এসএসসির ফলাফলে সেরা দশে যারা, নামিদামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ফল বিপর্যয়ের নেপথ্যের কারণ

চলতি বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলে রাজধানীর বেশ কয়েকটি নামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রত্যাশিত সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। পাসের হার ও জিপিএ-৫ প্রাপ্তির বিবেচনায় ঢাকার শীর্ষ ১০ প্রতিষ্ঠানের তালিকায় জায়গা হয়নি ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মাইলস্টোন কলেজ, মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও সাউথ পয়েন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর।
অন্যদিকে এবার রাজধানীর মধ্যে সেরা ফল করেছে সেন্ট জোসেফ উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠানটির পাসের হার শতভাগ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে ৮৪ দশমিক ২১ শতাংশ শিক্ষার্থী।
সেন্ট জোসেফ থেকে এবার ১৭১ জন শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়। তাদের মধ্যে ১৪৪ জন জিপিএ-৫ পেয়েছে। ১৯ জন পেয়েছে জিপিএ-৪ দশমিক ৫০ থেকে ৪ দশমিক ৯৯, সাতজন পেয়েছে ৪ থেকে ৪ দশমিক ৪৯ এবং একজন পেয়েছে ৩ দশমিক ৫০ থেকে ৩ দশমিক ৯৯-এর মধ্যে।
দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে হলি ক্রস বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠানটির সব শিক্ষার্থী পাস করেছে এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে ৭৯ দশমিক ৮৪ শতাংশ। তৃতীয় অবস্থানে থাকা বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজেও পাসের হার শতভাগ। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৭৯ দশমিক ৫০ শতাংশ শিক্ষার্থী।
চতুর্থ অবস্থানে রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ। প্রতিষ্ঠানটির শতভাগ শিক্ষার্থী পাস করেছে এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে ৭৪ দশমিক ১৩ শতাংশ। পঞ্চম অবস্থানে আদমজী ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল। এখানেও পাসের হার শতভাগ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে ৭৩ দশমিক ৮৮ শতাংশ।
ষষ্ঠ অবস্থানে থাকা ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটি স্কুল অ্যান্ড কলেজে শতভাগ শিক্ষার্থী পাস করেছে। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৬৮ দশমিক ৩২ শতাংশ। সপ্তম অবস্থানে শহীদ বীর উত্তম লেফটেন্যান্ট আনোয়ার গার্লস কলেজ। প্রতিষ্ঠানটির পাসের হার শতভাগ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে ৬৭ দশমিক ২০ শতাংশ।
অষ্টম অবস্থানে রয়েছে কুর্মিটোলার বিএএফ শাহীন কলেজ। প্রতিষ্ঠানটির শতভাগ শিক্ষার্থী পাস করলেও জিপিএ-৫ পেয়েছে ৬১ দশমিক ৬৬ শতাংশ। নবম অবস্থানে নির্ঝর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ। এখানেও পাসের হার শতভাগ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে ৫৯ দশমিক ৩৩ শতাংশ।
দশম অবস্থানে রয়েছে ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজ। প্রতিষ্ঠানটির পাসের হার ৯৯ দশমিক ৭৪ শতাংশ। পাস করা শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৬১ দশমিক ৪৪ শতাংশ জিপিএ-৫ পেয়েছে।
পিছিয়ে নামি প্রতিষ্ঠানগুলো
এবার ঢাকার শীর্ষ তালিকায় ১৮ নম্বরে রয়েছে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং ১৭ নম্বরে মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ। ঐতিহ্যবাহী মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় নেমে গেছে ১৯ নম্বরে।
ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজে এবার পাসের হার ৯৭ দশমিক ৯৭ শতাংশ। প্রতিষ্ঠানটি থেকে ৪৩ জন শিক্ষার্থী ফেল করেছে। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৫৩ দশমিক ৭৯ শতাংশ। মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজে পাসের হার ৯৮ দশমিক ০২ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে ৫৩ দশমিক ৬৪ শতাংশ শিক্ষার্থী।
মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে পাসের হার ৯২ দশমিক ২৩ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৩১ দশমিক ৯২ শতাংশ শিক্ষার্থী। মাইলস্টোন কলেজে পাসের হার ৯৯ দশমিক ৬৭ শতাংশ হলেও জিপিএ-৫ পেয়েছে ৪১ দশমিক ১২ শতাংশ। বিএএফ শাহীন কলেজের পাসের হার ৯৯ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে ৪৮ দশমিক ৯৩ শতাংশ শিক্ষার্থী।
নামী এসব প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করাতে শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের দীর্ঘ প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হয়। তুলনামূলক বেশি বেতন, ফি ও অন্যান্য খরচ বহনের পরও প্রত্যাশিত ফল না পাওয়ায় হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অভিভাবকরা।
চলতি বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় দেশের ১১টি শিক্ষা বোর্ডে গড় পাসের হার ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ। ২০২৫ সালে এ হার ছিল ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে ৬ দশমিক ২০ শতাংশ।
এ বছর ১১ শিক্ষা বোর্ডে মোট জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জন শিক্ষার্থী। গত বছর জিপিএ-৫ পেয়েছিল ১ লাখ ৩৯ হাজার ৩২ জন। ফলে এবার জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
পরীক্ষায় ফল বিপর্যয়ের কারণ
এবার এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় ফল বিপর্যয়ের পেছনে নানা কারণ সামনে এসেছে। খাতা মূল্যায়নে শিক্ষকদের পেশাদারি মনোভাবের ঘাটতি, দীর্ঘমেয়াদি শিখন ঘাটতি, নবম শ্রেণিতে এক কারিকুলাম ও দশম শ্রেণিতে আরেক কারিকুলামের চাপ, গণিত ও ইংরেজিতে শিক্ষার্থীদের মৌলিক দুর্বলতা—সবই এবারের ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করছেন শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা।
এর সঙ্গে রয়েছে শিক্ষক সংকট, মুখস্থ ও গাইডনির্ভর পড়াশোনা এবং গ্রাম ও শহরের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিদ্যমান বৈষম্য। এসব কারণে এবার এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাসের হার গত বছরের তুলনায় ৬ শতাংশের বেশি কমেছে। একই সঙ্গে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কমেছে ২২ হাজারের বেশি।
শিক্ষাবিদদের মতে, দীর্ঘদিনের শিখন ঘাটতির পাশাপাশি শিক্ষাব্যবস্থার বিভিন্ন দুর্বলতাও এবারের ফলাফলের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়েছে। তাই খারাপ ফলের কারণগুলো চিহ্নিত করে শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
করোনার প্রভাব ও কারিকুলামের পরিবর্তন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম বলেন, মাধ্যমিকের শুরুতেই শিক্ষার্থীরা করোনার অভিঘাতের মধ্যে পড়েছে। এরপর ২০২৪ সালে নবম শ্রেণিতে নতুন কারিকুলাম চালু হয়। পরে দশম শ্রেণিতে তাদের আবার ভিন্ন কারিকুলামে পড়াশোনা করতে হয়েছে।
এর পাশাপাশি এবারের পরীক্ষায় প্রথমবারের মতো সিসিটিভি ক্যামেরাসহ বিভিন্ন ধরনের কড়াকড়ি ছিল। শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের শিখন ঘাটতিও রয়েছে। এসব কারণেই এবার ফল খারাপ হয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
অধ্যাপক আবদুস সালাম বলেন, এতকিছুর পরও তিনি এবারের ফলকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন। এখন সরকারের দায়িত্ব হবে শিক্ষার গুণগত মান বাড়ানোর দিকে গুরুত্ব দেওয়া। বিশেষ করে ইংরেজি ও গণিতের ওপর বেশি জোর দিতে হবে।
গণিত-ইংরেজিতে মৌলিক দুর্বলতা
এবার ১১ শিক্ষা বোর্ডে ইংরেজিতে ২৭ শতাংশ শিক্ষার্থী ফেল করেছে। অন্যদিকে গণিতে ফেল করেছে ২২ শতাংশ। গত বছরের তুলনায় দুই বিষয়েই ফেলের হার বেড়েছে। ফলে শিক্ষার্থীদের গণিত ও ইংরেজিতে মৌলিক দুর্বলতার বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে।
গণিতে নিয়মিত অনুশীলনের অভাব ও মৌলিক ধারণার ঘাটতি রয়েছে। আর ইংরেজিতে গ্রামার, রিডিং ও ভাষাগত দক্ষতায় বড় ধরনের দুর্বলতা দেখা গেছে।
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান তপন কুমার সরকার বলেন, ইংরেজি ও গণিতে মৌলিক দক্ষতা উন্নয়নে জাতীয় পর্যায়ে বিশেষ কর্মসূচি নেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ বাড়াতে হবে।
তিনি বলেন, গণিত নিয়মিত অনুশীলনের বিষয়। কিন্তু শিক্ষার্থীদের মধ্যে কম পড়াশোনা করে পরীক্ষাকেন্দ্রে যাওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। ইংরেজির ক্ষেত্রেও গ্রামার ও রিডিংয়ে তাদের মৌলিক দুর্বলতা স্পষ্ট।
মুখস্থ ও গাইডনির্ভর পড়াশোনা
শিক্ষার্থীদের মধ্যে বই বুঝে শেখার পরিবর্তে উত্তর মুখস্থ করার প্রবণতা বেড়েছে। গাইড বই, নোট ও সাজেশনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে পরিচিত প্রশ্ন এলে উত্তর দিতে পারলেও প্রশ্নের ধরন পরিবর্তন হলে তারা সমস্যায় পড়ে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলেন, কারিকুলামে নির্ধারিত শিখনফল অনুযায়ী প্রশ্ন না করে অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি পাঠ্যবই থেকে প্রশ্ন করা হয়। এতে শিক্ষার্থীর বিশ্লেষণ, যুক্তি ও প্রয়োগের দক্ষতা যথাযথভাবে যাচাই করা সম্ভব হয় না।
তিনি বলেন, প্রশ্ন করতে হবে কারিকুলাম থেকে—শিক্ষার্থী কী শিখেছে, কী বুঝেছে, কী বিশ্লেষণ করতে পারে এবং কীভাবে যুক্তি উপস্থাপন করতে পারে, তা যাচাই করতে হবে। শুধু বইয়ের তথ্য মুখস্থ করিয়ে মূল্যায়ন করলে শিক্ষার প্রকৃত মান বোঝা সম্ভব নয়।
অধ্যাপক মজিবুর রহমান আরও বলেন, দেশে এখনো মানসম্মত ও অভিন্ন মূল্যায়ন পদ্ধতি পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি। একই উত্তরপত্র একজন পরীক্ষকের হাতে এক ধরনের নম্বর এবং অন্য পরীক্ষকের হাতে ভিন্ন নম্বর পেতে পারে।
শিক্ষক সংকটে ব্যাহত পাঠদান
অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনের তুলনায় শিক্ষক কম থাকায় পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। একজন শিক্ষককে একাধিক ক্লাস নিতে হচ্ছে। ফলে শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন অনুযায়ী আলাদাভাবে সহায়তা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।
অভিজ্ঞ শিক্ষকরা অবসরে চলে যাওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠানে অভিজ্ঞতার ঘাটতিও তৈরি হয়েছে। শিক্ষাবিদদের মতে, শুধু শিক্ষক সংখ্যা বাড়ালেই হবে না; মানসম্মত শিক্ষক নিয়োগ, যথাযথ প্রশিক্ষণ এবং পেশাগত দায়বদ্ধতাও নিশ্চিত করতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও শিক্ষাবিদ ড. ছিদ্দিকুর রহমান খান বলেন, একজন শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ের নির্বাচনী পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তিন মাস প্রস্তুতি নেওয়ার পরও যদি বোর্ড পরীক্ষায় ফেল করে, তাহলে শুধু শিক্ষার্থীকে দায়ী করা যায় না।
বিদ্যালয়ে পাঠদান, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, কারিকুলাম বাস্তবায়ন এবং শিক্ষকদের পেশাগত দায়বদ্ধতার জায়গায়ও বড় ঘাটতি রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ড. ছিদ্দিকুর রহমান বলেন, শিক্ষক প্রশিক্ষণের ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। অনেক শিক্ষক মানসম্মত উপায়ে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করতে পারছেন না। একই সঙ্গে শিক্ষকরা পেশাগতভাবে কতটা মনোযোগী, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
শিক্ষাবিদদের মতে, এবারের ফলাফলকে শুধু শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতা হিসেবে না দেখে পুরো শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা চিহ্নিত করার সুযোগ হিসেবে দেখা প্রয়োজন। শিখন ঘাটতি পূরণ, গণিত ও ইংরেজিতে মৌলিক দক্ষতা বাড়ানো, শিক্ষক সংকট দূর করা, মানসম্মত প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা এবং মুখস্থনির্ভর শিক্ষার পরিবর্তে দক্ষতাভিত্তিক মূল্যায়ন চালু করলেই শিক্ষার গুণগত মান উন্নত করা সম্ভব।
(ঢাকাটাইমস/১২ আগস্ট/আরজেড)
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













































