যুদ্ধ বন্ধের সমঝোতা স্মারকে সই করল ইরান-যুক্তরাষ্ট্র

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, ঢাকা টাইমস
  প্রকাশিত : ১৮ জুন ২০২৬, ০৯:৩৯
অ- অ+

দীর্ঘদিনের উত্তেজনা ও সংঘাতের পর যুদ্ধ বন্ধ এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বহুল আলোচিত সমঝোতা স্মারকে আনুষ্ঠানিকভাবে সই করেছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। দুই দেশের প্রতিনিধিরা সরাসরি উপস্থিত না হয়ে ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে ইলেকট্রনিক উপায়ে এই চুক্তি সম্পন্ন করেছেন।

সমঝোতা স্মারকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি ইরানের ওপর আরোপিত কিছু নির্দিষ্ট আর্থিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

চুক্তিতে ভবিষ্যৎ আলোচনার অংশ হিসেবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কাজ করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হয়েছে। উভয় পক্ষই এ বিষয়ে কূটনৈতিক সংলাপ অব্যাহত রাখার বিষয়ে সম্মতি জানিয়েছে বলে জানা গেছে।

‘যুক্তরাষ্ট্র ও ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের মধ্যকার ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’ শিরোনামের এই নথি জনসমক্ষে প্রকাশ না করায় শুরুতে সমালোচনার মুখে পড়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো। পরবর্তীতে সমালোচনার জবাবে যুক্তরাষ্ট্র চুক্তির বিষয়বস্তু প্রকাশ করে।

একজন মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, এই চুক্তির মাধ্যমে দ্রুত হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক নৌচলাচল পুনরায় শুরু করার পথ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে ইরানের পারমাণবিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও ধ্বংসের বিষয়ে প্রতিশ্রুতিও এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, চুক্তির শর্তগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে উভয় পক্ষের মধ্যে আস্থা বাড়বে। ইরান ইতিবাচক ভূমিকা পালন করলে যুক্তরাষ্ট্রও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং নিষেধাজ্ঞা আরও শিথিল করার বিষয়ে বিবেচনা করবে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই সমঝোতা বাস্তবায়িত হলে শুধু মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিই নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি পুনরায় স্বাভাবিকভাবে চালু হলে আন্তর্জাতিক তেল সরবরাহ ও বাণিজ্যে স্থিতিশীলতা ফিরতে পারে।

শুক্রবার আনুষ্ঠানিকভাবে এই সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার কথা রয়েছে। এরপর চূড়ান্ত চুক্তি নিয়ে আলোচনার জন্য ৬০ দিনের একটি সময়সীমা শুরু হবে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান সদিচ্ছার ভিত্তিতে যৌথভাবে নিচের বিষয়গুলোতে সম্মত হয়েছে-

১. যুক্তরাষ্ট্র, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান এবং চলমান যুদ্ধে তাদের মিত্ররা এই এমওইউতে স্বাক্ষর করছে অবিলম্বে ও স্থায়ীভাবে লেবাননসহ সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান বন্ধ ঘোষণা করতে। এখন থেকে তারা একে অপরের বিরুদ্ধে কোনো যুদ্ধ বা সামরিক অভিযান শুরু করবে না। তারা একে অপরের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ বা হুমকি দেওয়া থেকে বিরত থাকবে। পাশাপাশি তারা লেবাননের ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করবে। লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধের স্থায়ী সমাপ্তির বিষয়টি চূড়ান্ত চুক্তিতে নিশ্চিত করা হবে। এই অনুচ্ছেদের অন্যান্য বিধানও সেখানে নিশ্চিত করা হবে।

২. যুক্তরাষ্ট্র ও ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান একে অপরের সার্বভৌমত্ব ও ভোগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সম্মান জানাবে। তারা একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা থেকে বিরত থাকবে।

৩. যুক্তরাষ্ট্র ও ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান সর্বোচ্চ ৬০ দিনের মধ্যে আলোচনা করে চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর অঙ্গীকার করছে। উভয় পক্ষের সম্মতিতে এ সময়সীমা বাড়ানো যেতে পারে।

৪. এই এমওইউ সই হওয়ার পরপরই যুক্তরাষ্ট্র তার নৌ অবরোধ তুলে নিতে শুরু করবে এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের বিরুদ্ধে থাকা যেকোনো বাধা বা বিপত্তিও দূর করা শুরু করবে। ৩০ দিনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র নৌ অবরোধ পুরোপুরি তুলে নেবে। এ সময়ের মধ্যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল যুদ্ধ–পূর্ববর্তী অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়ার পরিবেশ তৈরি করবে ইরান। চূড়ান্ত চুক্তি হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ৩০ দিনের মধ্যে ইরানের নিকটবর্তী এলাকা থেকে নিজেদের সামরিক বাহিনী সরিয়ে নেবে।

৫. এই এমওইউ সই হওয়ার পর ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান বিনা মাশুলে বাণিজ্যিক জাহাজ নিরাপদে চলাচলের ব্যবস্থা করবে। পারস্য উপসাগর থেকে ওমান সাগর এবং বিপরীত দিক থেকে জাহাজ চলাচলের ব্যবস্থা করার জন্য তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে। তবে এটি শুধু ৬০ দিনের জন্য প্রযোজ্য হবে। বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল অবিলম্বে শুরু হবে এবং কারিগরি ও সামরিক বাধা অপসারণের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় ইরান ৩০ দিনের মধ্যে মাইন অপসারণ করবে। আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে এবং হরমুজ প্রণালির উপকূলীয় দেশগুলোর সার্বভৌম অধিকার অক্ষুণ্ন রেখে ভবিষ্যতে হরমুজ প্রণালি কীভাবে পরিচালনা করা হবে এবং সেখানে নৌ পরিষেবা কীভাবে দেওয়া হবে, তা নিয়ে ওমানের সঙ্গে আলোচনা করবে ইরান। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য উপসাগরীয় দেশের সঙ্গেও তারা কথা বলবে।

৬. যুক্তরাষ্ট্র আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে নিয়ে অন্তত ৩০ হাজার কোটি (৩০০ বিলিয়ন) মার্কিন ডলার ব্যয়ে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ও উভয় পক্ষের সম্মতিপূর্ণ পরিকল্পনা তৈরি করবে। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হবে ৬০ দিনের মধ্যে এবং সেটা করা হবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চূড়ান্ত চুক্তির অংশ হিসেবে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেনের জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের লাইসেন্স, ছাড় ও অনুমতি দেবে যুক্তরাষ্ট্র।

৭. চূড়ান্ত চুক্তির অংশ হিসেবে দুই পক্ষের মতৈক্যের সময়সূচি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের ওপর থেকে সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেবে। এর মধ্যে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাব ও আইএইএ বোর্ড অব গভর্নরসের প্রস্তাবও অন্তর্ভুক্ত থাকবে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের একতরফাভাবে দেওয়া সব প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের নিষেধাজ্ঞাও তুলে নেওয়া হবে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র এই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের চূড়ান্ত গুরুত্ব স্বীকার করে। এ বিষয়ে পারস্পরিক সমঝোতায় পৌঁছাতে তারা আলোচনার মাধ্যমে অবিলম্বে এসব সমস্যা সমাধানের ইচ্ছা প্রকাশ করেছে।

৮. ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান আবার নিশ্চিত করেছে যে তারা পারমাণবিক অস্ত্র সংগ্রহ বা তৈরি করবে না। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান পারস্পরিক সম্মত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মজুত করা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের নিষ্পত্তির বিষয়ে একমত হয়েছে। তা করা হবে ৭ নম্বর অনুচ্ছেদে উল্লিখিত সময়সূচির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উভয় পক্ষের সম্মতির ভিত্তিতে। আইএইএর তত্ত্বাবধানে ন্যূনতম পদ্ধতি ব্যবহার করে এগুলো নির্ধারিত স্থানেই নিষ্ক্রিয় (ডাউন ব্লেন্ড) করা হবে। চূড়ান্ত চুক্তিতে সম্মত হওয়া একটি সন্তোষজনক কাঠামোর ভিত্তিতে দুই পক্ষ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ইস্যু নিয়ে আলোচনা করতে রাজি হয়েছে। এ ছাড়া ইরানের পারমাণবিক চাহিদার সঙ্গে সম্পর্কিত অন্যান্য বিষয় নিয়েও তারা আলোচনা করবে। চূড়ান্ত চুক্তিতে এই অনুচ্ছেদের বিধানগুলো নিশ্চিত করা হবে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উল্লিখিত পারমাণবিক বিষয়গুলোর চূড়ান্ত গুরুত্ব স্বীকার করছে। পারস্পরিক সমঝোতায় পৌঁছাতে তারা আলোচনার মাধ্যমে অবিলম্বে এসব ইস্যু সমাধানের ইচ্ছা প্রকাশ করেছে।

৯. চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান বর্তমান পরিস্থিতি (স্ট্যাটাস কো) বজায় রাখতে সম্মত হয়েছে। ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচির বর্তমান অবস্থা ধরে রাখবে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র নতুন কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে না। এ ছাড়া তারা এই অঞ্চলে অতিরিক্ত সামরিক বাহিনীও মোতায়েন করবে না।

১০. যুক্তরাষ্ট্র প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে যে এই এমওইউ সই হওয়ার পরপরই মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় ইরানের অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্য রপ্তানিতে ছাড় দেবে। এই ছাড়পত্র নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। এর আওতায় ব্যাংকিং লেনদেন, বিমা, পরিবহনসহ আনুষঙ্গিক সব সেবাও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

১১. এই এমওইউ বাস্তবায়ন সাপেক্ষে যুক্তরাষ্ট্র ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের জব্দ থাকা বা নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা তহবিল ও সম্পদ ব্যবহারের জন্য পুরোপুরি উন্মুক্ত করে দেবে। চূড়ান্ত চুক্তি নিয়ে সমঝোতা আলোচনার সময় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান পারস্পরিকভাবে এই তহবিল ছাড়ের প্রক্রিয়া নিয়ে মতৈক্যে পৌঁছাবে। এই তহবিলগুলো মূল অ্যাকাউন্টে ফিরিয়ে দেওয়া বা অন্য অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর যেটাই করা হোক না কেন, সেগুলো ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে কোনো সুবিধাভোগীকে দিতে পারবে সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে। সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সব লাইসেন্স ও অনুমোদন দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

১২. এই এমওইউর সফল বাস্তবায়ন এবং চূড়ান্ত চুক্তির ভবিষ্যৎ শর্তাবলী মানার বিষয়টি তদারকির জন্য একটি নির্বাহী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে সম্মত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান।

১৩. এই এমওইউ সই হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান এই সমঝোতা স্মারকের ১, ৪, ৫, ১০ ও ১১ নম্বর অনুচ্ছেদের বাস্তবায়ন শুরু করা এবং তা অব্যাহত রাখতে বাধ্য থাকবে। সেই সঙ্গে দুই পক্ষ চূড়ান্ত চুক্তির আলোচনা শুরু করবে, যা এই এমওইউর অন্য অনুচ্ছেদগুলোর ওপর ভিত্তি করেই হবে।

১৪. চূড়ান্ত চুক্তিটি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের (ইউএনএসসি) একটি বাধ্যতামূলক প্রস্তাবের মাধ্যমে অনুমোদন করা হবে।

(ঢাকাটাইমস/১৮ জুন/আরজেড)

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
টাঙ্গাইলে নীলসাগর এক্সপ্রেস লাইনচ্যুত, ঢাকা-উত্তরবঙ্গ রেল যোগাযোগ বন্ধ
মানবতাবিরোধী অপরাধে মাহবুব-উল আলম হানিফের মৃত্যুদণ্ড, তিন নেতার আমৃত্যু কারাদণ্ড
পেশাদারিত্ব, নিরপেক্ষতা ও মানবিক আচরণে ‘জনগণের পুলিশ’ গড়তে হবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দামে পতন