উষ্ণতা বৃদ্ধিতে গলে যাচ্ছে হাজার বছরের বরফ, বাড়ছে বিপর্যয়কর বন্যার ঝুঁকি

বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রভাবে দ্রুত গলে যাচ্ছে হাজার বছরের পুরোনো হিমবাহ। বিশেষ করে হিমালয় অঞ্চলে বরফ গলে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে হঠাৎ নেমে আসছে বরফ, পাথর, কাদা ও পানির ভয়াবহ স্রোত। এতে মুহূর্তেই ধ্বংস হচ্ছে সড়ক, সেতু, বসতি ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। বাড়ছে প্রাণহানি ও পরিবেশগত বিপর্যয়ের ঝুঁকি।
নেপাল-তিব্বত সীমান্তে সাম্প্রতিক ভয়াবহ পাহাড়ি ঢল নতুন করে হিমালয়ের জলবায়ু ঝুঁকিকে সামনে এনেছে। একসময় বছরের অধিকাংশ সময় বরফে ঢাকা থাকা পাহাড়ের বিভিন্ন অংশে এখন উন্মুক্ত হচ্ছে পাথর ও মাটি। এর প্রভাব শুধু নদী ও পানির ওপর নয়, বদলে দিচ্ছে হিমালয়ের জীববৈচিত্র্য ও প্রাণীদের আবাসস্থলও।
গত ২৬ আগস্ট কোনো আগাম সংকেত ছাড়াই নেপাল-তিব্বত সীমান্তের লেন্দে খোলা নদীতে বিপুল পরিমাণ বরফ, শিলা ও ধ্বংসাবশেষ নেমে আসে। এতে নদীর পানি দ্রুত বেড়ে গিয়ে নিচের দিকে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা সৃষ্টি হয়। কৃত্রিম উপগ্রহের তথ্য বিশ্লেষণেও হিমবাহ ও পাহাড়ের অংশবিশেষ ধসে পড়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
২০২৪ সালেও থামে উপত্যকায় একটি হিমবাহ-হ্রদ বিস্ফোরণের ফলে ভয়াবহ বন্যা হয়েছিল। আন্তর্জাতিক পর্বত উন্নয়ন সংস্থার গবেষণায় বলা হয়েছে, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে হিমালয়ের হিমবাহ দ্রুত বরফ হারাচ্ছে। ফলে পাহাড়ি এলাকায় হিমবাহ-হ্রদ তৈরি এবং সেগুলো বিস্ফোরিত হয়ে ভয়াবহ বন্যা সৃষ্টি হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে।
গবেষকদের মতে, হিমালয় বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জীববৈচিত্র্যের ভাণ্ডার। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন ও মানব কর্মকাণ্ডের কারণে এই বাস্তুতন্ত্র ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।
সম্প্রতি এক গবেষণায় হিমালয়জুড়ে সীমান্তবর্তী ভূদৃশ্যের বাস্তুতন্ত্রকে জলবায়ু পরিবর্তন ও মানব কর্মকাণ্ডের কারণে ক্রমবর্ধমান ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এশিয়ার হিমবাহগুলো দীর্ঘমেয়াদে বরফ হারানোর ফলে পাহাড়ি প্রাণীদের আবাসস্থল, খাদ্য, পানি ও প্রজনন পরিবেশেও পরিবর্তন আসছে।
বিশেষ করে যেসব প্রাণীর বেঁচে থাকার জন্য নির্দিষ্ট ঠান্ডা পরিবেশ প্রয়োজন এবং যারা দ্রুত উচ্চতর এলাকায় সরে যেতে পারে না, তারাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
এভারেস্টের হিমবাহেও ভয়াবহ পরিবর্তন
বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্টের কাছেও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব স্পষ্ট। এভারেস্টের অনতিদূরে অবস্থিত সাউথ কল হিমবাহে সহস্রাব্দ ধরে জমা বরফ গত কয়েক দশকে দ্রুত গলে যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মেইন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক গবেষণা অনুযায়ী, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে গত ২৫ বছরে সাউথ কল হিমবাহ প্রায় ৫৫ মিটার পাতলা হয়েছে। গবেষকদের মতে, প্রায় দুই হাজার বছর ধরে যে বরফ জমেছে, তা জমার সময়ের তুলনায় প্রায় ৮০ গুণ দ্রুত হারে গলে যাচ্ছে।
গবেষণাটি ‘জলবায়ু ও বায়ুমণ্ডলীয় বিজ্ঞান’ বিষয়ক নেচার পোর্টফোলিও জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। গবেষকদের আশঙ্কা, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আগামী কয়েক দশকের মধ্যে এভারেস্টের সর্বোচ্চ উচ্চতায় থাকা এই হিমবাহ বিলীন হয়ে যেতে পারে।
মেইন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও গবেষক পল মায়েস্কি এই পরিবর্তনকে মারাত্মক ও অভূতপূর্ব হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২৬ হাজার ফুট উচ্চতায় অবস্থিত সাউথ কল হিমবাহ এভারেস্টের চূড়া থেকে মাত্র এক কিলোমিটার দূরে। গবেষকদের মতে, হিমালয়ের আরও বহু হিমবাহ একইভাবে দ্রুত গলছে।
বাড়ছে বন্যা ও পানির সংকটের আশঙ্কা
হিমবাহ গলে যাওয়ার ফলে হিমালয়ের পাদদেশে একের পর এক হিমবাহ-হ্রদ তৈরি হচ্ছে। এসব হ্রদ কোনো কারণে ভেঙে গেলে বা বিস্ফোরিত হলে নিচের জনপদে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা দেখা দিতে পারে।
অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে হিমবাহের বরফ কমে গেলে এশিয়ার কোটি কোটি মানুষের পানি সরবরাহ, কৃষি, খাদ্য উৎপাদন ও জলবিদ্যুৎ ব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে। হিমালয়ের বরফ ও তুষার গলে যাওয়া এ অঞ্চলের নদীগুলোর পানিপ্রবাহের ওপরও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
২৫ বার এভারেস্ট জয় করা নেপালের পর্বতারোহী কমি রিতা শেরপাও হিমালয়ের পরিবর্তন নিজের চোখে দেখেছেন। তার ভাষ্য, আগে যেসব এলাকায় পুরু বরফ দেখা যেত, এখন সেসব স্থানে বরফ প্রায় নেই বললেই চলে। দ্রুত হারে বরফ গলে যাওয়া উদ্বেগজনক বলেও তিনি মন্তব্য করেছেন।
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ঝুঁকি
শুধু হিমালয় নয়, বিশ্বের অন্যান্য বরফাবৃত অঞ্চলও দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। গ্রিনল্যান্ড ও অ্যান্টার্কটিকার বিশাল বরফস্তর বাদ দিলে বিশ্বের অন্যান্য হিমবাহে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার ঘনকিলোমিটার বরফ রয়েছে। উষ্ণ বাতাসের কারণে আল্পস, আন্দিজ ও হিমালয়সহ বিভিন্ন পর্বতমালার হিমবাহ দ্রুত বরফ হারাচ্ছে।
গবেষকদের মতে, তুষারপাতের মাধ্যমে নতুন করে যে পরিমাণ বরফ জমছে, তা গলে যাওয়ার ক্ষতি পূরণ করতে পারছে না। ফলে দীর্ঘমেয়াদে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির আশঙ্কা আরও বাড়ছে।
অ্যান্টার্কটিকার থওয়েটস হিমবাহ, যা ‘ডুমসডে গ্লেসিয়ার’ বা ‘বিচারদিনের হিমবাহ’ নামেও পরিচিত, নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে আসছেন। এর বড় অংশ ধসে পড়লে বৈশ্বিক সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে। এতে বাংলাদেশ, মালদ্বীপ ও সাংহাইয়ের মতো নিচু উপকূলীয় অঞ্চলসহ বিশ্বের বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকা বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
ব্রিস্টল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ম্যাট পামারের মতে, সমুদ্র ও বরফাবৃত অঞ্চলগুলো বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রতিক্রিয়া ধীরে দেখায়। ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি ও ক্রমবর্ধমান হুমকি হয়ে উঠছে।
গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৯ সাল থেকে বিশ্বে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা প্রতিবছর গড়ে ৩ দশমিক ৬৪ মিলিমিটার করে বেড়েছে। ২০১২ সালের পর কৃত্রিম উপগ্রহের তথ্য বিশ্লেষণে এই বৃদ্ধির হার বেড়ে বছরে প্রায় ৪ দশমিক ১ মিলিমিটারে পৌঁছেছে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, হিমবাহ গলে যাওয়া এখন আর কেবল পাহাড়ি অঞ্চলের সমস্যা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পানির নিরাপত্তা, খাদ্য উৎপাদন, জীববৈচিত্র্য, অবকাঠামো, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং কোটি কোটি মানুষের ভবিষ্যৎ।
এ কারণে গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ কমানোর পাশাপাশি হিমবাহ ও ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি অঞ্চল নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি।
(ঢাকাটাইমস/২৯ আগস্ট/আরজেড)
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন











































