গ্রাম পেরিয়ে রাজধানীতে লোডশেডিংয়ের হানা, বিদ্যুৎ সংকটে নাকাল জনজীবন

অনলাইন ডেস্ক, ঢাকা টাইমস
  প্রকাশিত : ১৩ আগস্ট ২০২৬, ০৯:৩৮
অ- অ+

তীব্র গরমের মধ্যে দেশজুড়ে বেড়েছে লোডশেডিং। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় এবার গ্রামের পাশাপাশি শহরের মানুষও চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। কোথাও কোথাও ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পাঁচ ঘণ্টাও বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন গ্রাহকরা। এতে ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা, চিকিৎসাসেবা ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।

এতদিন গ্রাম ও মফস্বল এলাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের চিত্র দেখা গেলেও এবার সেই ভোগান্তি পৌঁছেছে রাজধানী ঢাকাতেও। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় টানা বিদ্যুৎ বিভ্রাটে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন নগরবাসী।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুক্তভোগীদের বিভিন্ন পোস্ট ও মন্তব্যে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে নাগরিক ক্ষোভের চিত্র ফুটে উঠেছে। অনেকেই বলছেন, গ্রামাঞ্চলের মতো ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকার অভিজ্ঞতা এখন রাজধানীবাসীকেও পোহাতে হচ্ছে।

দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় প্রচণ্ড গরমে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষ সবচেয়ে বেশি কষ্টে পড়েছেন। পাশাপাশি বিদ্যুৎনির্ভর ব্যবসা ও সেবাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্যাস ও অন্যান্য জ্বালানির সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। জাতীয় গ্রিডে উৎপাদন ও চাহিদার মধ্যে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হওয়ায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং বাড়াতে হচ্ছে।

গ্রামাঞ্চলের পর রাজধানীতেও লোডশেডিং তীব্র হওয়ায় বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো না গেলে জনদুর্ভোগ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিদ্যুৎ ঘাটতি উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। ৯ আগস্ট একপর্যায়ে বিদ্যুৎ ঘাটতি ৩ হাজার ৬৭১ মেগাওয়াটে পৌঁছায়। ১২ আগস্ট রাত ১টায় জাতীয় গ্রিডে ঘাটতি ছিল ৩ হাজার ১৯৪ মেগাওয়াট। পরদিন সকাল ৮টায়ও ঘাটতি ছিল ২ হাজার ৩১৪ মেগাওয়াট।

বর্তমানে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট। মঙ্গলবার সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল ১৮ হাজার ৯৭৫ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে সরবরাহ করা হয় ১৫ হাজার ৮৩৩ মেগাওয়াট। ফলে লোডশেডিং ছিল ৩ হাজার ১৪২ মেগাওয়াট।

সাম্প্রতিক সময়ে লোডশেডিংয়ের মাত্রা অতীতের রেকর্ডও ছাড়িয়েছে। ২০২৩ সালের ২৭ জুন সর্বোচ্চ লোডশেডিং হয়েছিল ৩ হাজার ৪১৯ মেগাওয়াট। অথচ গত রোববার রাতে তা বেড়ে ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াটে পৌঁছায়। এর আগে ৩ আগস্ট সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল ৩ হাজার ৫১২ মেগাওয়াট।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমান বিদ্যুৎ সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ জ্বালানি ঘাটতি। গত ২১ জুলাই কক্সবাজারের মহেশখালীতে এক্সিলারেট এনার্জির এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের প্রভাব পড়ে। এর পাশাপাশি সামিট টার্মিনালে বৈরী আবহাওয়ার কারণে এলএনজি খালাসে সমস্যা এবং এক্সিলারেট টার্মিনাল পূর্ণ সক্ষমতায় চালু না থাকায় সংকট আরও বেড়েছে।

বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানিয়েছেন, এলএনজি সরবরাহে সৃষ্ট জটিলতার কারণে পরিস্থিতি কঠিন হয়েছে। সংকট মোকাবিলায় সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে এবং পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতির আশা করা হচ্ছে।

দেশীয় গ্যাস উৎপাদনও কমছে। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে প্রায় ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন ও সরবরাহ করা হচ্ছে। দেশের সবচেয়ে বড় গ্যাসক্ষেত্র বিবিয়ানা থেকে গত বছর দৈনিক ৯১৪ মিলিয়ন ঘনফুট উৎপাদন হলেও বর্তমানে তা কমে প্রায় ৭৩৮ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমেছে। জালালাবাদ গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদনও ১৩০ মিলিয়ন ঘনফুট থেকে কমে ১২৩ মিলিয়ন ঘনফুট হয়েছে।

দেশের অধিকাংশ বিদ্যুৎকেন্দ্র তেল, গ্যাস ও কয়লানির্ভর। জ্বালানি সংকটের কারণে বর্তমানে ২১টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। এর মধ্যে ১৬টি গ্যাসভিত্তিক এবং পাঁচটি তেলভিত্তিক। আরও ৩৪টি বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন কমেছে।

কয়লা সংকটেও কয়েকটি কেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। পটুয়াখালীর ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন কমে ৮০০ থেকে ১ হাজার মেগাওয়াটে নেমেছে। একইভাবে কয়লা সরবরাহে ঘাটতির কারণে আদানির ১ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট কেন্দ্র বর্তমানে প্রায় ১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে। তবে আদানি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দ্রুত কয়লা সরবরাহ স্বাভাবিক হলে কেন্দ্রটি পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদনে ফিরতে পারবে।

