জুম চাষ: ঐতিহ্য থেকে তথ্যনির্ভর কৃষি-উদ্ভাবনের পথে

আবুল ফয়েজ মোঃ হাবিবুর রহমান
  প্রকাশিত : ১৭ আগস্ট ২০২৬, ১৫:৪০
অ- অ+

বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলের জুম চাষকে আমরা সাধারণত একটি প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী কৃষিপদ্ধতি হিসেবে বিবেচনা করি। কিন্তু জুমের গুরুত্ব শুধু ঐতিহ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর খাদ্যনিরাপত্তা, স্থানীয় বীজ সংরক্ষণ, শস্য বৈচিত্র্য, জীবিকা এবং প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের দীর্ঘদিনের অভিযোজন। আমার দৃষ্টিতে, জুম চাষকে কেবল পুরোনো কৃষিপদ্ধতি হিসেবে দেখার পরিবর্তে তথ্য, গবেষণা ও আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে একটি টেকসই কৃষি-উদ্ভাবনের ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

জুম চাষের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো একই জমিতে বিভিন্ন ধরনের ফসল উৎপাদন। ধান, ভুট্টা, তিল, ডাল, মরিচ, কুমড়া, শসা, হলুদ, আদাসহ নানা ফসল একই কৃষিব্যবস্থার মধ্যে স্থান পায়। এর ফলে একটি ফসলের ওপর কৃষকের নির্ভরতা কমে এবং খাদ্য ও পুষ্টির বৈচিত্র্য বজায় থাকে। একই সঙ্গে স্থানীয় জাতের বীজ প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সংরক্ষিত হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময়ে স্থানীয় পরিবেশে অভিযোজিত এসব বীজ ভবিষ্যতের কৃষির জন্য গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হতে পারে।

তবে জুম চাষের বাস্তবতা নিয়ে আমাদের আবেগের পাশাপাশি তথ্যের দিকেও তাকাতে হবে। কোথায় কত জমিতে জুম চাষ হচ্ছে, কত পরিবার এর ওপর নির্ভরশীল, কী কী ফসল উৎপাদিত হচ্ছে, উৎপাদন খরচ কত, কৃষকের আয় কত এবং জমির ওপর পরিবেশগত প্রভাব কী—এসব বিষয়ে নিয়মিত ও নির্ভরযোগ্য তথ্য থাকা জরুরি। তথ্য ছাড়া ভালো কৃষিনীতি তৈরি করা কঠিন।

এ জন্য আমার প্রস্তাব হলো, একটি জাতীয় জুম কৃষি তথ্যভান্ডার তৈরি করা যেতে পারে। উপজেলা ও মাঠপর্যায় থেকে তথ্য সংগ্রহ করে ডিজিটাল পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করা হলে সরকার অঞ্চলভেদে প্রয়োজনীয় নীতি গ্রহণ করতে পারবে। কোথাও যদি স্থানীয় বীজ হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে, সেখানে বীজ সংরক্ষণ কর্মসূচি নেওয়া যাবে। কোথাও বাজারজাতকরণ সমস্যা থাকলে বাজারসংযোগ ও সংগ্রহকেন্দ্র স্থাপন করা যাবে। আবার কোনো এলাকায় মাটি ক্ষয়ের ঝুঁকি বেশি হলে সেখানে মাটি সংরক্ষণ ও পরিবেশবান্ধব কৃষি প্রযুক্তি প্রয়োগ করা যাবে।

অর্থাৎ, সারা পাহাড়ের জন্য একই ধরনের নীতি না নিয়ে এলাকাভিত্তিক তথ্যের ওপর নির্ভর করে নীতি গ্রহণ করা সম্ভব হবে।

এখানেই জুম চাষের সঙ্গে নতুনত্ব বা Innovation-এর সম্পর্ক তৈরি হয়। আধুনিক প্রযুক্তির অর্থ ঐতিহ্যকে বাদ দেওয়া নয়। বরং স্থানীয় কৃষকের জ্ঞানকে বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত করা। মাটি পরীক্ষা, আবহাওয়ার পূর্বাভাস, উন্নত কৃষি ব্যবস্থাপনা, জৈব সার, মাটির আর্দ্রতা সংরক্ষণ এবং রোগ-পোকা ব্যবস্থাপনার তথ্য ব্যবহার করে জুম চাষকে আরও উৎপাদনশীল ও পরিবেশবান্ধব করা সম্ভব।

ডিজিটাল প্রযুক্তিও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। মোবাইল ফোনের মাধ্যমে আবহাওয়ার পূর্বাভাস, বৃষ্টির সম্ভাবনা, ফসলের রোগ সম্পর্কে সতর্কতা, বীজ বপনের উপযুক্ত সময় এবং বাজারদর কৃষকের কাছে পৌঁছে দেওয়া যেতে পারে। এর ফলে জুম কৃষক শুধু উৎপাদক হিসেবে নয়, তথ্যনির্ভর আধুনিক কৃষি ব্যবস্থার অংশীদার হয়ে উঠবেন।

জুমের পণ্য নিয়ে প্রচারণার ক্ষেত্রেও নতুন চিন্তা প্রয়োজন। পাহাড়ি জুমের চাল, হলুদ, আদা, মরিচ, তিল, ডালসহ বিভিন্ন পণ্যকে স্থানীয় বৈচিত্র্যপূর্ণ কৃষিপণ্য হিসেবে ব্র্যান্ডিং করা যেতে পারে। পণ্যের সঙ্গে উৎপাদন এলাকা, স্থানীয় জাত, কৃষকের পরিচয় ও উৎপাদন পদ্ধতির তথ্য যুক্ত করা হলে এর বাজারমূল্য বাড়তে পারে।

এখানে পর্যটন শিল্পের সঙ্গেও একটি নতুন সংযোগ তৈরি করা সম্ভব। পাহাড়ি পর্যটনকেন্দ্রে স্থানীয় জুম পণ্য ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্য বিক্রির ব্যবস্থা করা গেলে পর্যটন থেকে কৃষকের আয় বাড়বে। একই সঙ্গে পাহাড়ের কৃষি ও সংস্কৃতির সঙ্গে পর্যটকদের পরিচয় ঘটবে।

সরকারি প্রণোদনার বিষয়টিও নতুনভাবে ভাবা দরকার। শুধু নগদ অর্থ বিতরণ করে জুম চাষের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন সম্ভব নয়। প্রয়োজন বীজ, প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি, বাজার, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং আর্থিক সহায়তার সমন্বিত ব্যবস্থা।

বিশেষ করে স্থানীয় বীজ সংরক্ষণকারী, বহুফসলি চাষকারী এবং পরিবেশবান্ধব কৃষিপদ্ধতি অনুসরণকারী কৃষকদের জন্য ফলাফলভিত্তিক প্রণোদনা চালু করা যেতে পারে। এতে সরকারি অর্থ ব্যয়ের কার্যকারিতা বাড়বে এবং কৃষকরাও টেকসই পদ্ধতি গ্রহণে উৎসাহিত হবেন।

তবে জুম চাষের পরিবেশগত দিকটি উপেক্ষা করা যাবে না। অনিয়ন্ত্রিতভাবে বা খুব স্বল্প পতিতকাল রেখে জুম চাষ করলে মাটির উর্বরতা কমে যাওয়া, মাটি ক্ষয় এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। তাই লক্ষ্য হওয়া উচিত জুম চাষ বন্ধ করা নয়; বরং “Sustainable Jhum” বা টেকসই জুম ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা।

এ জন্য স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জ্ঞানকে গুরুত্ব দিয়ে গবেষণা করা প্রয়োজন—কোন এলাকায় কত সময় পতিতকাল প্রয়োজন, কোন ফসল মাটির জন্য উপযোগী, কোন পদ্ধতিতে মাটি ক্ষয় কমে এবং কোন ধরনের বহুফসলি ব্যবস্থা কৃষকের জন্য সবচেয়ে লাভজনক। এসব প্রশ্নের উত্তর স্থানীয় পর্যায়ের গবেষণা ও তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে বের করা সম্ভব।

আমার মতে, জুম চাষকে বাংলাদেশের বৃহত্তর কৃষি অর্থনীতির সঙ্গেও যুক্ত করা উচিত। উৎপাদিত পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্যাকেজিং ও বাজারজাতকরণের মাধ্যমে স্থানীয় ক্ষুদ্র শিল্প গড়ে উঠতে পারে। নারী ও তরুণদের এই মূল্যশৃঙ্খলে যুক্ত করা গেলে পাহাড়ি অঞ্চলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।

সবশেষে, জুম চাষ নিয়ে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন প্রয়োজন। এটিকে শুধু অতীতের একটি কৃষিপদ্ধতি হিসেবে দেখলে এর ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা আমরা হারাব। আবার পরিবেশগত ঝুঁকিগুলো অস্বীকার করাও ঠিক হবে না। প্রয়োজন ঐতিহ্য ও আধুনিক বিজ্ঞানের মধ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সেতুবন্ধন।

আমার প্রস্তাব হলো—“তথ্য → গবেষণা → উদ্ভাবন → পরীক্ষামূলক প্রয়োগ → মূল্যায়ন → প্রণোদনা → বাজার সম্প্রসারণ”—এই ধারায় জুম চাষের উন্নয়ন পরিকল্পনা করা।

জুম চাষকে সমস্যা হিসেবে দেখার পরিবর্তে যদি আমরা এটিকে শস্য বৈচিত্র্য, খাদ্যনিরাপত্তা, কৃষকের আয়, স্থানীয় বীজ সংরক্ষণ এব্যবস্থাপনা পরিচালক ব্যবস্থাপনা পরিচালক বং পরিবেশবান্ধব কৃষির সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবে দেখি, তাহলে পাহাড়ি কৃষিতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে।

জুম চাষ বন্ধ নয়—তথ্য ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে জুম চাষের টেকসই রূপান্তরই হতে পারে ভবিষ্যতের নীতি।

লেখক: ব্যবস্থাপনা পরিচালক, নর্থ বেঙ্গল পেপার মিলস লিমিটেড

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৭ শিশুর মৃত্যু
কাশিয়ানীতে ঢাকা-খুলনা মহাসড়ক অবরোধ করে ছাত্রলীগের বিক্ষোভ
স্বৈরাচারের রেখে যাওয়া ভঙ্গুর দেশে ১৮০ দিন পার করাই সরকারের বড় অর্জন: আতিকুর রহমান রুমন
ডেমরায় উদ্ধার সেই পাইপবোমা নিষ্ক্রিয় করল সিটিটিসি
বিশেষ প্রতিবেদন তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা