অনিয়ম-দুর্নীতির দায়ে উদ্দীপনের পরিচালনা পর্ষদ বরখাস্ত

আর্থিক অনিয়ম, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পর জাতীয় পর্যায়ের বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা উদ্দীপনের বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ সাময়িকভাবে বরখাস্ত করেছে সমাজসেবা অধিদপ্তর। একই সঙ্গে সংস্থাটির প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন কার্যনির্বাহী কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মিজানুর রহমানকে প্রধান করে তত্ত্বাবধায়কমণ্ডলী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
গত রোববার সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহ মোহাম্মদ মাহবুব স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়।
অফিস আদেশে বলা হয়েছে, উদ্দীপনের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান এ এইচ এম আফজাল ও দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক (সিইও) সৈয়দ মনির হোসেনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর গত ১৫ জুন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশনায় তদন্ত শুরু হয়। পরে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় গত ৭ জুলাই দুই সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটি ১৪ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিবেদন দাখিল করে।
তদন্ত প্রতিবেদনে সংস্থাটির কর্তাব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে বলে অফিস আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় গত ২০ আগস্ট বর্তমান পর্ষদ বরখাস্ত এবং সংস্থাটির প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সিদ্ধান্ত দেয়।
পরে ‘স্বেচ্ছাসেবী সমাজকল্যাণ সংস্থাসমূহ (রেজিস্ট্রেশন ও নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাদেশ, ১৯৬১’-এর ৯(১) ধারা অনুযায়ী উদ্দীপনের বর্তমান কার্যনির্বাহী কমিটি সাময়িকভাবে বরখাস্ত করে সমাজসেবা অধিদপ্তর। একই অধ্যাদেশের ৯(২) ধারা অনুযায়ী অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মিজানুর রহমানকে তত্ত্বাবধায়কমণ্ডলীর প্রধান করা হয়।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, নির্বাহী পরিচালক ও সিইও পদে থেকেও সৈয়দ মনির হোসেন উদ্দীপনের ওপর একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছেন। মেধা, যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে দক্ষ পেশাজীবী নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হলে কৌশলে তা বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, নিয়োগপ্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করতে নিয়োগসংক্রান্ত ই-মেইল ঠিকানা অকার্যকর করে রাখা এবং আবেদন গ্রহণের প্রক্রিয়া কার্যত বন্ধ করে দেওয়ার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল।
এ ছাড়া সৈয়দ মনির হোসেনের বিরুদ্ধে প্রধান কার্যালয়ের একাধিক নারী কর্মীকে হয়রানি এবং কয়েকজনকে চাকরি ছাড়তে বাধ্য করার অভিযোগও রয়েছে। একজন নারী কর্মী যৌন ও মৌখিক হয়রানির অভিযোগ কর্তৃপক্ষের নজরে আনেন। পরে তাঁকে অন্য একজন লাইন ম্যানেজারের অধীনে স্থানান্তরের ব্যবস্থা করতে হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
সৈয়দ মনির হোসেনের আরেকটি সংগঠনে পদ গ্রহণ নিয়েও অভিযোগ উঠেছে। ঢাকাস্থ দুমকী উপজেলা জনকল্যাণ সমিতি নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী ও জনকল্যাণমূলক সংগঠন ১৯৮৮ সালের ৭ অক্টোবর প্রতিষ্ঠিত হয়। সংগঠনটির নিবন্ধন নম্বর ঢ-০৯৪০৯।
অভিযোগ অনুযায়ী, গত ১২ জুলাই সমিতির নির্বাচন কমিশন সৈয়দ মনির হোসেনকে ৫১ সদস্যের কার্যনির্বাহী কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ঘোষণা করে। উদ্দীপনের বোর্ডের পূর্বানুমোদন ছাড়াই এবং বোর্ডকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত না করে তিনি ওই পদ গ্রহণ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এতে উদ্দীপনের দায়িত্বের বাইরে তাঁর অতিরিক্ত প্রাতিষ্ঠানিক দায়বদ্ধতা তৈরি হয়েছে এবং সংস্থার আর্থিক বা কর্মসূচিগত কার্যক্রমের সঙ্গে সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাতের বিষয়টি সামনে এসেছে।
অভিযোগসংক্রান্ত নথিতে বলা হয়েছে, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও সমাজসেবা অধিদপ্তরের পৃথক দুটি তদন্ত দল উদ্দীপনের ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনা পর্ষদের বিরুদ্ধে ওঠা অব্যবস্থাপনা, আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতিসহ বিভিন্ন অভিযোগ তদন্ত করেছে।
তদন্তে অভিযোগগুলো সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে বলে নথিতে দাবি করা হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে উদ্দীপনের বর্তমান বোর্ড ভেঙে দেওয়ার পাশাপাশি আর্থিক অর্থ আত্মসাৎ বা অপব্যবহার, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে সৈয়দ মনির হোসেনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলেও নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
এ ছাড়া উদ্দীপনের কর্মীদের গ্র্যাচুইটি তহবিল থেকে কোটি কোটি টাকা উত্তোলন এবং সংস্থাটির দুটি লাভজনক সহযোগী প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এসব অভিযোগের সঙ্গে মো. আবু আব্দুল্লাহ, আনিস ফেরদৌসী, শহীদ আহমেদ, মোহাম্মদ আলী সরকার ও মো. এমদাদ হোসাইনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। উদ্দীপনের প্রধান কার্যালয়ের কর্মী মো. সিরাজুল ইসলামের নামও সংশ্লিষ্ট অভিযোগে এসেছে।
নথিতে তাঁদের উদ্দীপনের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার প্রচেষ্টাকে সমর্থনকারী একটি জোটের অংশ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য জানা যায়নি।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী, নবগঠিত তত্ত্বাবধায়কমণ্ডলী সংস্থাটির দায়িত্ব গ্রহণ করে অনুমোদিত গঠনতন্ত্রের আলোকে ৯০ দিনের মধ্যে নতুন কার্যনির্বাহী কমিটির নির্বাচন সম্পন্ন করবে। নির্বাচন শেষে দ্রুততম সময়ের মধ্যে নির্বাচিত কমিটির কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করতে বলা হয়েছে।
দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে প্রতি মাসের ৫ তারিখের মধ্যে গৃহীত কার্যক্রমের অগ্রগতি প্রতিবেদন সমাজসেবা অধিদপ্তরে জমা দিতে তত্ত্বাবধায়কমণ্ডলীকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রাজধানীর আদাবরের রিং রোডে অবস্থিত উদ্দীপন ১৯৮৬ সালের ২৭ এপ্রিল সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে নিবন্ধিত হয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। সংস্থাটি প্রান্তিক, সুবিধাবঞ্চিত ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন এবং জীবনমান উন্নয়নে কাজ করে। পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের বিকাশ এবং গ্রামীণ অর্থনীতি সচল রাখতে ঋণসহায়তাও দিয়ে থাকে।
(ঢাকাটাইমস/২৯ আগস্ট/আরজেড)
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













































