বাবা: নীরবতার বুকজুড়ে লেখা এক অনন্ত মহাকাব্য

মোঃ সাইফুল ইসলাম মাসুম
  প্রকাশিত : ০৮ জুলাই ২০২৬, ১৪:৪০
অ- অ+

পৃথিবীর সবচেয়ে বিস্ময়কর ভালোবাসাগুলোর অধিকাংশই শব্দহীন। সেগুলোর কোনো উচ্চারণ নেই, কোনো দাবি নেই, কোনো প্রচার নেই। সেগুলো কেবল নিঃশব্দে বেঁচে থাকে দায়িত্বের ঘামে, ক্লান্ত কাঁধে, ক্ষয়ে যাওয়া স্বপ্নে আর অব্যক্ত দীর্ঘশ্বাসে। "বাবা" ঠিক তেমনই এক অনুচ্চারিত মহাকাব্যের নাম—যার প্রতিটি পৃষ্ঠা লেখা হয় রক্তের কালি দিয়ে, অথচ যার লেখকের নাম অধিকাংশ সময়ই অদৃশ্য থেকে যায়।

একজন বাবা আসলে মানুষ নন; তিনি একটি ছায়া। প্রখর রৌদ্রে মাথার ওপর প্রসারিত একটি বিশাল বৃক্ষ, যেখানে সন্তান নিরাপদে বেড়ে ওঠে, অথচ সেই বৃক্ষটি নিজেই প্রতিনিয়ত ঝড়ে ক্ষতবিক্ষত হয়। সন্তান যখন হাসে, তখন কেউ দেখে না বাবার বুকের ভেতর ফুটে ওঠা অদৃশ্য বসন্তকে। আবার সন্তান যখন কাঁদে, তখন তার নিজের চোখের জল বুকের গভীরে পাথরের মতো চেপে রেখে তিনি সন্তানের চোখ মুছে দেন। এ এক এমন ভালোবাসা, যার অভিধানে "আমি" বলে কোনো শব্দ নেই; আছে কেবল "তুমি ভালো থেকো"।

একজন বাবার জীবন শুরু হয় না তার জন্মদিনে; তার প্রকৃত জন্ম হয় সেই দিন, যেদিন তিনি প্রথমবার নবজাতক সন্তানের ছোট্ট আঙুল নিজের আঙুলে জড়িয়ে ধরেন। সেই মুহূর্ত থেকেই তার ব্যক্তিগত পৃথিবী ভেঙে যায়। তার নিজের স্বপ্ন, নিজের শখ, নিজের ইচ্ছাগুলো ধীরে ধীরে সরে দাঁড়ায়। নতুন এক পৃথিবী তৈরি হয়—যার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে কেবল তার সন্তান।

হয়তো একসময় তারও ইচ্ছে ছিল পাহাড় দেখবেন, সমুদ্রের ঢেউ ছুঁয়ে দেখবেন, নিজের জন্য একটি সুন্দর বাড়ি বানাবেন, কিংবা বহুদিনের স্বপ্নের কোনো জিনিস কিনবেন। কিন্তু সন্তানের প্রথম স্কুলব্যাগ, প্রথম বই, প্রথম জুতো, প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি ফি—সবকিছুর ভিড়ে তার স্বপ্নগুলো একে একে নীরবে নির্বাসনে চলে যায়। তিনি প্রতিবাদ করেন না। কারণ একজন বাবা জানেন, নিজের স্বপ্ন হারিয়ে ফেলাই সন্তানের ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রথম মূল্য।

বাবার হাতে আমরা কেবল কড়া পড়া তালু দেখি; দেখি না সেই তালুর ভেতরে জমে থাকা হাজারো অসমাপ্ত স্বপ্ন। তার কপালের ভাঁজগুলোকে আমরা বয়সের ছাপ ভাবি; বুঝি না, প্রতিটি রেখা আসলে সংসারের জন্য লড়াই করা একেকটি যুদ্ধের স্মারক। তার সাদা হয়ে যাওয়া চুলগুলো সময়ের দান নয়; সেগুলো অসংখ্য উদ্বেগ, ঋণ, দুশ্চিন্তা, ব্যর্থতা আর সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে নির্ঘুম রাতের নীরব সাক্ষী।

বাবারা বড় অদ্ভুত। তারা নিজেদের ক্ষুধা লুকিয়ে সন্তানের প্লেটে শেষ মাছের টুকরোটি তুলে দেন। নিজের শরীরের অসুস্থতাকে "কিছু হয়নি" বলে উড়িয়ে দেন, কিন্তু সন্তানের সামান্য জ্বরেও পৃথিবীর সবচেয়ে অসহায় মানুষ হয়ে পড়েন। নিজের পায়ের জুতো ছিঁড়ে গেলেও নতুন জুতো কেনেন না; অথচ সন্তানের জুতোর সামান্য সেলাই ছিঁড়লেও পরদিনই নতুন জুতো কিনে আনেন। তাদের সুখের সংজ্ঞা বড় সহজ—সন্তান যেন কষ্ট না পায়।

সমাজ একজন সফল মানুষের গল্প জানে, কিন্তু খুব কম মানুষ জানে সেই সাফল্যের পেছনে প্রতিদিন একটু একটু করে ভেঙে পড়া একজন বাবার গল্প। অফিসের অপমান, ব্যবসার লোকসান, অর্থনৈতিক সংকট, সামাজিক চাপ—সবকিছু বুকের ভেতর বন্দি করে তিনি যখন সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরেন, তখন দরজায় দাঁড়ানো সন্তানের হাসিমুখ দেখেই আবার নতুন করে বেঁচে ওঠেন। সেই হাসিটুকুই যেন তার জীবনের একমাত্র ওষুধ।

কিন্তু পৃথিবীর সবচেয়ে নিষ্ঠুর বাস্তবতা হলো—বাবার ভালোবাসা আমরা সবচেয়ে কম প্রকাশ করি। মায়ের গলায় ঝাঁপিয়ে পড়ে "ভালোবাসি" বলতে পারি, কিন্তু বাবার সামনে দাঁড়িয়ে সেই দুটি শব্দ উচ্চারণ করতে কেন যেন বুক কেঁপে ওঠে। অথচ হয়তো তিনি সারাজীবন এই একটি বাক্য শোনার অপেক্ষাতেই ছিলেন।

যে মানুষটি আমাদের আঙুল ধরে হাঁটতে শিখিয়েছেন, একদিন তাকেই আমরা ধীরে হাঁটতে দেখে বিরক্ত হই। যে মানুষটি নিজের কাঁধে বসিয়ে পৃথিবী দেখিয়েছেন, বার্ধক্যে এসে সেই মানুষটির হাত ধরার সময়ও অনেকের হয় না। কত বাবা সন্ধ্যার পর দরজার দিকে তাকিয়ে থাকেন—হয়তো আজ ছেলে আসবে। কত বাবা মোবাইলের রিংটোন শুনে চমকে ওঠেন—হয়তো মেয়েটা ফোন করেছে। কিন্তু অধিকাংশ অপেক্ষাই অপেক্ষা হয়ে থেকে যায়।

বৃদ্ধাশ্রমের প্রতিটি জানালায় বসে থাকা বৃদ্ধ বাবার চোখে পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘ অপেক্ষার ইতিহাস লেখা থাকে। সেখানে ক্ষুধার কষ্টের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে অবহেলার যন্ত্রণা। যে সন্তানকে কোলে নিয়ে তিনি শত রাত জেগেছেন, সেই সন্তান ব্যস্ততার অজুহাতে তার জন্য কয়েকটি মিনিটও খুঁজে পায় না। সভ্যতার সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা সম্ভবত এখানেই।

আমি প্রায়ই ভাবি—একদিন যদি সত্যিই সামর্থ্য হয়, তবে বাবার জন্য কী করব? একটি দামি গাড়ি? একটি বিশাল বাড়ি? নাকি পৃথিবীর সব আরাম? তারপর মনে হয়, এগুলোর কোনো কিছুই তার সারাজীবনের ত্যাগের সমান নয়। বরং একদিন তার পাশে চুপচাপ বসে বলব, "বাবা, এবার আর তোমাকে লড়তে হবে না। এতদিন তুমি আমার আকাশ হয়ে ছিলে, এবার আমাকে তোমার ছায়া হতে দাও। এতদিন তুমি আমার ভবিষ্যৎ গড়েছ, এবার তোমার অবশিষ্ট জীবনটুকু আমি ভালোবাসায় সাজিয়ে দিতে চাই।"

হয়তো সেই দিন বাবা কিছুই বলবেন না। কেবল ঠোঁটের কোণে একটুখানি হাসি ফুটবে। সেই হাসির ভেতর লুকিয়ে থাকবে কয়েক দশকের ক্লান্তি, পরিশ্রম, অপূর্ণতা আর পরম তৃপ্তি। কারণ একজন বাবার সবচেয়ে বড় পুরস্কার অর্থ নয়, সম্মান নয়—তার সন্তানের হৃদয়ে নিজের জন্য একটু জায়গা পাওয়া।

পৃথিবীর প্রতিটি নদী একদিন সাগরে মিশে যায়। প্রতিটি ঋতুরও অবসান ঘটে। কিন্তু বাবার ভালোবাসার কোনো শেষ নেই। মৃত্যুও সেই ভালোবাসাকে শেষ করতে পারে না। বাবা চলে যান, কিন্তু তার শেখানো সততা, তার রেখে যাওয়া আদর্শ, তার কণ্ঠের দৃঢ়তা, তার হাতের স্পর্শ, তার আশীর্বাদ—সবকিছু সন্তানের রক্তে প্রবাহিত হতে থাকে আজীবন।

তাই বাবা বেঁচে থাকতে তাকে সময় দিন। তার ক্লান্ত কাঁধে হাত রাখুন। তার সঙ্গে এক কাপ চা পান করুন। তার নীরবতার ভাষা পড়তে শিখুন। কারণ পৃথিবীতে এমন অনেক আফসোস আছে, যা অর্থ দিয়ে পূরণ করা যায়; কিন্তু বাবার চলে যাওয়ার পর একবার "বাবা" বলে ডাকার সুযোগ আর কোনোদিন ফিরে আসে না।

সত্যিই, পিতৃঋণ কোনোদিন শোধ হয় না। কারণ বাবা সন্তানের জন্য যা করেন, তা দায়িত্ব নয়—তা এক অনন্ত আত্মত্যাগের উপাখ্যান। তিনি একটি পরিবারের চালিকাশক্তি নন শুধু; তিনি সেই অদৃশ্য ভিত্তি, যার ওপর দাঁড়িয়ে একটি প্রজন্ম স্বপ্ন দেখতে শেখে, সাহস করতে শেখে, মানুষ হতে শেখে।

আর তাই পৃথিবীর সমস্ত সম্মান, সমস্ত শ্রদ্ধা, সমস্ত ভালোবাসা নিবেদিত হোক সেই নীরব মানুষগুলোর প্রতি—যারা নিজেদের জীবনকে ধূপের মতো নিঃশেষ করে সন্তানদের ভবিষ্যৎ আলোকিত করেন। ইতিহাস হয়তো তাদের নাম মনে রাখবে না, কিন্তু প্রতিটি সন্তানের বিবেকের গভীরে একজন বাবার ত্যাগ চিরকাল এক অমর মহাকাব্য হয়ে বেঁচে থাকবে।

লেখক: ব্যাংকার ও কলামিস্ট

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলে শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতি, দুদকের মামলায় গ্রেপ্তার রাশেদ খান মেনন
অর্থ পাচার মামলায় আ.লীগ নেতা এনু ও রুপনের ১০ বছরের কারাদণ্ড, ৬৪ কোটি ৬২ লাখ টাকা জরিমানা
বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন
মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনায় বিশ্ববাজারে আবারও বাড়লো জ্বালানি তেলের দাম
বিশেষ প্রতিবেদন তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা