১৯ বছরেও বাস্তবায়ন হয়নি সরকারি কাঁচাবাজার, যানজটে নাকাল বগুড়াবাসী

বগুড়া প্রতিনিধি, ঢাকা টাইমস
  প্রকাশিত : ১২ আগস্ট ২০২৬, ২০:৪৫
অ- অ+

বগুড়া শহরের প্রধান সমস্যাগুলোর মধ্যে অন্যতম যানজট। সম্প্রতি বগুড়া পৌরসভাকে সিটি কর্পোরেশনে উন্নীত করার পর প্রশাসনের পক্ষ থেকে যানজট নিরসনে ফুটপাত ও সড়ক দখল করে বসা হকারদের উচ্ছেদে অভিযান চালানো হলেও তাতে স্থায়ী সমাধান আসেনি। অভিযানকারীরা চলে যাওয়ার পরপরই দখলদাররা আবারও আগের জায়গায় ফিরে আসছেন। ফলে যানজটের সংকট থেকেই যাচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ফুটপাত ও সড়ক দখলের পাশাপাশি শহরের প্রধান সড়কগুলোতে তীব্র যানজটের অন্যতম কারণ রাজাবাজার, ফলপট্টি ও আশপাশের পাইকারি বাজারগুলো। শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত এসব বাজারে প্রতিদিন ভোরে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শত শত পণ্যবাহী ট্রাক ও ভ্যান এসে থামে। এতে সাতমাথা, ফতেহআলী মোড় ও স্টেশন রোডের মতো ব্যস্ত সড়কগুলোতে ভোর থেকেই স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হয়। স্কুলগামী শিক্ষার্থী, অফিসগামী মানুষসহ বিভিন্ন কাজে শহরে আসা মানুষকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়।

শহরের যানজট নিরসন ও নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে ২০০৭ সালের ২৫ জানুয়ারি তৎকালীন স্থানীয় সরকার বিভাগ বগুড়া পৌরসভার অনুকূলে শহরের দ্বিতীয় বাইপাসসংলগ্ন মাটিডালি-বারবকপুর মৌজায় একটি নতুন কেন্দ্রীয় কাঁচাবাজার স্থাপনের প্রশাসনিক অনুমোদন দেয়। উদ্দেশ্য ছিল শহরের কেন্দ্রস্থল থেকে পাইকারি বাজারগুলো সরিয়ে নেওয়া। তবে অনুমোদনের পর প্রায় ১৯ বছর পেরিয়ে গেলেও সেই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়নি। জমি অধিগ্রহণ কিংবা কেন্দ্রীয় কাঁচাবাজার স্থাপনের কার্যকর উদ্যোগও নেওয়া হয়নি।

সরকারি উদ্যোগ ঝুলে থাকায় ২০২১ সালে রাজাবাজারের কয়েকজন আড়তদার ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী নিজেদের উদ্যোগে শহরের দ্বিতীয় বাইপাসসংলগ্ন শাখারিয়া এলাকায় নতুন আড়ত গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেন। এ জন্য ১৪০ শতাংশ জমি মাসিক এক লাখ ৪০ হাজার টাকা ভাড়ায় নেওয়া হয়। ৪৬টি দোকান নির্মাণের জন্য জমির মালিক সাজেদুর রহমান সাজুকে এক কোটি ৬১ লাখ টাকা জামানত এবং অতিরিক্ত খালি জায়গার জন্য আরও সাত লাখ টাকা দেওয়া হয়।

চুক্তি অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ে নির্মাণকাজ শেষ না হলেও পরে সেখানে ৪১টি দোকান নির্মাণ করা হয়। এরপর নতুন আড়ত চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলেও বিভিন্ন জটিলতায় তা সম্ভব হয়নি। পরে বগুড়া পৌরসভা থেকে মার্কেটটি ‘খন্দকার সুপার মার্কেট’ নামে পরিচালনার অনুমোদন দেওয়া হয়। জমির মালিক প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও কাগজপত্রের ব্যয় বহনে অপারগতা প্রকাশ করলে ব্যবসায়ীরা নিজেদের উদ্যোগে পৌরসভার অনুমোদন, ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ, বিদ্যুৎ, হাইওয়েসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সম্পন্ন করেন। পাশাপাশি গেট নির্মাণেও তাদের অতিরিক্ত প্রায় ৩২ লাখ টাকা ব্যয় হয়।

২০২৩ সালের ১ আগস্ট ৪১ জন ব্যবসায়ীর নামে দোকান বরাদ্দের চুক্তি সম্পন্ন হয়। পরে ২০২৪ সালের ২৪ মার্চ মার্কেটটির উদ্বোধন করা হয়। তবে উদ্বোধনের পরও সেখানে ব্যবসা শুরু করতে পারেননি বিনিয়োগকারী ব্যবসায়ীদের অনেকে। তাদের অভিযোগ, ওই সময় ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় কয়েকজন প্রভাবশালী নেতার হুমকি-ধামকির কারণে তারা সেখানে গিয়ে ব্যবসা করতে সাহস পাননি।

বর্তমানে রাজাবাজার ও ফলপট্টির সিংহভাগ ব্যবসায়ী এক হয়ে শহরের বাইরে সমন্বিত পাইকারি বাজার বাস্তবায়নের জোরালো দাবি তুলেছেন। এ বিষয়ে তারা ইতোমধ্যে লিখিতভাবে সিটি প্রশাসন ও জেলা পরিষদ প্রশাসককে জানিয়েছেন।

রাজাবাজারের ব্যবসায়ী ইকবাল (আলমগীর অ্যান্ড ব্রাদার্স) বলেন, যানজটের কারণে আমরা দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। রাজাবাজারের দোকানের যে ভাড়া, সেটাই এখন তোলা কঠিন। সাধারণ ব্যবসায়ীরা চান বাজার বাইরে চলে যাক, যাতে আমরা স্বস্তিতে ব্যবসা করতে পারি। কিন্তু কিছু প্রভাবশালী গোষ্ঠী একই জায়গায় সকালে পাইকারি ও দুপুরে খুচরা ব্যবসা করে দুই-তিনবার সুবিধা নেয়। এ কারণে তারা বাজার স্থানান্তর চায় না।

ফল আমদানিকারক মো. মুকুল হোসেন বলেন, বর্তমানে সিটি কর্পোরেশন বগুড়াকে নতুন করে সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছে, আমরা তার সঙ্গে একমত। সবজি, ফল ও মাছের আড়ত এই তিনটির সমন্বয়ে সিটি কর্পোরেশন যদি সরকারি জায়গায় একটি স্থান নির্ধারণ করে মার্কেট করে দেয়, তাহলে আমরা সেখানে চলে যাব। আমরা সরকারকে নিয়মিত ট্যাক্স, ভ্যাট, ট্রেড লাইসেন্স ফি ও বার্ষিক ভাড়া দিয়ে বৈধভাবে ব্যবসা করতে চাই। ব্যক্তি মালিকানাধীন ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায় আমরা যেতে চাই না।

হিলি, সোনামসজিদ ও বুড়িমারী সীমান্ত দিয়ে আমদানি করা পণ্যের পাইকারি আড়তদার আব্দুর রহমান রুনু বলেন, আমরা নিজেদের উদ্যোগে বাজার করে সেখানে আড়ত করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ওই সময় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ব্যক্তি মালিকানাধীন জায়গায় হাটবাজার করা যাবে না জানিয়ে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। পরে সেটি “খন্দকার সুপার মার্কেট” হিসেবে পৌরসভা থেকে অনুমোদন দেয় এবং উদ্বোধনও করা হয়। অনেকে সেখানে গিয়েছিলেন। কিন্তু ওই সময় আওয়ামী লীগের কয়েকজন স্থানীয় নেতার হুমকি-ধামকির কারণে আমরা সেখানে গিয়ে ব্যবসা করার সাহস পাইনি।

তিনি আরও বলেন, খন্দকার সুপার মার্কেটে কাঁচাবাজারের ব্যবসা করাও সম্ভব নয়। একদিকে হুমকির বিষয়, অন্যদিকে এটি সুপার মার্কেট হওয়ায় ব্যবসায়ীরা নিরুৎসাহিত হয়ে আর সেখানে যাননি। আমাদের কাজ হলো গ্রাম থেকে পণ্য সংগ্রহ করে সেগুলো সারাদেশে পাঠানো।

আব্দুর রহমান রুনু বলেন, আমরা এখন চাই, ২০০৭ সালে সরকার শহরের বাইরে কেন্দ্রীয় কাঁচাবাজার স্থাপনের যে অনুমোদন দিয়েছিল, সেটি বাস্তবায়ন করা হোক। এ জন্য জেলা প্রশাসক, জেলা পরিষদ ও সিটি কর্পোরেশনের যৌথ উদ্যোগ প্রয়োজন। স্টেশন রোড ও সাতমাথার মতো গুরুত্বপূর্ণ সড়ক যানজটমুক্ত রাখতে হলে রাজাবাজার, চাষীবাজার, রূপালী মৎস্য বাজার ও ফলপট্টির পাইকারি কার্যক্রম দ্রুত শহরের বাইরে নেওয়া দরকার।

এ বিষয়ে বগুড়া সিটি প্রশাসক এমআর ইসলাম স্বাধীন বলেন, আপাতত কাঁচাবাজার নতুন করে স্থানান্তর বা তৈরির কোনো পরিকল্পনা আমাদের হাতে নেই।

(ঢাকা টাইমস/১২আগস্ট/এসএ)

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
বদলে গেল দোকান-শপিংমল বন্ধের সময়, নতুন নির্দেশ সরকারের
মির্জাপুরে গৃহবধূ হত্যার রহস্য উদঘাটন ও হয়রানির প্রতিবাদে  সংবাদ সম্মেলন
সমুদ্রে ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত, সাগরে না যাওয়ার আহ্বান কোস্ট গার্ডের
চীনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী রোংজি মারা গেছেন
বিশেষ প্রতিবেদন তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা