রাজনীতি, রেফারিং ও বৈষম্যের শিকার বিশ্বকাপের ফুটবল দল: ফিফার সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ বিভিন্ন দেশ

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ মাঠের লড়াইয়ের পাশাপাশি নানা বিতর্ক ও অভিযোগে ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। টুর্নামেন্টের নকআউট পর্বে প্রবেশের পর একদিকে যেমন শিরোপার লড়াই জমে উঠেছে, অন্যদিকে তেমনি ফিফার সিদ্ধান্ত, রেফারিং এবং অংশগ্রহণকারী দলগুলোর প্রতি আচরণ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে বিভিন্ন মহল থেকে। ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে তদন্তের দাবি, আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ম্যাচে রেফারিং নিয়ে মিশরের আনুষ্ঠানিক অভিযোগ এবং ভ্রমণ বৈষম্যের অভিযোগে ইরানের ফিফার দ্বারস্থ হওয়ার সিদ্ধান্ত বিশ্বকাপের পরিবেশকে আরও বিতর্কিত করে তুলেছে।
ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে তদন্তের দাবি
বিশ্বকাপ চলাকালে সবচেয়ে আলোচিত বিতর্কগুলোর একটি তৈরি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ফরোয়ার্ড ফোলারিন বালোগুনকে ঘিরে। বসনিয়া-হার্জেগোভিনার বিপক্ষে ম্যাচে লাল কার্ড দেখার পর প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী তার পরবর্তী ম্যাচে নিষিদ্ধ থাকার কথা ছিল। কিন্তু পরে সেই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হলে ফিফার সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন ওঠে।
ইউরোপীয় পার্লামেন্টের কয়েক ডজন সদস্য দাবি করেছেন, এই সিদ্ধান্ত ফুটবলের ন্যায়বিচার ও স্বচ্ছতার নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাদের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হস্তক্ষেপের পরই ফিফা বালোগুনের নিষেধাজ্ঞা বাতিল করে।
ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য ব্যারি অ্যান্ড্রুজ, লারা উলটার্স ও নিলস ফুগলসাং এক যৌথ বিবৃতিতে বলেন, টুর্নামেন্ট চলাকালে লাল কার্ডের শাস্তি পরিবর্তন করা ফুটবলের মৌলিক নীতির পরিপন্থি। এমন সিদ্ধান্ত খেলাধুলার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে।
তারা ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য দেশগুলোর জাতীয় ফুটবল ফেডারেশনগুলোকে ফিফার এথিকস কমিটির কাছে আনুষ্ঠানিক তদন্তের আবেদন জানানোর আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের দাবি, বালোগুনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব কাজ করেছে কি না এবং ফিফা রাজনৈতিক নিরপেক্ষতার নীতি লঙ্ঘন করেছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
ফিফা অবশ্য জানিয়েছে, বিষয়টি তাদের ডিসিপ্লিনারি কমিটির সিদ্ধান্ত। তবে এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নন সমালোচকরা। ইতোমধ্যে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের ৩৫ সদস্য ইনফান্তিনোর ভূমিকা তদন্তের দাবিতে স্বাক্ষর করেছেন।
তাদের মতে, ফুটবলের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো নিরপেক্ষতা ও সমান সুযোগ। যদি রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়ম পরিবর্তন করা হয়, তাহলে বিশ্বব্যাপী ফুটবলপ্রেমীদের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
রেফারিং নিয়ে ক্ষুব্ধ মিশর
বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর ম্যাচে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে নাটকীয় পরাজয়ের পর রেফারিং নিয়ে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করেছে মিশর ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (ইএফএ)।
আটলান্টায় অনুষ্ঠিত ওই ম্যাচে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে থেকেও শেষ পর্যন্ত ৩-২ গোলে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেয় মিশর। ম্যাচের পর থেকেই দলটির খেলোয়াড়, কোচিং স্টাফ এবং কর্মকর্তারা রেফারিং নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে আসছিলেন।
মিশর ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হানি আবু রিদা ফিফার কাছে পাঠানো অভিযোগপত্রে ম্যাচের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের তদন্ত দাবি করেছেন। একই সঙ্গে ম্যাচের প্রধান রেফারি ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়ে এবং তার কর্মকর্তাদের টুর্নামেন্টের বাকি ম্যাচগুলো থেকে সরিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
মিশরের অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে দুটি ঘটনা।
প্রথমটি ঘটে ৬২তম মিনিটে। সে সময় মোস্তফা জিকো বল জালে পাঠালেও ভিএআর পর্যালোচনার পর বিল্ডআপে ফাউলের অভিযোগে গোলটি বাতিল করা হয়। মিশরের দাবি, ওই সিদ্ধান্ত ছিল প্রশ্নবিদ্ধ।
দ্বিতীয় ঘটনা আর্জেন্টিনার জয়সূচক তৃতীয় গোলের আগে। মিশরের অভিযোগ, গোল হওয়ার আগে হামদি ফাথির ওপর স্পষ্ট ফাউল হয়েছিল। কিন্তু রেফারি সেটি উপেক্ষা করেন এবং ভিএআরেও ঘটনাটি যথাযথভাবে পর্যালোচনা করা হয়নি।
ম্যাচের পর সংবাদ সম্মেলনে মিশরের প্রধান কোচ হোসাম হাসান আরও বিস্ফোরক মন্তব্য করেন। তিনি দাবি করেন, ম্যাচের ফলাফল যেন আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল এবং রেফারির ওপর আর্জেন্টিনার পক্ষ থেকে চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল। যদিও এসব অভিযোগের পক্ষে তিনি কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করেননি।
এখন পর্যন্ত মিশরের অভিযোগের বিষয়ে ফিফা আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
বৈষম্যের অভিযোগ ইরানের
বিশ্বকাপের আরেকটি বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ইরান জাতীয় ফুটবল দল। উত্তর আমেরিকায় অনুষ্ঠিত টুর্নামেন্টে অংশ নিতে গিয়ে ভ্রমণসংক্রান্ত নানা বিধিনিষেধ ও প্রশাসনিক জটিলতার মুখোমুখি হওয়ার অভিযোগ তুলেছে দেশটির ফুটবল ফেডারেশন।
ফেডারেশনের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, টুর্নামেন্ট শুরুর অনেক আগেই তারা দলের ভ্রমণ পরিকল্পনা, প্রস্তুতি সূচি এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্য আয়োজকদের কাছে জমা দিয়েছিল। তারপরও দলটি বিভিন্ন ধরনের ভ্রমণ প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়েছে।
তার অভিযোগ, এসব বিধিনিষেধের কারণে কোচিং স্টাফদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং দলের প্রস্তুতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
ফুটবল সংশ্লিষ্ট অনেকের ধারণা, চলমান আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে ইরানকে বাড়তি জটিলতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। অতীতেও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আসরে ইরানি খেলোয়াড় ও কর্মকর্তাদের ভিসা, যাতায়াত এবং প্রশাসনিক অনুমোদন নিয়ে সমস্যা তৈরি হয়েছিল।
ইরান ফুটবল ফেডারেশন মনে করছে, বিশ্বকাপের মতো বৈশ্বিক আসরে কোনো দেশের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ গ্রহণযোগ্য নয়। তাই বিষয়টি নিয়ে তারা ফিফার কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করবে এবং দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করবে।
বিতর্কের মাঝেও মাঠের লড়াই
বিশ্বকাপের বিভিন্ন বিতর্ক যখন শিরোনাম দখল করছে, তখন মাঠের লড়াইও সমানভাবে উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ইতোমধ্যে কোয়ার্টার ফাইনালের আটটি দল নির্ধারিত হয়েছে।
বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা শেষ ষোলোতে মিশরকে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছে। অন্যদিকে ৭২ বছর পর শেষ আটে জায়গা করে নেওয়া সুইজারল্যান্ড কলম্বিয়াকে টাইব্রেকারে হারিয়ে নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছে। এবার কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি হবে এই দুই দল।
ফুটবল বিশ্বের নজর এখন যেমন মাঠের ফলাফলের দিকে, তেমনি টুর্নামেন্ট ঘিরে ওঠা বিতর্কগুলোর দিকেও। বিশ্বকাপের বাকি পথচলায় ফিফা এসব অভিযোগ কীভাবে মোকাবিলা করে এবং সংশ্লিষ্ট ঘটনাগুলোর বিষয়ে কী অবস্থান নেয়, সেটিও এখন বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনের অন্যতম আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
(ঢাকাটাইমস/৮ জুলাই/আরজেড)
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন











































