শেখ হাসিনার আমলে মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে সরব ছিলেন শান্তিতে নোবেলজয়ী নাভি পিল্লাই

অনলাইন ডেস্ক, ঢাকা টাইমস
  প্রকাশিত : ১০ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৪৬| আপডেট : ১০ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৪৭
অ- অ+

শেখ হাসিনার সরকারের আমলে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি ও বিচারপ্রক্রিয়ার ন্যায্যতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন জাতিসংঘের সাবেক মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার নাভানেথেম নাভি পিল্লাই। বিশেষ করে, ২০০৯ সালের পিলখানা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দায়ের করা মামলায় বিপুলসংখ্যক আসামির বিচার, হেফাজতে নির্যাতনের অভিযোগ এবং মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে ২০১৩ সালে উদ্বেগ জানিয়েছিলেন তিনি। একই সময়ে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারপ্রক্রিয়ায়ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড অনুসরণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার এই আইনজীবী ও বিচারক।

শুক্রবার (৯ অক্টোবর) নাভি পিল্লাইয়ের শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার খবর সামনে আসার পর বাংলাদেশের তৎকালীন সরকারের আমলে মানবাধিকার নিয়ে তাঁর অবস্থান নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ২০০৮ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার, নির্যাতন প্রতিরোধ এবং মানবাধিকার সুরক্ষায় দীর্ঘদিন ধরে কাজ করেছেন এই মানবাধিকারকর্মী।

পিলখানা হত্যাকাণ্ডের বিচার নিয়ে উদ্বেগ

নাভি পিল্লাইয়ের আলোচিত বক্তব্যগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল ২০০৯ সালের পিলখানা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দায়ের করা মামলার বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে তাঁর উদ্বেগ। ২০১৩ সালের ৫ নভেম্বর ঢাকার একটি বিশেষ আদালত এ মামলায় ১৫২ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেন। এর পরদিন, ৬ নভেম্বর, বিচারপ্রক্রিয়া ও অভিযুক্তদের সঙ্গে আচরণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।

২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন বাংলাদেশ রাইফেলসের (বিডিআর) সদর দপ্তর পিলখানায় বিদ্রোহ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ৭৪ জন নিহত হন। তাঁদের মধ্যে ৫৭ জন ছিলেন সেনা কর্মকর্তা। এই হত্যাকাণ্ডের বিচার ও অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে বিচারপ্রক্রিয়ায় অভিযুক্তদের মৌলিক অধিকার রক্ষার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখার আহ্বান জানিয়েছিলেন নাভি পিল্লাই।

তাঁর উদ্বেগের বিষয়গুলোর মধ্যে ছিল বিপুলসংখ্যক আসামিকে একসঙ্গে বিচারের মুখোমুখি করা, পর্যাপ্ত আইনি সহায়তা পাওয়ার সুযোগ এবং অভিযুক্তদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ। হেফাজতে কয়েকজনের মৃত্যুর খবর এবং নির্যাতনের মাধ্যমে আদায় করা প্রমাণ আদালতে ব্যবহারের অভিযোগও আলোচনায় এসেছিল।

এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, তদন্তের ফলাফল প্রকাশ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি। তাঁর বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল, গুরুতর অপরাধের বিচার অবশ্যই হতে হবে; তবে সেই বিচার হতে হবে ন্যায়সংগত এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার নিয়েও প্রশ্ন

শেখ হাসিনার সরকারের আমলে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে বিচার না হওয়া এসব অপরাধের বিচার বাংলাদেশের রাজনীতি ও ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরিণত হয়।

তবে বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আন্তর্জাতিক মহল থেকেও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছিল। অভিযুক্তদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, প্রতিরক্ষা পক্ষের সাক্ষীদের নিরাপত্তা এবং মৃত্যুদণ্ডের মতো শাস্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে ন্যায্য বিচার নিশ্চিত করার বিষয়গুলো আলোচনায় আসে।

জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক বিশেষজ্ঞদের বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ ও যোগাযোগেও বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল। ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত জাতিসংঘের একটি যোগাযোগে আবদুল কালাম আজাদের অনুপস্থিতিতে বিচার, রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবীর পর্যাপ্ততা এবং বিচারপ্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক চাপের অভিযোগ উল্লেখ করা হয়। তবে এসব বিষয় ছিল প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে উত্থাপিত অভিযোগ ও উদ্বেগ, আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়।

পিলখানা হত্যাকাণ্ডের বিচার এবং একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার ছিল দুটি পৃথক ঘটনা ও স্বতন্ত্র বিচারপ্রক্রিয়া। নাভি পিল্লাইয়ের উদ্বেগের কেন্দ্রেও ছিল নির্দিষ্ট মামলাগুলোর ন্যায্যতা এবং সংশ্লিষ্ট মানবাধিকার পরিস্থিতি। তাঁর অবস্থান ছিল, গুরুতর অপরাধের বিচার করার সময়ও আন্তর্জাতিক আইনের বাধ্যবাধকতা অনুসরণ করা জরুরি।

মানবাধিকার রক্ষায় দীর্ঘ কর্মজীবন

নাভি পিল্লাই দক্ষিণ আফ্রিকার একজন আইনজীবী ও বিচারক। বর্ণবাদবিরোধী সংগ্রামের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে তাঁর কর্মজীবন গড়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৮ সালে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ২০১৪ সাল পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে কাজ করেন তিনি।

গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ, নির্যাতন এবং যৌন সহিংসতার বিচার তাঁর কর্মজীবনের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে। আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থায় ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি অভিযুক্তদের ন্যায্য বিচার পাওয়ার অধিকার রক্ষাও তাঁর কাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল।

শেখ হাসিনার সরকারের আমলে বাংলাদেশের বিচারপ্রক্রিয়া ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে নাভি পিল্লাইয়ের উত্থাপিত উদ্বেগগুলো সে সময় আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। তাঁর বক্তব্যে গুরুতর অপরাধের বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও অভিযুক্তদের মৌলিক অধিকার রক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছিল।

(ঢাকাটাইমস/১০ অক্টোবর/আরজেড)

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
সিজেপির বিক্ষোভে উত্তাল দিল্লি: জন্তর মন্তরে সাত স্তরের ব্যারিকেড, বন্ধ মেট্রো-রেল-ইন্টারনেট সেবা
ঢাকাসহ দেশের ৮ বিভাগে বৃষ্টি ও বজ্রবৃষ্টির পূর্বাভাস
৭.৭ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পে কেঁপে উঠল পানামা, বিমান চলাচল বন্ধ
রূপনগর থানা ছাত্রলীগের সভাপতি মিঠু আটক