চা শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা: রাষ্ট্র, মালিক ও শ্রমিকের দায়িত্ব

আবুল ফয়েজ মোঃ হাবিবুর রহমান
  প্রকাশিত : ২৯ আগস্ট ২০২৬, ১৪:১১
অ- অ+

বাংলাদেশের চা শিল্প আমাদের কৃষি, অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, চট্টগ্রাম এবং সাম্প্রতিক সময়ে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় চা-বাগানকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে বিস্তৃত অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবন। কিন্তু এই শিল্পের মূল চালিকাশক্তি—চা শ্রমিকদের জীবনযাত্রা ও ন্যায্য অধিকার—নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন রয়েছে। চা শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা নিশ্চিত করা তাই শুধু শ্রমিকের অধিকার নয়; এটি একটি ন্যায়ভিত্তিক, উৎপাদনশীল ও টেকসই চা শিল্প গড়ে তোলার পূর্বশর্ত।

চা শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মজুরি। ২০২২ সালের দীর্ঘ আন্দোলনের পর দৈনিক নগদ মজুরি ১২০ টাকা থেকে ১৭০ টাকায় উন্নীত হয়। পরবর্তী মজুরি কাঠামোতে ৫ শতাংশ করে বৃদ্ধির ব্যবস্থা করা হয়।

কিন্তু জীবনযাত্রার ব্যয়, খাদ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচ বিবেচনায় শ্রমিক সংগঠনগুলো এই মজুরিকে অপর্যাপ্ত বলে আসছে। ২০২৪ সাল থেকেই শ্রমিকদের বিভিন্ন সংগঠন দৈনিক ৫০০ টাকা মজুরির দাবি জানিয়ে আসছে। ২০২৬ সালের জুলাইয়েও মৌলভীবাজারের কালিটি চা-বাগানের শ্রমিকরা দৈনিক ৫০০ টাকা মজুরি, ভূমির অধিকারসহ বিভিন্ন দাবিতে কর্মবিরতি পালন করেছেন।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—

ন্যূনতম মজুরি আর জীবনধারণযোগ্য মজুরি এক জিনিস নয়। একজন শ্রমিকের পরিবার যাতে খাদ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা, পোশাক, বাসস্থান ও জরুরি ব্যয় মেটাতে পারে, এমন মজুরি নির্ধারণ করাই হওয়া উচিত নীতির লক্ষ্য।

শুধু নগদ মজুরি নয় চা শ্রমিকদের পারিশ্রমিকের ক্ষেত্রে বাগান কর্তৃপক্ষের দেওয়া বাসস্থান, রেশন, চিকিৎসা বা অন্যান্য সুবিধার বিষয়টিও বিবেচনা করা হয়। কিন্তু এসব সুবিধার বাস্তব মান, প্রাপ্যতা ও বাগানভেদে পার্থক্য রয়েছে। তাই শ্রমিকের প্রকৃত জীবনমান মূল্যায়নের জন্য নগদ মজুরি + সামাজিক সুবিধা + নিরাপদ কর্মপরিবেশ—এই তিনটি একসঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO)-র গবেষণাতেও বাংলাদেশের চা-বাগান

শ্রমিকদের শ্রম অধিকার, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও ন্যায্য পারিশ্রমিক নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে।

স্বাস্থ্য ও শিক্ষার অধিকার

চা শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা বলতে শুধু বেতন বোঝালে বিষয়টি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। একজন শ্রমিকের সন্তান যদি ভালো শিক্ষা না পায়, পরিবার যদি যথাযথ চিকিৎসা না পায়, নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন না থাকে—তাহলে সামগ্রিক জীবনমান উন্নত হয় না।

CPD-এর সাম্প্রতিক আলোচনায় চা-বাগান এলাকায় স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য মৌলিক সুবিধার ঘাটতির বিষয়টি উঠে এসেছে; একই সঙ্গে শ্রমের কারণে শ্রমিকদের মধ্যে বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার উচ্চ প্রবণতার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

বিশেষ করে নারী চা শ্রমিকদের জন্য মাতৃত্বকালীন সুবিধা, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, স্বাস্থ্যসেবা ও শিশুর যত্নের ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নারী শ্রমিকরা চা শিল্পের উৎপাদনে বড় ভূমিকা রাখলেও তাঁদের শ্রমের মূল্যায়ন শুধু দৈনিক মজুরির হিসাব দিয়ে করা যথেষ্ট নয়।

চা শ্রমিকদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি হলো ভূমির অধিকার। বহু শ্রমিক পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম চা-বাগানের এলাকায় বসবাস করলেও তাঁদের বসতভিটার ওপর পূর্ণ মালিকানা নেই। ফলে কর্মসংস্থান ও বাসস্থানের নিরাপত্তা পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে।

২০২৬ সালের সাম্প্রতিক শ্রমিক আন্দোলনেও ভূমির মালিকানা অন্যতম দাবি হিসেবে সামনে এসেছে।

রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো ঐতিহাসিক বাস্তবতা, বাগানের জমির মালিকানা ও লিজ কাঠামো এবং শ্রমিক পরিবারের দীর্ঘদিনের বসবাস—সবকিছু বিবেচনা করে একটি ন্যায়সংগত ও বাস্তবসম্মত ভূমি-নীতি তৈরি করা।

চা শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, মজুরি নির্ধারণের ক্ষেত্রে নিয়মিত জীবনযাত্রার ব্যয়, মূল্যস্ফীতি ও উৎপাদনশীলতা বিবেচনা করতে হবে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে সংসদে জানানো হয়েছিল যে চা শ্রমিকদের মজুরি পুনর্বিবেচনার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার কথা রয়েছে এবং সরকার শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা নিশ্চিত করতে নজরদারি করবে।

দ্বিতীয়ত, শ্রম আইন ও মজুরি-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে কার্যকর পরিদর্শন ও

জবাবদিহি প্রয়োজন। শুধু গেজেট প্রকাশ করলেই শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিত হয় না; প্রত্যন্ত বাগানেও তার বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, সরকারকে চা-বাগান এলাকায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিশুদ্ধ পানি, স্যানিটেশন ও সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণ করতে হবে। এতে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ যেমন প্রয়োজন, তেমনি মালিকদের আইনগত ও সামাজিক দায়িত্বও নিশ্চিত করতে হবে।

মালিকদের দায়িত্ব

চা শিল্পের মালিকদেরও মনে রাখতে হবে, শ্রমিক কেবল উৎপাদন ব্যয়ের একটি অংশ নয়; শ্রমিকই শিল্পের মানবিক ও উৎপাদনশীল মূলধন। ILO-এর আলোচনায়ও মজুরি ও সুবিধা বাড়লে শ্রমিকের জীবনমানের পাশাপাশি উৎপাদনশীলতা ও শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি সুফল বাড়তে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

তাই মালিকদের উচিত সময়মতো ন্যায্য মজুরি দেওয়া, শ্রমিকের প্রাপ্য সুবিধা নিশ্চিত করা, নিরাপদ কর্মপরিবেশ তৈরি করা এবং স্বাস্থ্য ও আবাসন ব্যবস্থার উন্নতি করা। একই সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তি ও দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ করলে উৎপাদন বাড়বে এবং শ্রমিক ও মালিক উভয়েই লাভবান হতে পারেন।

অধিকারের পাশাপাশি শ্রমিকদেরও দায়িত্ব রয়েছে। নিয়মিত কর্মস্থলে উপস্থিতি, দক্ষতা বৃদ্ধি, চা-পাতার মান বজায় রাখা, উৎপাদনশীলতা বাড়ানো এবং কর্মক্ষেত্রের নিয়ম মেনে চলা শ্রমিকের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

তবে শ্রমিকের দায়িত্ব পালনের বিনিময়ে ন্যায্য পারিশ্রমিক ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত হওয়া আবশ্যক। শ্রমিকদের দাবিদাওয়া আদায়ের ক্ষেত্রেও শান্তিপূর্ণ ও সংগঠিত আন্দোলন, আলোচনার মাধ্যমে সমাধান এবং আইনসম্মত শ্রমিক সংগঠনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

ত্রিপক্ষীয় সমাধানই সবচেয়ে কার্যকর

চা শিল্পের সমস্যার স্থায়ী সমাধান কোনো এক পক্ষ একা করতে পারবে না। প্রয়োজন রাষ্ট্র + মালিক + শ্রমিক—এই তিন পক্ষের নিয়মিত ও প্রাতিষ্ঠানিক সংলাপ। ILO-ও বাংলাদেশের চা শিল্পে decent work ও অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য নিয়ে শ্রমিক, মালিক ও সরকারের ত্রিপক্ষীয় সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।

একটি বাস্তবসম্মত মডেল হতে পারে।

ফলে শ্রমিক পুনর্মূল্যায়ন, জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে মজুরি সমন্বয়, উৎপাদনশীলতার সঙ্গে প্রণোদনা, শ্রমিক পরিবারের জন্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্য কর্মসূচি এবং ভূমি-সংক্রান্ত সমস্যার জন্য পৃথক কমিশন বা কার্যকর সমাধান কাঠামো।

উপসংহার

বাংলাদেশের চা শিল্পের ভবিষ্যৎ শুধু নতুন চা-বাগান তৈরি বা উৎপাদন বাড়ানোর ওপর নির্ভর করে না; বরং চা শ্রমিকের জীবনমান কতটা উন্নত হচ্ছে, তার ওপরও নির্ভর করে। যে শ্রমিকের হাতে প্রতিদিন হাজার হাজার কেজি চা-পাতা সংগ্রহ হয়, তাঁর নিজের পরিবার যদি ন্যূনতম জীবনমান থেকে বঞ্চিত থাকে, তাহলে চা শিল্পের উন্নয়নকে পূর্ণাঙ্গ উন্নয়ন বলা যায় না।

তাই চা শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা নিশ্চিত করা কোনো দয়া বা অনুগ্রহ নয়—এটি তাঁদের শ্রমের ন্যায্য মূল্য এবং নাগরিক অধিকার। রাষ্ট্রকে দিতে হবে কার্যকর নীতি ও নজরদারি, মালিককে দিতে হবে ন্যায্য মজুরি ও মানবিক কর্মপরিবেশ, আর শ্রমিককে দায়িত্বশীল ও উৎপাদনশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

চা শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, শিক্ষা-স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা ও ভূমির অধিকার—এই পাঁচটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়েই বাংলাদেশে একটি মানবিক, উৎপাদনশীল ও টেকসই চা শিল্প গড়ে তোলা সম্ভবপর হবে বলে বিজ্ঞজনেরা ধারণা পোষণ করেন।

লেখক: ব্যবস্থাপনা পরিচালক, নর্থ বেঙ্গল পেপার মিলস লিমিটেড

(ঢাকাটাইমস/২৯ আগস্ট/আরজেড)

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
ভিয়েনার জাদুঘর থেকে রাজপরিবারের ৬০০ হীরাখচিত নেকলেস চুরি
আমরা আমাদের নীতি অনুযায়ী কাজ করব, ভারত চলবে ভারতের মতো: আইনমন্ত্রী
বিকেলে ২,৮৯৪ মেগাওয়াট লোডশেডিংয়ের পূর্বাভাস, ভোগাবে রাতেও
কুর্মিটোলা হাসপাতালে হারিয়ে যাওয়া শিশুকে উদ্ধার করল আনসার সদস্য
বিশেষ প্রতিবেদন তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা