১৯ দফা থেকে ৩১ দফা, ৪৮ বছরে বিএনপির রাজনৈতিক পথচলা

অনলাইন ডেস্ক, ঢাকা টাইমস
  প্রকাশিত : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৪২
অ- অ+

বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘ ৪৮ বছরের পথ পাড়ি দিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠার পর থেকে রাষ্ট্রক্ষমতা, আন্দোলন-সংগ্রাম, রাজনৈতিক সংকট ও নানা চড়াই-উতরাইয়ের মধ্য দিয়ে দলটির রাজনৈতিক ইতিহাস গড়ে উঠেছে।

এই দীর্ঘ যাত্রায় বিএনপির রাষ্ট্রচিন্তার বিবর্তনকে দুটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দেখা যায়—জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা এবং তারেক রহমানের ৩১ দফা। প্রথমটি ছিল একটি স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার কর্মসূচি, আর পরেরটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক, সাংবিধানিক, প্রশাসনিক, বিচারিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো সংস্কারের রূপরেখা।

১৯ দফায় স্বনির্ভর বাংলাদেশের অঙ্গীকার

১৯৭৭ সালের ৩০ এপ্রিল তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান জাতির সামনে ১৯ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন। তখনো বিএনপি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এর প্রায় দেড় বছর পর ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল প্রতিষ্ঠা করেন।

যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের অর্থনীতি পুনর্গঠন, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন, কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়ন, প্রশাসনের বিকেন্দ্রীকরণ এবং জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাই ছিল ১৯ দফার অন্যতম লক্ষ্য।

কর্মসূচিতে দেশের স্বাধীনতা, অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা, গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। পাশাপাশি বেকারত্ব ও নিরক্ষরতা দূর করা, গৃহহীন মানুষের পুনর্বাসন, ন্যূনতম চিকিৎসা নিশ্চিত করা, নারী ও যুবসমাজের উন্নয়ন এবং বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করার বিষয়ও ছিল।

শ্রমিক-মালিকের সুসম্পর্ক, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, স্থানীয় সরকার শক্তিশালীকরণ, দুর্নীতি রোধ এবং ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়ও ১৯ দফায় স্থান পায়।

খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে নতুন রাজনৈতিক পর্ব

১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর বিএনপির নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন বেগম খালেদা জিয়া। তার নেতৃত্বে এরশাদবিরোধী আন্দোলনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক আন্দোলনে বিএনপি সক্রিয় থাকে। পরবর্তী সময়ে নির্বাচনের মাধ্যমে দলটি একাধিকবার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পায়।

খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ২০১৭ সালে বিএনপি ‘ভিশন ২০৩০’ ঘোষণা করে। এর মধ্য দিয়ে ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থা, অর্থনীতি, গণতন্ত্র ও প্রতিষ্ঠান সংস্কার নিয়ে দলটির রাজনৈতিক পরিকল্পনা নতুন মাত্রা পায়।

৩১ দফার যাত্রা

সময় বদলের সঙ্গে দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতাও বদলে যায়। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৩ সালের জুলাইয়ে বিএনপি রাষ্ট্রকাঠামো সংস্কারের জন্য ৩১ দফা ঘোষণা করে।

দলটির ভাষ্য অনুযায়ী, ৩১ দফা কেবল একটি নির্বাচনী ইশতেহার নয়; এটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক, সাংবিধানিক, প্রশাসনিক, বিচারিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোয় পরিবর্তন আনার একটি পরিকল্পনা।

২০২৩ সালের ১২ জুলাই সরকারবিরোধী আন্দোলনে ‘এক দফা’ দাবি ঘোষণার পরদিন ১৩ জুলাই বিএনপি ৩১ দফা রাষ্ট্র সংস্কারের রূপরেখা সামনে আনে।

৩১ দফায় যা রয়েছে

৩১ দফার শুরুতেই রয়েছে প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের রাজনীতির পরিবর্তে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা। ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’-এর ভিত্তিতে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ‘রেইনবো নেশন’ প্রতিষ্ঠা এবং ‘ন্যাশনাল রিকনসিলিয়েশন কমিশন’ গঠনের প্রস্তাব রয়েছে।

নির্বাচনব্যবস্থায় সংস্কারের অংশ হিসেবে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন, নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতার ভারসাম্য, একজন ব্যক্তির পরপর দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী না থাকার সাংবিধানিক বিধান এবং দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব রয়েছে।

এ ছাড়া সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংস্কার, নির্বাচন কমিশন ও নির্বাচনব্যবস্থার সংস্কার, বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা, জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশন সংস্কার এবং প্রশাসনিক সংস্কারের কথা বলা হয়েছে।

দুর্নীতি দমন কমিশনকে স্বাধীন ও কার্যকর করা, পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা, ন্যায়পাল প্রতিষ্ঠা, আইনের শাসন ও মানবাধিকার নিশ্চিত করার বিষয়ও রয়েছে ৩১ দফায়।

অর্থনীতি ও সামাজিক খাতেও সংস্কারের প্রস্তাব

৩১ দফায় অর্থনৈতিক সংস্কারের জন্য কমিশন গঠন, শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের আধুনিকায়ন, শিল্পের বিকাশ এবং জাতীয় স্বার্থভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতির কথা বলা হয়েছে।

একই সঙ্গে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব নাগরিকের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করা, নারী ও যুবসমাজের ক্ষমতায়ন, শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন এবং সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার বিষয়ও রয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, কৃষকের ন্যায্য মূল্য, সড়ক-রেল-নৌ যোগাযোগের উন্নয়ন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা, তথ্যপ্রযুক্তি ও মহাকাশ গবেষণার সম্ভাবনা কাজে লাগানো এবং পরিবেশবান্ধব নগরায়ণের পরিকল্পনাও ৩১ দফার অংশ।

১৯ দফা থেকে ৩১ দফা

বিএনপির রাজনৈতিক ইতিহাসের দুই গুরুত্বপূর্ণ দলিল ১৯ দফা ও ৩১ দফার মধ্যে সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে অগ্রাধিকারেরও পরিবর্তন দেখা যায়।

১৯ দফার মূল সুর ছিল স্বনির্ভরতা, উৎপাদন বৃদ্ধি, কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়ন, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার। অন্যদিকে ৩১ দফার কেন্দ্রে রয়েছে রাষ্ট্র সংস্কার, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন, নির্বাচনব্যবস্থার সংস্কার, ক্ষমতার ভারসাম্য, আইনের শাসন, মানবাধিকার ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠন।

বিএনপির দাবি, ৩১ দফা হঠাৎ তৈরি কোনো কর্মসূচি নয়। এটি জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা, খালেদা জিয়ার ভিশন ২০৩০ এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতায় তৈরি হয়েছে।

সামনে রাষ্ট্র সংস্কারের চ্যালেঞ্জ

বিএনপির নেতাদের বক্তব্য অনুযায়ী, দীর্ঘ সময়ের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও প্রতিষ্ঠানগত দুর্বলতার পর দেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামো পুনর্গঠনই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। এ ক্ষেত্রে ৩১ দফাকে তারা ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের রাষ্ট্র সংস্কারের রূপরেখা হিসেবে তুলে ধরছেন।

প্রতিষ্ঠার ৪৮ বছরে বিএনপির রাজনৈতিক দর্শনে তাই সময়ের সঙ্গে পরিবর্তন এসেছে, কিন্তু দলটির ভাষ্য অনুযায়ী মূল লক্ষ্য—গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, জনগণের অংশগ্রহণ ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ—অটুট রয়েছে।

১৯৭৭-এর ১৯ দফা যেখানে একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে স্বনির্ভর করার কর্মসূচি হিসেবে সামনে এসেছিল, ২০২৩-এর ৩১ দফা সেখানে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুন করে সাজানোর পরিকল্পনা হিসেবে এসেছে। এই দুই কর্মসূচির মধ্য দিয়েই বিএনপির ৪৮ বছরের রাজনৈতিক পথচলার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবর্তন ফুটে ওঠে।

(ঢাকাটাইমস/১ সেপ্টেম্বর/আরজেড)

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
ডিএমপির অভিযানে  ২৪ ঘণ্টায় ৪৪২ জন গ্রেপ্তার, মামলা ১৯
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪ শিক্ষককে সাময়িক বরখাস্ত
ঝিনাইদহে দুই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে আহত ২০
দেশের গণতন্ত্রকামী জনগণই বিএনপির সব রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎস: প্রধানমন্ত্রী
বিশেষ প্রতিবেদন তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা