শৈশব পেরিয়ে, এখনও শরণার্থী

ফেরার অপেক্ষায় বেড়ে ওঠা একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ কোথায়?
“প্রত্যাবাসন ও ভবিষ্যৎ প্রস্তুতি পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য প্রস্তুতি যেমন চলবে, তেমনি সেই প্রত্যাবাসনের অপেক্ষায় একটি প্রজন্মের নয়-দশটি বছর হারিয়ে যেতে দেওয়া যাবে না।”
২০১৭ সালের আগস্টের শেষ সপ্তাহ থেকে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে এসেছিল সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা। কেউ এসেছিল কোলে শিশু নিয়ে, কেউ বৃদ্ধ মা-বাবাকে সঙ্গে নিয়ে, কেউ আবার কয়েক দিনের পথ হেঁটে। তাদের সঙ্গে ছিল না ঘর, জমি কিংবা সম্পদের নিশ্চয়তা—ছিল শুধু নিরাপদে বেঁচে থাকার আকুতি। সেদিন আমরা এটিকে দেখেছিলাম একটি জরুরি মানবিক সংকট হিসেবে। আজ নয় বছর পর সেই জরুরি সংকট একটি দীর্ঘস্থায়ী বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। কিন্তু এই নয় বছরে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি হয়তো শরণার্থীর সংখ্যায় নয়—একটি প্রজন্মের বয়সে। ২০১৭ সালে যে শিশুটি এক বা দুই বছরের ছিল, আজ তার বয়স দশ বা এগারো। পাঁচ বছর বয়সে যে শিশু বাংলাদেশে এসেছিল, আজ সে চৌদ্দ বছরের কিশোর। যে শিশু হয়তো মায়ের আঁচল ধরে সীমান্ত পার হয়েছিল, আজ সে নিজেই জীবনের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন করার বয়সে পৌঁছে গেছে।
তাই রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকটের নয় বছর পূর্তিতে আমাদের প্রশ্ন শুধু হওয়া উচিত নয়—তারা কবে ফিরবে? আরও কঠিন প্রশ্ন হলো—ততদিনে তারা কী হয়ে উঠবে?একটি জরুরি সংকট থেকে দীর্ঘস্থায়ী বাস্তবতা
২০১৭ সালের পর বাংলাদেশ রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়ে যে মানবিক দায়িত্ব পালন করেছে, তার ব্যাপ্তি বিশাল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জনসংখ্যা বেড়েছে, বেড়েছে প্রয়োজনও। ২০২৫ সালের সমন্বিত সাড়া পরিকল্পনা (Joint Response Plan—JRP)-এ প্রায় ১৪ লাখ ৮০ হাজার মানুষকে সহায়তার আওতায় আনার লক্ষ্য ছিল; এর মধ্যে ছিলেন কক্সবাজার ও ভাসানচরের রোহিঙ্গা শরণার্থী এবং উখিয়া-টেকনাফের ক্ষতিগ্রস্ত স্থানীয় জনগোষ্ঠী। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর জীবনকে ঘিরে কক্সবাজারে গড়ে উঠেছে একটি অভূতপূর্ব মানবিক কর্মযজ্ঞ।
খাদ্য, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, পানি ও স্যানিটেশন, আশ্রয়, সুরক্ষা, শিশুর সুরক্ষা, নারী ও কিশোরীদের নিরাপত্তা, শিক্ষা, জীবিকা ও দক্ষতা উন্নয়ন—প্রতিটি ক্ষেত্রেই সরকার, জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক ও দেশীয় বেসরকারি সংস্থা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠী একসঙ্গে কাজ করছে। ২০২৫ সালের সমন্বিত সাড়া পরিকল্পনায় ১১৩টি অংশীদার সংস্থা কাজ করেছে, যার প্রায় অর্ধেকই বাংলাদেশের জাতীয় সংস্থা। নয় বছর ধরে এই বিশাল কর্মযজ্ঞের মূল লক্ষ্য ছিল মানুষকে বাঁচিয়ে রাখা, সুরক্ষা দেওয়া এবং মর্যাদার সঙ্গে জীবনযাপনের ন্যূনতম সুযোগ নিশ্চিত করা। কিন্তু একটি দীর্ঘস্থায়ী সংকটে এসে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে—মানুষকে শুধু বাঁচিয়ে রাখা আর মানুষের ভবিষ্যৎ তৈরি করা—দুটো কি একই বিষয়?
অর্থায়ন কমে, কিন্তু প্রয়োজন কমে না
নয় বছর আগে যে সংকটের শুরু হয়েছিল, তার সঙ্গে আজকের সংকটের একটি বড় পার্থক্য আছে। তখন প্রয়োজন ছিল জরুরি সহায়তা; আজ প্রয়োজন একই সঙ্গে বেঁচে থাকা এবং ভবিষ্যৎ তৈরি করার। অথচ ঠিক এই সময়েই আন্তর্জাতিক অর্থায়নের প্রবাহ কমছে।
২০১৮ সালে রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় সমন্বিত সাড়া পরিকল্পনায় (Joint Response Plan—JRP) প্রায় ৯৫১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রয়োজনের বিপরীতে ৬৮৮ মিলিয়ন ডলার পাওয়া গিয়েছিল—অর্থাৎ প্রায় ৭২ শতাংশ। পরবর্তী কয়েক বছরেও অর্থায়ন মোটামুটি ৭০–৭৫ শতাংশের মধ্যে ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে সেই ব্যবধান বাড়তে শুরু করেছে। ২০২৪ সালে ৮৫২.৪ মিলিয়ন ডলারের প্রয়োজনের বিপরীতে পাওয়া গেছে প্রায় ৫৮১ মিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ ৬৮ শতাংশ। ২০২৫ সালে প্রয়োজন বেড়ে দাঁড়ায় ৯৩৪.৫ মিলিয়ন ডলারে, কিন্তু বছরের শেষ দিকেও অর্থায়ন ছিল মাত্র প্রায় ৩৮ শতাংশ। অর্থাৎ, নয় বছর পর সংকটটি ছোট হয়নি—বরং অর্থায়নের সক্ষমতাই ছোট হয়ে আসছে।
২০২৬ সালের চিত্রটি আরও উদ্বেগজনক। এ বছর প্রয়োজন নির্ধারণ করা হয়েছে ৭১০.৫ মিলিয়ন ডলার—গত বছরের আবেদনের তুলনায় ২৬ শতাংশ কম। এই কমে যাওয়া প্রয়োজনের কারণে নয়; বরং সীমিত সম্পদের মধ্যে সবচেয়ে জরুরি ও জীবনরক্ষাকারী সেবাগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে পুরো কার্যক্রমকে সংকুচিত করতে হয়েছে।
এখানেই নয় বছরের রোহিঙ্গা সংকটের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্যটি ধরা পড়ে—
সংকট দীর্ঘ হচ্ছে,
একটি প্রজন্ম বড় হচ্ছে,
প্রয়োজনের ধরন আরও জটিল হচ্ছে—
কিন্তু অর্থায়নের জায়গাটি ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে।
প্রশ্ন তাই শুধু কত টাকা পাওয়া গেল, তা নয়। প্রশ্ন হলো—অর্থের ঘাটতি যখন বাড়ছে, তখন আমরা কোন প্রয়োজনগুলোকে বাদ দিতে বাধ্য হব? শিক্ষা? দক্ষতা উন্নয়ন? সুরক্ষা? নাকি সেই প্রজন্মের ভবিষ্যৎ, যারা নয় বছর ধরে ফিরে যাওয়ার অপেক্ষায় বড় হয়ে উঠছে?
এটি আর শুধু একটি অর্থের ঘাটতি নয়। এটি একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা।নয় বছর পর সেই শিশুটির কী হবে?
রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকটের সবচেয়ে জটিল জায়গাগুলোর একটি শিক্ষা। জরুরি পরিস্থিতির শুরুতে অস্থায়ী শিক্ষাকেন্দ্র ছিল প্রয়োজনীয় ও বাস্তবসম্মত। পরবর্তী সময়ে মিয়ানমার কারিকুলাম চালুর মাধ্যমে শিশুদের নিজ দেশের ভাষা ও শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে সংযোগ রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। এর একটি বড় উদ্দেশ্য—ভবিষ্যতে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন হলে তারা যেন মিয়ানমারে শিক্ষা চালিয়ে যেতে পারে। উদ্দেশ্যটি যৌক্তিক। কিন্তু নয় বছর পর প্রশ্নটি আরও কঠিন। যে ভবিষ্যতের জন্য আমরা তাদের প্রস্তুত করছি, সেই ভবিষ্যৎ যদি এখনও অনিশ্চিত থাকে, তাহলে বর্তমান ভবিষ্যতের জন্য আমরা তাদের কতটা প্রস্তুত করছি?
একজন চৌদ্দ বছরের কিশোরের শুধু প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষা যথেষ্ট নয়। তার প্রয়োজন বয়স-উপযোগী শিক্ষা, মাধ্যমিক পর্যায়ে যাওয়ার সুযোগ, দক্ষতা, প্রযুক্তিগত জ্ঞান এবং নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা। কারণ নয় বছর আগে যে শিশু ছিল “নতুন আগমনকারী”, আজ সে একজন কিশোর। আগামী কয়েক বছর পর সে তরুণ হবে। আর একটি বড় তরুণ জনগোষ্ঠী যদি দীর্ঘদিন শিক্ষা, দক্ষতা, কাজ ও অর্থবহ সম্পৃক্ততার বাইরে থাকে, তাহলে তার ভেতরে হতাশা, অস্থিরতা ও ভবিষ্যৎহীনতার অনুভূতি তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। সেই শূন্যতা অপরাধ, মাদক, পাচার, সহিংসতা বা বিভিন্ন ধরনের শোষণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এর প্রভাব শুধু ক্যাম্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; ধীরে ধীরে তা আশ্রয়দাতা স্থানীয় জনগোষ্ঠী এবং বৃহত্তর বাংলাদেশের ওপরও পড়তে পারে। তাই শিক্ষা এখানে শুধু একটি মানবিক খাত নয়। এটি সামাজিক স্থিতিশীলতার বিনিয়োগ। প্রত্যাবাসনই সমাধান—কিন্তু তার আগ পর্যন্ত?
বাংলাদেশের অবস্থান পরিষ্কার—রোহিঙ্গা সমস্যার স্থায়ী সমাধান হলো নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অবস্থানও একই। কিন্তু বাস্তবতা হলো, মিয়ানমারের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখনও প্রত্যাবাসনের জন্য অনুকূল নয়। ফলে নয় বছর পরও প্রত্যাবাসনের প্রশ্নটি মূলত একটি রাজনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক সমীকরণের মধ্যে আটকে আছে। এখানে বাংলাদেশের সামনে দ্বৈত দায়িত্ব।
একদিকে, প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা আরও জোরালো করতে হবে। রোহিঙ্গা সংকটকে শুধু মানবিক সহায়তার আলোচনায় সীমাবদ্ধ না রেখে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক মঞ্চে আরও শক্তভাবে তুলে ধরতে হবে। মিয়ানমারে নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব, অধিকার ও মর্যাদার প্রশ্নগুলোকে আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে রাখতে হবে। অন্যদিকে, প্রত্যাবাসন না হওয়া পর্যন্ত একটি প্রজন্মকে নিষ্ক্রিয় করে রাখা যাবে না। ফেরার অধিকার যেমন গুরুত্বপূর্ণ, অপেক্ষার সময়টিও তেমন গুরুত্বপূর্ণ। শরণার্থী জনগোষ্ঠীকে শুধু সহায়তার গ্রহীতা হিসেবে দেখব কেন? এখানেই বাংলাদেশের সামনে একটি নতুন সুযোগ আছে।
বর্তমান সমন্বিত সাড়া পরিকল্পনাতেই (Joint Response Plan—JRP) শরণার্থী ও আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর জন্য জীবিকা, কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে। ২০২২ সালে বাংলাদেশ সরকার ও জাতিসংঘের মধ্যে শরণার্থী ও আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর দক্ষতা উন্নয়ন নিয়ে একটি কাঠামোও অনুমোদিত হয়েছে। অর্থাৎ ভিত্তিটা তৈরি হয়েছে। এখন প্রয়োজন আরও একটু সাহসী চিন্তা। শরণার্থীদের শুধু ত্রাণের গ্রহীতা হিসেবে না দেখে দক্ষতা ও সক্ষমতাসম্পন্ন মানুষ হিসেবে দেখতে হবে। যে তরুণ সেলাই শিখেছে, তাকে শুধু প্রশিক্ষণের সনদ দিয়ে থামিয়ে না রেখে বাজারের সঙ্গে যুক্ত করা যায় কি না; যে তরুণ বৈদ্যুতিক কাজ, মোবাইল সার্ভিসিং, কৃষি, কারিগরি কাজ বা ডিজিটাল দক্ষতা অর্জন করেছে, তার দক্ষতাকে কীভাবে উৎপাদনশীল কাজে ব্যবহার করা যায়—সেটি ভাবতে হবে। অবশ্যই এটি বাংলাদেশের শ্রমবাজারে অবাধ প্রবেশের প্রশ্ন নয়। এটি হতে পারে নিয়ন্ত্রিত, নীতিনির্ভর, অনুমোদিত এবং প্রত্যাবাসন-উপযোগী দক্ষতা উন্নয়নের একটি কাঠামো।
এমনকি কিছু ক্ষেত্রে ক্যাম্পের ভেতরেই উৎপাদনমুখী কার্যক্রম তৈরি করা সম্ভব—যেখানে শরণার্থীদের দক্ষতা ব্যবহার করে তৈরি পণ্য স্থানীয় বাজারের সঙ্গে নির্দিষ্ট নীতিমালার আওতায় যুক্ত হতে পারে। এতে একদিকে তাদের আত্মনির্ভরতার অনুভূতি বাড়বে, অন্যদিকে মানবিক সহায়তার ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীলতা কিছুটা কমতে পারে। বর্তমান দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচিতেও মিয়ানমার বা বাংলাদেশ—উভয় জায়গায় ভবিষ্যতে ব্যবহার করা যায় এমন “Transferable Skills”, “Digital Literacy” এবং “Green Economy”-সম্পর্কিত দক্ষতার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এটাই হয়তো আমাদের ভাবনার জায়গা। প্রত্যাবাসনের প্রস্তুতি এবং বর্তমান জীবনের সক্ষমতা—দুটিকে পরস্পরের বিপরীত না দেখে একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়া। বাংলাদেশের জন্যও এটি একটি বিনিয়োগ।
এখানে আরেকটি বিষয় আমাদের মনে রাখা দরকার। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী শুধু বাংলাদেশের জন্য একটি মানবিক দায়িত্ব নয়; দীর্ঘমেয়াদে এটি একটি বড় সামাজিক বাস্তবতাও। কক্সবাজারের স্থানীয় জনগোষ্ঠী গত নয় বছরে এই সংকটের চাপ বহন করেছে। বাজার, পরিবেশ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও স্থানীয় সেবার ওপর চাপ বেড়েছে। তাই রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য যেমন সহায়তা প্রয়োজন, তেমনি আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর জন্যও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ প্রয়োজন। একই সঙ্গে তরুণ শরণার্থীদের দক্ষ ও উৎপাদনশীল করে তোলার অর্থ হলো ভবিষ্যতের ঝুঁকি কমানো। একজন দক্ষ তরুণ একটি সম্ভাবনা। একজন বেকার, হতাশ তরুণ একটি ঝুঁকি। নীতিনির্ধারণের জায়গা থেকে আমাদের এই পার্থক্যটি এখনই গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
নয় বছর পর আমাদের নতুন প্রশ্ন করতে হবে। নয় বছর ধরে বাংলাদেশ আশ্রয় দিয়েছে। মানবিক সংস্থাগুলো কাজ করেছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় অর্থ দিয়েছে। কিন্তু এখন আন্তর্জাতিক অর্থায়ন কমছে, আর সংকটের সমাধান এখনও দূরে। তাই একই পদ্ধতিতে আরও একটি বছর পার করে দেওয়াই যথেষ্ট নয়। আমাদের একসঙ্গে তিনটি কাজ করতে হবে।
প্রথমত, প্রত্যাবাসনের জন্য বাংলাদেশের কূটনৈতিক ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ আরও শক্তিশালী করতে হবে—এটি যেন শুধুমাত্র একটি মানবিক এজেন্ডার মোড়কে আবদ্ধ না থাকে, বরং এটি যেনো বৈশ্বিক রাজনৈতিক আলোচনার অংশ হয়।
দ্বিতীয়ত, প্রত্যাবাসন না হওয়া পর্যন্ত রোহিঙ্গা তরুণ প্রজন্মকে শিক্ষা, দক্ষতা, প্রযুক্তি ও নিয়ন্ত্রিত জীবিকা সুযোগের মাধ্যমে প্রস্তুত করতে হবে।
তৃতীয়ত, এই পুরো প্রক্রিয়ায় আশ্রয়দাতা স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে, যাতে সহাবস্থান ও সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকে।
এটি রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে বসবাস করার অনুমতি দেবার প্রস্তাব নয়। আবার শুধু প্রত্যাবাসনের অপেক্ষায় একটি প্রজন্মকে স্থবির করে রাখার প্রস্তাবও নয়। এটি হলো প্রত্যাবাসনের জন্য প্রস্তুত করা এবং অপেক্ষার সময়টিকে অর্থবহ করে তোলা—দুটিকে একই সঙ্গে দেখা। কারণ শেষ পর্যন্ত রোহিঙ্গা সংকট শুধু একটি শরণার্থী সংকট নয়। এটি একটি প্রজন্মের সংকট। ২০১৭ সালে যে শিশুটি মায়ের কোলে করে বাংলাদেশে এসেছিল, নয় বছর পর সে আর শিশু নেই। সে কিশোর। আর কয়েক বছর পর সে তরুণ হবে। তাই নয় বছর পূর্তির সময়ে আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়তো “তারা কবে ফিরবে?” নয়; বরং—“ততদিনে আমরা তাদের কী হতে দিচ্ছি?”
যদি আমরা তাদের শুধু অপেক্ষা করতে দিই, তাহলে নয় বছর পরও সংকট চলবে। কিন্তু যদি আমরা তাদের শিক্ষা দিই, দক্ষ করি, নিরাপদ ও অর্থবহ কাজে যুক্ত করি, মর্যাদা দিই এবং একই সঙ্গে তাদের নিরাপদ ও স্বেচ্ছামূলক প্রত্যাবাসনের জন্য বৈশ্বিক রাজনৈতিক চাপ অব্যাহত রাখি—তাহলে অপেক্ষার এই নয় বছর অন্তত একটি হারিয়ে যাওয়া প্রজন্মে পরিণত হবে না। এই প্রজন্মের ভবিষ্যৎ তাই শুধু রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ নয়। এটি বাংলাদেশেরও ভবিষ্যৎ।
লেখক: উন্নয়নকর্মী, বাংলাদেশ
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













