লোডশেডিংয়ের সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায়। দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ গ্রামাঞ্চলের প্রায় চার কোটি গ্রাহককে বিদ্যুৎ সেবা দেওয়া পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের আওতাধীন সব জেলাতেই ঘাটতি বেড়েছে।

তথ্য অনুযায়ী, পল্লী বিদ্যুতের ঢাকা অঞ্চলে ৩ হাজার ৪ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ করা হয়েছে ২ হাজার ১৫৯ মেগাওয়াট। অর্থাৎ ঘাটতি ৮৪৫ মেগাওয়াট।

চট্টগ্রামে ৪২১ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ৩৪৭, খুলনায় ১ হাজার ১৫৩ মেগাওয়াটের বিপরীতে ৮৭৯, রাজশাহীতে ১ হাজার ৩৩ মেগাওয়াটের বিপরীতে ৭৫৬, কুমিল্লায় ১ হাজার ৯৬ মেগাওয়াটের বিপরীতে ৮৬৬, ময়মনসিংহে ১ হাজার ৭২ মেগাওয়াটের বিপরীতে ৭৩৮, সিলেটে ৪৪১ মেগাওয়াটের বিপরীতে ৩৩৪, বরিশালে ৩০২ মেগাওয়াটের বিপরীতে ২২৯ এবং রংপুরে ৬৫১ মেগাওয়াটের বিপরীতে ৪৭৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়েছে।

ফলে ঢাকায় ২৮ শতাংশ, চট্টগ্রামে ১৮, খুলনায় ২৪, রাজশাহীতে ২৭, কুমিল্লায় ২১, ময়মনসিংহে ৩১, সিলেটে ২৪, বরিশালে ২৪ এবং রংপুরে ২৭ শতাংশ পর্যন্ত ঘাটতি রয়েছে। সার্বিকভাবে পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় গড় ঘাটতি প্রায় ২৫ শতাংশ।

রংপুর-সিলেট-বরিশালে ভয়াবহ পরিস্থিতি

রংপুরে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১ হাজার ১৫০ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে ৭০০ মেগাওয়াটের কিছু বেশি। প্রায় ৪৫০ মেগাওয়াট ঘাটতির কারণে নগর ও গ্রামাঞ্চলে ঘণ্টায় ঘণ্টায় লোডশেডিং হচ্ছে।

সিলেটেও নগর থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত দফায় দফায় বিদ্যুৎ বিভ্রাটের অভিযোগ রয়েছে। কোনো কোনো এলাকায় দিনে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টারও বেশি সময় বিদ্যুৎ থাকছে না। লোডশেডিংয়ের প্রতিবাদে সিলেটের বিভিন্ন এলাকায় সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভের ঘটনাও ঘটেছে।

বরিশাল অঞ্চলের পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। সেখানে দৈনিক ১১০ থেকে ১২০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৫০ মেগাওয়াটের মতো। ফলে অনেক এলাকায় দিনে ১২ ঘণ্টারও বেশি লোডশেডিং হচ্ছে। ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে ব্যবসা ও শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।

চট্টগ্রাম-ময়মনসিংহ-রাজশাহীতেও ভোগান্তি

চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় দিনে একাধিকবার লোডশেডিং হচ্ছে। কোনো কোনো এলাকায় ২৪ ঘণ্টায় ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ রয়েছে। কক্সবাজারের কিছু এলাকায় দিনে ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে পর্যটন, মৎস্য ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায় ক্ষতি হচ্ছে।

ময়মনসিংহ বিভাগের ময়মনসিংহ, জামালপুর, শেরপুর ও নেত্রকোনায়ও পরিস্থিতি খারাপ। কোনো কোনো এলাকায় ১০ থেকে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ করেছেন গ্রাহকরা।

রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন জেলাতেও ঘন ঘন লোডশেডিং হচ্ছে। পাবনা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নাটোরের বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ রয়েছে।

সুনামগঞ্জে ক্ষোভ ক্রমেই বাড়ছে

দীর্ঘ ও অনিয়মিত লোডশেডিংয়ে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ক্রমেই বাড়ছে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের দাবিতে সুনামগঞ্জের জাউয়া বাজারে ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ বিক্ষোভ করে মশাল জ্বালিয়ে সিলেট-সুনামগঞ্জ মহাসড়ক অবরোধ করেছেন।

সুনামগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির তথ্য অনুযায়ী, জেলার প্রায় ৩ লাখ ৭৫ হাজার গ্রাহকের জন্য বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে ৩৫ থেকে ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। বিপরীতে চাহিদা রয়েছে প্রায় ৭০ থেকে ৭৫ মেগাওয়াট। ফলে বিভিন্ন এলাকায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি স্থানীয় কোনো সমস্যা নয়; জাতীয় পর্যায়ের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাবেই পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত লোডশেডিং পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, তাৎক্ষণিকভাবে এলএনজি আমদানি ও জ্বালানি সরবরাহ বাড়িয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া গেলেও দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর বিকল্প নেই। তা না হলে ভবিষ্যতে জ্বালানি সংকটের সঙ্গে বিদ্যুৎ সংকটও আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

(ঢাকাটাইমস/১৩ আগস্ট/আরজেড)

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
দেশের বাজারে আবারও বেড়েছে স্বর্ণের দাম
ডিএমপির অভিযানে ২৪ ঘণ্টায় ৫০০ জন গ্রেপ্তার, মামলা ৫৮
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নয়, নিজের জুতাই বহন করছিলেন ওসি মোহাম্মদ আলী
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী চূড়ান্ত করতে বিএনপির জরুরি বৈঠক
বিশেষ প্রতিবেদন তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা