আফগানিস্তানে ট্রিলিয়ন ডলারের বিরল খনিজ সম্পদ, যুক্তরাষ্ট্রকে বিনিয়োগের প্রস্তাব তালেবানের

অনলাইন ডেস্ক, ঢাকা টাইমস
  প্রকাশিত : ৩১ আগস্ট ২০২৬, ১৪:৪২
অ- অ+

ভূরাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের আফগানিস্তান নীতি দীর্ঘদিন ধরেই অন্যতম জটিল ও বিতর্কিত বিষয়। ২০০১ সালে শুরু হওয়া দুই দশকের যুদ্ধে হাজার হাজার আফগান বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। ২০২১ সালে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর দ্রুত তালেবান ক্ষমতায় ফিরে আসায় যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ সামরিক ও রাজনৈতিক প্রচেষ্টার কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন ওঠে।

দুই দশকের যুদ্ধ আফগানিস্তানের অবকাঠামো ও অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর বিদেশি সহায়তা কমে যাওয়া এবং দেশটির বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক সম্পদ জব্দ থাকায় অর্থনৈতিক সংকট আরও গভীর হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ও দেশটির মানবিক পরিস্থিতিতে।

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার পর আফগানিস্তানে সামরিক অভিযান শুরু করে ওয়াশিংটন। সে সময় আফগানিস্তানে তালেবান সরকার ক্ষমতায় ছিল এবং আল-কায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেন দেশটিতে অবস্থান করছিলেন।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান লক্ষ্য ছিল আল-কায়েদার অবকাঠামো ধ্বংস করা, ওসামা বিন লাদেনকে ধরতে বা নির্মূল করা এবং আফগানিস্তানের ভূখণ্ডকে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ বন্ধ করা। পরবর্তী সময়ে সামরিক অভিযানের পাশাপাশি আফগানিস্তানে নতুন রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয় যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা।

দুই দশকের মার্কিন ও পশ্চিমা উপস্থিতির সময়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান গঠনে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হয়। বিশেষ করে মেয়েদের শিক্ষা, নারীদের কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে ২০০১ সালের আগের সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যায়।

আফগান নিরাপত্তা বাহিনী গঠন ও প্রশিক্ষণ, রাস্তাঘাট নির্মাণ, সরকারি প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা এবং বিভিন্ন সামাজিক খাতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় করা হয়। তবে এসব উদ্যোগের পাশাপাশি দুর্নীতি, দুর্বল প্রশাসন, রাজনৈতিক বিভাজন এবং তালেবানের দীর্ঘস্থায়ী সশস্ত্র প্রতিরোধ যুক্তরাষ্ট্রের প্রচেষ্টাকে ক্রমাগত চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে।

২০২১ সালে তালেবানের প্রত্যাবর্তন

দীর্ঘ যুদ্ধের পর ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও তালেবানের মধ্যে দোহা চুক্তি হয়। এর ধারাবাহিকতায় ২০২১ সালে আফগানিস্তান থেকে মার্কিন ও মিত্র বাহিনী প্রত্যাহার শুরু করে।

মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের সঙ্গে সঙ্গে আফগান নিরাপত্তা বাহিনীর প্রতিরোধ দ্রুত ভেঙে পড়ে। মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে তালেবান দেশের অধিকাংশ এলাকা নিয়ন্ত্রণে নেয় এবং আগস্টে কাবুলের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে। এর মধ্য দিয়ে আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ২০ বছরের সামরিক উপস্থিতির অবসান ঘটে।

তবে সামরিক অধ্যায়ের অবসানের কয়েক বছর পর এখন অর্থনৈতিক সহযোগিতার নতুন সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনায় আসছে যুক্তরাষ্ট্র ও আফগানিস্তান।

মার্কিন বিনিয়োগ চায় তালেবান

আফগানিস্তানের বিপুল খনিজ সম্পদে বিনিয়োগের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে আহ্বান জানিয়েছে তালেবান সরকার। একই সঙ্গে দেশটির ওপর থাকা যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং বিদেশে জব্দ থাকা আফগান সম্পদ ছাড়ের দাবি জানিয়েছে কাবুল।

আফগানিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকি বলেছেন, খনি, অবকাঠামো, কৃষি ও বাণিজ্যসহ বিভিন্ন খাতে মার্কিন বিনিয়োগকে স্বাগত জানাবে তাঁর সরকার। ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, গত দুই দশকের যুদ্ধের দৃষ্টিকোণ থেকে যুক্তরাষ্ট্র-আফগানিস্তান সম্পর্ককে না দেখে ভবিষ্যৎ সহযোগিতার ভিত্তিতে নতুন করে সম্পর্ক গড়ে তোলা উচিত।

এক ট্রিলিয়ন ডলারের খনিজ সম্পদ

যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা-সমর্থিত আফগান সরকারের করা ভূতাত্ত্বিক জরিপ অনুযায়ী, আফগানিস্তানে অন্তত ১ ট্রিলিয়ন ডলারের খনিজ সম্পদ রয়েছে। দেশটিতে তামা, লৌহ আকরিক, নিওবিয়াম, কোবাল্ট, সোনা ও লিথিয়ামের উল্লেখযোগ্য মজুত রয়েছে।

তবে কয়েক দশকের যুদ্ধ ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে এসব খনিজ সম্পদের বড় অংশ এখনো বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলন করা সম্ভব হয়নি। তালেবান ২০২১ সালে ক্ষমতায় ফেরার পর চীন ও ইরানসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে খনি খাতে কয়েক বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ চুক্তি করেছে। এবার যুক্তরাষ্ট্রকেও এই খাতে যুক্ত করতে চাইছে কাবুল।

বিনিয়োগের পথে নিষেধাজ্ঞা বড় বাধা

তবে আফগানিস্তানে মার্কিন বিনিয়োগের পথে বড় বাধা হিসেবে রয়েছে তালেবান সরকারের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা। বিদেশি কূটনীতিকদের আশঙ্কা, আফগানিস্তানে আন্তর্জাতিক অর্থের প্রবাহ বাড়লে তা তালেবান সরকারকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।

তালেবানের প্রত্যাশা, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়লে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পথ তৈরি হবে। পাশাপাশি বিদেশে থাকা আফগান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভও ফেরত পাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

আফগান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৯ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের রিজার্ভ দেশের বাইরে রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলার যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

বাগরাম নিয়ে আপস নয়, দূতাবাস খোলার আহ্বান

এদিকে আফগানিস্তানের গুরুত্বপূর্ণ বাগরাম বিমানঘাঁটি আবার যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে দেওয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে তালেবান। তবে তালেবান সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকি কাবুলে পরিত্যক্ত মার্কিন দূতাবাস পুনরায় খুলে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

খনিজ সম্পদে মার্কিন বিনিয়োগের প্রস্তাব এবং একই সঙ্গে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও বিদেশে থাকা সম্পদ ফেরত পাওয়ার দাবি—দুই দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্ককে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক আলোচনার নতুন পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

ভূরাজনীতিতে নতুন সমীকরণ

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, আফগানিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতির জন্য একক কোনো কারণকে দায়ী করা যায় না। দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ ও বৈদেশিক হস্তক্ষেপের পাশাপাশি আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দুর্বলতা, দুর্নীতি, জাতিগত ও রাজনৈতিক বিভাজন এবং আঞ্চলিক ভূরাজনীতিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

আফগান নিরাপত্তা বাহিনীকে বিপুল অর্থ ব্যয় করে প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র সরবরাহ করা হলেও তারা শেষ পর্যন্ত তালেবানের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি। একই সঙ্গে আফগান সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতার ঘাটতিও পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে।

তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর যুক্তরাষ্ট্র ও অধিকাংশ পশ্চিমা দেশ আফগানিস্তানের নতুন সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়নি। একই সঙ্গে দেশটির বৈদেশিক সম্পদ জব্দ ও বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা বহাল রয়েছে।

অন্যদিকে চীন, ইরান, রাশিয়া ও মধ্য এশিয়ার কয়েকটি দেশ তালেবান সরকারের সঙ্গে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক যোগাযোগ বাড়ানোর চেষ্টা করছে। আফগানিস্তানের বিপুল খনিজ সম্পদও দেশটির ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব বাড়িয়েছে।

তামা, লিথিয়াম, লৌহ আকরিক, সোনা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খনিজের বড় মজুত থাকায় ভবিষ্যতে আফগানিস্তানের অর্থনীতি পুনর্গঠন ও খনিজ সম্পদ আহরণকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র, চীনসহ বিভিন্ন শক্তির মধ্যে নতুন প্রতিযোগিতা তৈরি হতে পারে।

সব মিলিয়ে, আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের দুই দশকের উপস্থিতি একদিকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক ক্ষেত্রে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে, অন্যদিকে দীর্ঘ যুদ্ধের মানবিক ও অর্থনৈতিক মূল্যও ছিল ব্যাপক। ২০২১ সালের ক্ষমতার পালাবদলের পর আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ এখন শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ওপর নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, ইরান ও প্রতিবেশী দেশগুলোর ভূরাজনৈতিক স্বার্থের ওপরও অনেকাংশে নির্ভর করছে।

(ঢাকাটাইমস/৩১ আগস্ট/আরজেড)

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
মিরপুরে এক দিনে ১৪৭ জনকে গ্রেপ্তার করল পুলিশ
সেপ্টেম্বরেও জ্বালানি তেলের দাম অপরিবর্তিত
পূবাইলে বীর মুক্তিযোদ্ধা মিজানুর রহমান মাস্টারকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন
সুনামগঞ্জে সাড়ে ৩ কোটি টাকার ভারতীয় শাড়ি জব্দ
বিশেষ প্রতিবেদন তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা