণ ওই অঞ্চলে অতীতেও হিমবাহ হ্রদ ভেঙে আকস্মিক বন্যার ঘটনা ঘটেছে।

গত বছরের ৮ জুলাই একই ভুটেকোশি নদীতে আকস্মিক বন্যা হয়েছিল। সে সময় নেপালের জলবিদ্যা ও আবহাওয়া বিভাগ জানিয়েছিল, নেপাল-চীন সীমান্তের কাছে লহেন্দে নদীতে একটি হিমবাহ হ্রদ ভেঙে যাওয়ার কারণে বন্যার সৃষ্টি হয়েছিল।

এবারের ঘটনায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও খতিয়ে দেখছেন বিজ্ঞানীরা। হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলের হিমবাহ দ্রুত গলছে এবং ২০০০ সালের পর সেখানে বরফ হারানোর হার বেড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে বরফ ও পাহাড়ের ফাটলে পানি ঢুকে ঢালকে দুর্বল করে দিতে পারে। এতে হিমবাহ বা পাহাড়ের বড় অংশ ধসে পড়ার ঝুঁকি বাড়ে।

তবে এবারের বন্যার সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি সম্পর্ক নিশ্চিত করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, নেপালের ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার সবচেয়ে সম্ভাব্য কারণ হলো পাহাড়ের ওপর থেকে বরফ, পাথর ও ধ্বংসাবশেষের বিশাল ধস। এতে লহেন্দে নদীর প্রবাহ আটকে সাময়িক জলাধার তৈরি হয়ে থাকতে পারে। পরে সেই প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে বিপুল পানি ও ধ্বংসাবশেষ ভুটেকোশি নদীর দিকে ধেয়ে এসে এই ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি করে।

তবে বিপুল পরিমাণ পানি ঠিক কোথা থেকে এসেছে এবং এতে হিমবাহ হ্রদের কোনো ভূমিকা ছিল কি না, তা নিশ্চিত হতে আরও স্যাটেলাইট বিশ্লেষণ ও মাঠপর্যায়ের তদন্ত প্রয়োজন।

(ঢাকাটাইমস/২৭ আগস্ট/আরজেড)

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ
গাজীপুরে ঝুটের গুদামে ভয়াবহ আগুন, নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের ৫ ইউনিট
বিরল চন্দ্রগ্রহণ যেসব অঞ্চলে আজ থেকে দেখা মিলবে
ঢাকাসহ দেশের ৮ অঞ্চলে বৃষ্টি ও বজ্রবৃষ্টির পূর্বাভাস
বিশেষ প্রতিবেদন তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা