প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর: ভূরাজনীতির নতুন সমীকরণ

মো. আবদুল মান্নান
  প্রকাশিত : ২৮ জুন ২০২৬, ১৭:৫৫| আপডেট : ২৮ জুন ২০২৬, ১৮:৩৬
অ- অ+
ছবি এআই জেনারেটেড।

একটি দেশের শীর্ষ নির্বাহীর যেকোনো বিদেশ সফরই কেবল আনুষ্ঠানিক করমর্দন বা যৌথ ইশতেহারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তার পেছনে থাকে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত হিসাব-নিকাশ, অর্থনৈতিক স্বার্থের দরকষাকষি এবং আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্যের খেলা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্যের দিকটাই যেন বেশি সামনে নিয়ে এসেছে।

তাই দীর্ঘ প্রতীক্ষা আর নানামুখী ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েনের অবসান ঘটিয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফর সমকালীন কূটনীতির ইতিহাসে অন্যতম এক মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য, যার ভৌগোলিক অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে অত্যন্ত সংবেদনশীল, সেখানে বেইজিংয়ের মাটিতে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিটি পদক্ষেপকে অত্যন্ত গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছে বিশ্ব সম্প্রদায়।

এই সফর শেষ হওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মহলে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি ঘুরপাক খাচ্ছে- এই সফর কি সত্যিই সফল। বাংলাদেশ এই সফর থেকে দৃশ্যমান কী পেল, আর তার বিনিময়ে বেইজিংকে কী দিতে হলো?

এই দুই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের কেবল কূটনৈতিক টেবিলের হাসিমুখের ছবি দেখলে চলবে না, বরং এর গভীরে গিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। একটি সফরের সাফল্য বা ব্যর্থতা পরিমাপের প্রথম মাপকাঠি হলো সফরের সময়কাল এবং তার প্রেক্ষাপট। বাংলাদেশ বর্তমানে এক অর্থনৈতিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি এবং বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান উন্নয়ন সহযোগী চীন সফর ছিল সময়ের দাবি।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফরে মূল ফোকাস ছিল বাণিজ্য ঘাটতি কমানো, নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনার মতো প্রকল্পে চীনের সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করা। সফরে বেশ কয়েকটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে, যার মধ্যে ডিজিটাল অর্থনীতি, বাণিজ্য সুবিধা, এবং অবকাঠামো উন্নয়ন অন্যতম। বেইজিং বাংলাদেশের জন্য কিছু অনুদান এবং সহজ শর্তের ঋণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যা বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে।

তবে কেবল মুদ্রার অঙ্কে কোনো কূটনৈতিক সফরের মূল্যায়ন করা হলে তা হবে একপেশে। এই সফরের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি নিহিত রয়েছে কৌশলগত এবং রাজনৈতিক ক্ষেত্রে। বেইজিং এই সফরে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা এবং অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বহিরাগত হস্তক্ষেপের বিরোধিতাকে পুনর্ব্যক্ত করে প্রকারান্তরে বর্তমান নেতৃত্বের প্রতি তাদের জোরালো আস্থা প্রদর্শন করেছে। এটি তারেক রহমানের সরকারের জন্য একটি বড় রাজনৈতিক বিজয়। এর পাশাপাশি, বাণিজ্য ক্ষেত্রে চীনের বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের শুল্কমুক্ত সুবিধা সম্প্রসারণের বিষয়ে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের রপ্তানি খাতকে সমৃদ্ধ করতে পারে। রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানের ক্ষেত্রে চীনের মধ্যস্থতাকারী ভূমিকাকে পুনরায় সক্রিয় করার আশ্বাস পাওয়া গেছে, যা বাংলাদেশের জন্য একটি অন্যতম প্রধান নিরাপত্তা উদ্বেগ।

সুতরাং, দৃশ্যমান নগদ প্রাপ্তির চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদারিত্বের যে ভিত্তি এই সফরে তৈরি হয়েছে, তা বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থানের হাতকে শক্তিশালী করেছে।

বেইজিংয়ের প্রধান চাওয়া তাদের ভূ-রাজনৈতিক ও ভূ-অর্থনৈতিক এজেন্ডার প্রতি অংশীদার দেশগুলোর অকুণ্ঠ সমর্থন। এই সফরে বাংলাদেশ অত্যন্ত স্পষ্টভাবে 'এক চীন নীতি'র প্রতি তার অবিচল আনুগত্য পুনর্ব্যক্ত করেছে, যা তাইওয়ান ও তিব্বত প্রশ্নে চীনের অবস্থানকে সমর্থন করে। বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে যখন পশ্চিমা বিশ্ব তাইওয়ান ইস্যুতে চীনের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে, তখন বাংলাদেশের মতো একটি রাষ্ট্রের কাছ থেকে এমন দৃঢ় সমর্থন বেইজিংয়ের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

এর বাইরে, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের স্বপ্নের প্রকল্প 'বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ' (বিআরআই)-এর প্রতি বাংলাদেশ তার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে। চীন চায় বাংলাদেশ যেন তাদের গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (জিডিআই)-এর সাথে আরও গভীরভাবে যুক্ত হয়, যা এই সফরে নীতিগতভাবে ত্বরান্বিত হয়েছে। অর্থাৎ, বেইজিংকে বাংলাদেশ যা দিয়েছে, তা হলো বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক ফোরামে চীনের রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতি কৌশলগত সমর্থন এবং তাদের অর্থনৈতিক মহাপরিকল্পনার অংশীদার হওয়ার সম্মতি।

কিন্তু এই 'দেওয়া-নেওয়া'র সমীকরণটি বাংলাদেশের জন্য কতটা ঝুঁকিমুক্ত, তা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণের অবকাশ রয়েছে। বেইজিংকে অতিরিক্ত রাজনৈতিক ও কৌশলগত সুবিধা দেওয়ার ফলে ঢাকার দীর্ঘদিনের বন্ধু রাষ্ট্র ভারতের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে কি না, তা এই সফরের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। বাংলাদেশ সবসময়ই একটি ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখার চেষ্টা করে, যেখানে 'সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়' মূল নীতি। কিন্তু তিস্তা প্রকল্পের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে যখন চীনের সম্পৃক্ততার কথা আসে, তখন তা দিল্লির সাউথ ব্লককে উদ্বিগ্ন করে তোলে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফরে চীন তিস্তা মহাপরিকল্পনায় অর্থায়নের বিষয়ে আগ্রহ দেখালেও বাংলাদেশ অত্যন্ত কৌশলের সাথে বিষয়টিকে এমনভাবে হ্যান্ডেল করেছে যাতে ভারত সরাসরি ক্ষুব্ধ না হয়।

এই সফরে বাংলাদেশ যেসব ঋণের প্রতিশ্রুতি বা চুক্তি করেছে, সেগুলোর সুদের হার, গ্রেস পিরিয়ড এবং পরিশোধের শর্তাবলি অত্যন্ত কঠোরভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। বেইজিংয়ের দেওয়া অর্থনৈতিক প্যাকেজকে সফল বলতে হলে তার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ এবং দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য টেকসই হতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর ছিল মূলত একটি বাস্তবসম্মত এবং কৌশলগত সফর। অর্থনৈতিক প্রাপ্তির চেয়ে এই সময়ে চীনের মতো অংশীদারের হাত ধরে রাখা এবং নতুন বিনিয়োগের পথ উন্মুক্ত রাখাই ছিল বাংলাদেশের মূল লক্ষ্য, যা অর্জিত হয়েছে।

অন্যদিকে, বেইজিংকে যে রাজনৈতিক সমর্থন বাংলাদেশ দিয়েছে, তা বর্তমান বাস্তবতায় বিশ্বমঞ্চে নিজেদের শক্তি বাড়াতে একরকম অনিবার্য ছিল।

এই সফরের আসল পরীক্ষা শুরু হবে এখন, যখন বাংলাদেশকে চীনের সাথে এই নতুন সমীকরণ বজায় রেখে একই সাথে ভারত ও পশ্চিমা বিশ্বের সাথে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে। চতুর কূটনীতি, জাতীয় স্বার্থকে সবার উপরে রাখা এবং দূরদর্শী নেতৃত্বের মাধ্যমেই কেবল এই সফরের সুফল ঘরে তোলা সম্ভব। বেইজিংয়ের দরবার থেকে বাংলাদেশ যা নিয়ে ফিরেছে, তা যদি সঠিকভাবে ব্যবহার করা যায়, তবে তা দেশের ইতিহাসে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করবে।

(ঢাকাটাইমস/২৮জুন/মোআ)

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
সুতাকাটা ঘুড়ির পেছনে দৌড়ে বিলের কাদায় স্কুলছাত্রের মৃত্যু, এলাকায় ভিন্ন গুঞ্জন  
সৌদি তেল কোম্পানির হেলিকপ্টার বিধ্বস্তে নিহত ১৪
তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ : পানিসম্পদ মন্ত্রী
৯৯৯ থেকে কল পেয়ে পদ্মার ডুবোচর থেকে ৮৫ যাত্রী উদ্ধার 
বিশেষ প্রতিবেদন তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা