সুপারশপের বারকোডে অদৃশ্য জালিয়াতির ছায়া

এক তপ্ত দুপুরে ঢাকার একটি নামী সুপারশপের ঠাণ্ডা বাতাসের নিচে ট্রলি ঠেলে ক্যাশ কাউন্টারে এসে দাঁড়ান মধ্যবিত্ত সরকারি চাকরিজীবী আমজাদ আলী। কাউন্টারে বারকোড স্ক্যানার দিয়ে বিল করে ক্যাশিয়ার যখন ৩ হাজার ২০০ টাকার বিল ধরিয়ে দিল, তখন আমজাদ আলী কিছুটা চমকে উঠলেন। প্যাকেটের গায়ে আলতো করে কেটে ছোট হরফে লেখা দাম আর কম্পিউটারের মনিটরের ডিজিটাল মূল্যের ফারাকটা দেখে যখন তিনি প্রশ্ন তুললেন, তখন পেছনের দীর্ঘ লাইনের মানুষের তাড়া আর ক্যাশিয়ারের অবজ্ঞাসূচক চাহনির মুখে স্রেফ মুখ বুজে বিল মিটিয়ে বেরিয়ে এলেন।
এটি কেবল আমজাদ আলীর একার পকেট কাটার হাহাকার নয়, বরং আমাদের দেশের শহুরে লাইফস্টাইলের আড়ালে গড়ে ওঠা এক অতি মুনাফালোভী, কর্পোরেট সিন্ডিকেটের নগ্ন বাস্তবতার উদাহরণ।
যখনই কোনো সচেতন ভোক্তা একটু ভালো মানের আশায় এবং সৎ ব্যবসার বিশ্বাসে সুপারশপে পা রাখেন, তখনই অনেক ক্ষেত্রে শুরু হয় ডিজিটাল বারকোড আর ডাবল প্রাইসিংয়ের কারসাজিতে টাকা হাতানোর পৈশাচিক উৎসব। এই ভয়ানক বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ক আমাদের সাধারণ মানুষের কষ্টে অর্জিত অর্থ কেড়ে নিচ্ছে।
পরিসংখ্যান যা বলছে
সামষ্টিক খতিয়ান ও দেশের বিভিন্ন ভোক্তা অধিকার ফোরামের সাম্প্রতিক জরিপ বিশ্লেষণ করলে এই সংকটের গভীরতা বোঝা যায়। বর্তমানে সুপারশপে নিয়মিত কেনাকাটা করা পরিবারগুলোর মধ্যে ৬৫% ভুক্তভোগী মনে করেন যে, বিলের স্বচ্ছতা না থাকা এবং বারকোড স্ক্যানিংয়ের আড়ালে অতিরিক্ত চার্জের কারণে তারা তীব্র মানসিক ও আর্থিক হয়রানির শিকার হচ্ছেন। এই প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতার অভাবের পথ ধরে অনেক নামী ব্র্যান্ডের সুপারশপে ফ্রোজেন ফুডের ওজনে অতিরিক্ত বরফ জমিয়ে এবং ডাবল প্রাইসিংয়ের নামে কৃত্রিমভাবে বিল বাড়ানোর হার অবলীলায় ৪০% বৃদ্ধি পেয়েছে।
দেশের বিভিন্ন বিভাগীয় শহরের ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা প্রায় ২৫টি বড় চেইন শপ ও রিটেইল শপিং নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট তথ্য রয়েছে, যারা শেলফে কম দাম ঝুলিয়ে রেখে ক্যাশ কাউন্টারের কম্পিউটারে বেশি দাম কেটে নিয়ে মুনাফা নিশ্চিত করে।
বর্তমানের ভোক্তা অধিকার রক্ষা ও কনজিউমার রাইটস ফোরামের তথ্য অনুযায়ী, ওজনে কারচুপি ও ডাবল বিলিংয়ের নামে আদায় করা অতিরিক্ত অর্থের প্রায় ৭০% জুড়ে অবস্থান করছে অনাবশ্যক গ্লিচ ট্র্যাকিং, ফ্রোজেন ওজনে বরফের কৃত্রিম ভার এবং প্যাকেজিং জালিয়াতি, যা কোনো সাধারণ মৌখিক আশ্বাস বা লোকদেখানো অডিট দিয়ে আটকে রাখা যাচ্ছে না।
বিপণন নীতিশাস্ত্রের অবক্ষয় ও বাণিজ্যের ফাঁদ
আমরা যদি মানবিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও বাণিজ্যিক নীতিশাস্ত্রের দৃষ্টিকোণ থেকে এই সংকটের গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করি, তবে দেখতে পাব সুপারশপের বারকোড স্রেফ কোনো দ্রুত বিলিংয়ের যান্ত্রিক যন্ত্র নয়, বরং কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ও কর্পোরেট মালিকের কাছে তা ক্রেতার পকেট কাটার এক জাদুকরী মেশিন। আজকের এই ডিজিটাল কারচুপির মাধ্যমে ক্রেতা ঠকানোর মিছিল কোনো কাল্পনিক বিষয় নয়; বাণিজ্য গবেষকদের প্রকাশিত ৫০টির বেশি অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদনের প্রতিটি কলাম ছিল একেকটি প্রাতিষ্ঠানিক অরাজকতার জীবন্ত দলিল। কোনো আবেগের বশে নয়, বরং কঠিন উপাত্ত, সামষ্টিক যুক্তি ও বৈশ্বিক রেফারেন্স দিয়ে এই কসাইখানার আসল কুশীলবদের মুখোশ উন্মোচন করা হয়েছে।
মধ্যবিত্তের অর্থনৈতিক দেউলিয়াত্ব
আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের একটি বিশাল অংশই বারকোড ইআরপি সফটওয়্যার বা আইটি সিস্টেমের কারিগরি দিক সম্পর্কে সম্পূর্ণ জ্ঞানহীন এবং তারা যখন দেখে যে সুসজ্জিত এসি রুমের ওপারে টাই পরা কর্মকর্তারা অত্যন্ত ব্যস্তসমস্ত, তখনই তারা অন্ধের মতো কম্পিউটারের বিলের কথায় বিশ্বাস করে নিজেদের কষ্টার্জিত আয়ের টাকা দিয়ে দেয়। বাস্তব উদাহরণ হিসেবে, যখন কোনো সুপারশপের শেলফ থেকে ওয়ান প্লাস ওয়ান অফার দেখে কোনো গৃহিণী পণ্য ট্রলিতে নেন এবং কাউন্টারে আসার পর বলা হয় "আজ এই অফারটি সিস্টেমে আপডেট করা হয়নি, তাই রেগুলার প্রাইস আসবে", তখন দোষটি স্রেফ সেই কাউন্টার কর্মীর ওপর চাপানো হলেও নেপথ্যের খলনায়ক হলো সেই কর্পোরেট মালিক পক্ষ, যারা প্রতিটি আউটলেটের জন্য দৈনিক বিক্রির টার্গেট বেঁধে দেয়।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় যদি টেবিলের সীমানা পেরিয়ে প্রতিটি সুপারশপের ডিজিটাল প্রাইস ডাটাবেজে সেন্ট্রাল মনিটরিং এবং বিএসটিআই-এর ডিজিটাল ওজন ভেরিফিকেশন বোর্ড গঠন বাধ্যতামূলক না করে, তবে এ ধরনের জালিয়াতি থেকে ভোক্তারা রেহাই পাবেন না।
সামষ্টিক খাতের পুনর্জাগরণ
আজ যদি দেশের প্রতিটি সুপারশপ শতভাগ স্বচ্ছতা ও নৈতিকতার সাথে ব্যবসা পরিচালনা করত, তবে বাংলাদেশের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সেক্টর বা খাত সম্পূর্ণ নতুনভাবে বাঁচতে শিখে যেত এবং আমূল পরিবর্তনের ছোঁয়া পেত। প্রথমত, জাতীয় নীতিনির্ধারণী ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনা খাতে এক বিশাল বিপ্লব ঘটত।
দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের বাণিজ্য শিক্ষা ও সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট খাতের ধারণাই বদলে যেত। দক্ষ ও নৈতিক গ্রাজুয়েটদের হাত ধরে কর্পোরেট ও রিটেল সমন্বয়ে কম মূল্যে ভালো পণ্য প্রদান, কালোবাজারি ও ভুয়া ওজনের নোংরা খেলা চিরতরে বন্ধ করার সামাজিক ও তাত্ত্বিক রূপরেখা বাস্তবায়িত হতো। দেশের কৃষিপণ্য, ডায়াগনস্টিক প্যাকেজিং ও রিটেল জনশক্তি খাত আজ সবচেয়ে আধুনিক, নিরাপদ ও নাগরিক-বান্ধব রোল মডেল হিসেবে রূপান্তরিত হতো। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসত বড় বড় কর্পোরেট ব্র্যান্ডের প্রতি জনগণের বিশ্বাসের ক্ষেত্রে।
মনিটরিং
বৈধ ও সুরক্ষিত নিবিড় বাজার মনিটরিং সেবা আজ নিশ্চিত হলে দেশের প্রধান প্রধান ক্ষেত্রগুলো স্রেফ আইন পাসের গণ্ডি পেরিয়ে কীভাবে দৃশ্যমান ও টেকসই উন্নতি করতে হয়, তা বাস্তব উদাহরণের মাধ্যমে শিখিয়ে দিত:
- দেশীয় সরবরাহ শিল্প ও সাধারণ খুচরা চিকিৎসা খাত: সুপারশপ সেবার মূল ভিত্তি হলো ওজনের ও বিলের নির্ভুল মুহূর্তে সর্বোচ্চ নৈতিকতা বজায় রাখা। উদাহরণস্বরূপ, প্রতিটি আউটলেটে জাতীয় ভোক্তা অধিকারের গাইডলাইন মেনে ক্যাশ কাউন্টারে ২৪ ঘণ্টার সিসিটিভি ফুটেজ ও বিলিং সফটওয়্যারের লাইভ কাস্টমার ডিসপ্লে স্ক্রিন স্বজন ও ক্রেতাদের জন্য উন্মুক্ত রাখলে, তার ফলে আজ দেশীয় খাতের পাশাপাশি আধুনিক শপিংয়ের আস্থা বৃদ্ধি পেত এবং বিল বাড়ানোর কারণে হয়রানি শূন্যের কোঠায় নেমে আসত।
- ভৌগোলিক নিরাপত্তা ও কেন্দ্রীয় বাজার ট্র্যাকিং ব্যবস্থাপনা খাত: ডিজিটাল ডাটাবেজ ও আধুনিক মনিটরিং সিস্টেম দিয়ে আউটলেটগুলোর অনিয়ম নিয়ন্ত্রণে আমাদের প্রায়ই জনবলের অভাবের অজুহাত শুনতে হয়। উদাহরণস্বরূপ, প্রতিটি রিটেল চেইনের কেন্দ্রীয় সার্ভারের জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের রিয়েল-টাইম ড্যাশবোর্ড বাধ্যতামূলক থাকলে, কোনো মালিক পক্ষ কৃত্রিমভাবে দামের ভিন্নতা দেখিয়ে ডাবল বিল বা বরফ জমিয়ে ওজনে কারচুপির সাহসই পেত না, যার ফলে দেশের মার্কেটগুলো কসাইখানা থেকে রক্ষা পেয়ে নিরাপদ আনন্দালয়ে রূপান্তরিত হতো।
- সামাজিক নিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্য রক্ষা খাত: কর্পোরেট বাণিজ্যের শিকার হওয়া সাধারণ মানুষের সুরক্ষায় রাষ্ট্র সুপারশপগুলোর বার্ষিক লভ্যাংশ থেকে বিশেষায়িত কনজিউমার প্রোটেকশন ট্রাস্ট গঠন করতে পারত। উদাহরণস্বরূপ, ভুল প্রাইসিং ও অতিরিক্ত বিলের শিকার পরিবারের জন্য তাৎক্ষণিক ক্ষতিপূরণ, সন্তানদের শিক্ষার জন্য সহায়তা এবং ভুক্তভোগীদের সরকারি আইনি ও আর্থিক আইনি সহায়তা প্রাপ্তি নিশ্চিত হতো, যা অবহেলিত সাধারণ নাগরিকদের মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকার পরিবেশ তৈরি করত।
জবাবদিহিতা
ভালো মানের আশায় এসে সুপারশপের বারকোড স্ক্যানারের যান্ত্রিক শব্দের মাঝে ভোক্তার কষ্টার্জিত টাকা খোয়ানোর ঘাতক কর্পোরেট মালিক ও ক্যাশ ম্যানেজমেন্টের যেন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, সাধারণ মানুষের পকেট কাটা দেখেও চুপ থেকে আমরা ভোক্তাদের অধিকারকে সুরক্ষা দিতে সচেষ্ট কি না। আজ যদি আমরা ভোক্তা অধিকার ও দেশের বাণিজ্য আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে না পারি, তবে জাতি হিসেবে আমাদের নৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে পড়বে। ডাবল বিল বাণিজ্যের আসামিদের দ্রুততম সময়ে আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে শাস্তি নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।
নাগরিক প্রতিরোধ
বারকোডের এই বিল বাণিজ্য চিরতরে উপড়ে ফেলা এবং চাটুকারিতার নামে পৈশাচিক অভিশাপ থেকে মুক্তি পাওয়া কেবল কোনো নির্দিষ্ট মোবাইল কোর্ট বা টাস্কফোর্সের একক দায়িত্ব নয়। এটি এ দেশের প্রতিটি নাগরিক, সমাজ ও সামগ্রিক জাতির এক পরম ও পবিত্র कर्तव्य।
- ব্যক্তিগত কতর্ব্য ও ওয়ান-স্টপ নজরদারি: আমাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো কেনাকাটার মুহূর্তে কোনো চকচকে অফারের খপ্পরে পড়ে যাচাই না করে ট্রলিতে পণ্য না তোলা এবং বিলের প্রতিটি আইটেম হাসপাতালের বিলের মতো কাউন্টারে জেনেশুনে স্ক্যানারের সাথে মিলিয়ে না দেখে টাকা না দেওয়া। গরমিল দেখলে সরাসরি ভোক্তা অধিকারের হটলাইন ১৬১২১ বা জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে তথ্য পৌঁছে দেওয়া উচিত।
- আইনি নিশ্চয়তা ও রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার: কোনো ধরনের রাজনৈতিক চাপ বা রিটেল ওনার্স সিন্ডিকেটের ভয় ছাড়াই "ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯" এর কঠোর প্রয়োগ এবং বিল বাণিজ্যের বিচার প্রক্রিয়া যেন একটি নির্দিষ্ট মেয়াদের মধ্যে সম্পন্ন করা নিশ্চিত করা জাতির দায়িত্ব।
- দর্পণ ও নৈতিক মূল্যবোধ: আধুনিক প্রযুক্তি ও বর্তমান সমাজ আমাদের বলছে জগত এখন স্মার্ট রিটেল রূপান্তর ও স্বয়ংক্রিয় পেমেন্ট সেবার আধুনিকায়নের দিকে যাচ্ছে। কিন্তু আমাদের প্রজ্ঞা আজ আমাদের বলছে—নিজ ভেতরের সততা, নাগরিক দায়িত্ব ও সহমর্মিতার জাগরণ ছাড়া বাইরের কোনো অবকাঠামোগত উন্নয়নই টেকসই বা মানুষের জন্য কল্যাণকর নয়। দেশের আইন ও নিয়ম মেনে সৎ ব্যবসা পরিচালনা করা যেমন পেশাগত পবিত্র দায়িত্ব, দালালের খপ্পর থেকে কোনো অসহায় ভোক্তাকে বাঁচানোও তেমনি এক মহান আত্মিক ইবাদত।
শেষ করি আমজাদ আলীকে দিয়েই। তার বৃদ্ধ স্ত্রী সেদিন ভাঙা গলায় কেবল একটি কথাই বলছিলেন, "আমাদের টাকাও গেল, বিশ্বাসও গেল।’ এই হতাশার দৃশ্যটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, যতক্ষণ না আমরা সততা ও নৈতিকতার চর্চা করব, আধুনিক চকচকে করিডোর ও কাচ ঘেরা সুপারশপে সাধারণ মানুষের পকেট কাটা যাবে, আর আমাদের সমাজ হারাবে তার মানবিক মূল্যবোধ।
লেখকদ্বয়:
ড. তারনিমা ওয়ারদা আন্দালিব, সহকারী অধ্যাপক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়; গ্লোবাল কনসালট্যান্ট ডিরেক্টর, অক্সফোর্ড ইমপ্যাক্ট গ্রুপ, যুক্তরাজ্য।
দাউদ ইব্রাহিম হাসান, রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়; প্রজেক্ট এনালিস্ট, ইউএনডিপি বাংলাদেশ।
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













































