প্রধানমন্ত্রীর কাছে খোলা চিঠি
পরিবেশগত শর্ত মেনে সুন্দরবনের পাশে রিসোর্ট চালাতে চান উদ্যোক্তারা

সুন্দরবনের প্রকৃতি রক্ষা করে পর্যটন ব্যবসার মাধ্যমে নিজেদের জীবিকা টিকিয়ে রাখতে চান উপকূলের তরুণ উদ্যোক্তারা। তাদের গড়ে তোলা রিসোর্ট ঘিরে কাজ করছেন স্থানীয় অনেক মানুষ। কিন্তু অনুমোদন প্রক্রিয়ার জটিলতার কারণে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন তারা। এ অবস্থায় সুন্দরবনের পাশে গড়ে ওঠা রিসোর্টগুলো পরিদর্শন করে স্থানীয় মানুষের কথা শোনার জন্য প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা।
সম্প্রতি সুন্দরবনের সীমানাঘেঁষা এলাকায় গড়ে ওঠা ১৮টি রিসোর্ট বন্ধে সময় বেঁধে দিয়ে চূড়ান্ত নোটিশ দিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর। এমন প্রেক্ষাপটে ওই এলাকায় পরিবেশবান্ধব পর্যটনের সম্ভাবনা ও তাদের সমস্যার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রীকে খোলা চিঠি দিয়েছেন রিসোর্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব সুন্দরবনের (আরওএএস) সেক্রেটারি এবং জংগলবাড়ি ম্যানগ্রোভ রিসোর্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাকারিয়া হোসাইন শাওন।
চিঠিতে বলা হয়েছে, সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ করে এলাকাটিকে পরিবেশবান্ধব পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন নিয়ে বিনিয়োগ করেছেন স্থানীয় তরুণ উদ্যোক্তারা। কেউ নিজের সঞ্চয়, কেউ ব্যাংকঋণ, আবার কেউ পরিবারের সহায়তায় গড়ে তুলেছেন রিসোর্ট ও পর্যটনসেবা। তাদের এই উদ্যোগ শুধু ব্যবসার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান ও বহু পরিবারের জীবিকা।
উদ্যোক্তাদের হিসাব অনুযায়ী, সুন্দরবনসংলগ্ন প্রায় ১৭ কিলোমিটার এলাকায় বেশকিছু রিসোর্ট গড়ে উঠেছে। এসব রিসোর্টে কাজ করছেন ১৫৩ জন, যাদের মধ্যে ১৩৫ জনই স্থানীয় বাসিন্দা। পর্যটনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে আরও ৫৮টি ক্ষুদ্র উদ্যোগ ও ব্যবসা। এর মধ্যে রয়েছে স্থানীয় দোকান, নৌযানসেবা, পরিবহন, খাদ্য সরবরাহ এবং হাঁস-মুরগির খামার।
চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, খুলনার দাকোপ উপজেলার বানীশান্তা ও কৈলাশগঞ্জ ইউনিয়নের তিনটি ওয়ার্ডের প্রায় ৭ হাজার ৩০০ মানুষের মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পর্যটন অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত। পর্যটকেরা এলে স্থানীয় মানুষের আয় হয়, ছোট ব্যবসাগুলো সচল থাকে। অনেক পরিবারের সন্তানদের পড়াশোনার খরচ ও দৈনন্দিন ব্যয় মেটানোর সুযোগ তৈরি হয়।
উদ্যোক্তাদের মতে, পর্যটনের বিকাশ সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল মানুষের জন্য বিকল্প জীবিকার পথ খুলে দিতে পারে। তবে এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে গিয়ে তারা বিভিন্ন প্রশাসনিক জটিলতার মুখোমুখি হচ্ছেন। পরিবেশ সংরক্ষণ, পর্যটন ব্যবস্থাপনা ও প্রয়োজনীয় অনুমোদনের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব এবং সুস্পষ্ট নির্দেশনার সীমাবদ্ধতা তাদের বিনিয়োগ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।
চিঠিতে উদ্যোক্তারা স্পষ্ট করে বলেছেন, সুন্দরবনের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার বিষয়ে তাদের কোনো আপস নেই। তারা আইন মেনে এবং পরিবেশগত শর্ত পূরণ করে ব্যবসা পরিচালনা করতে চান। এ জন্য বিশেষ কোনো সুবিধা নয়, বরং সুস্পষ্ট নীতিমালা, স্বচ্ছ অনুমোদন প্রক্রিয়া, নির্দিষ্ট সময়সীমা এবং সরকারি দপ্তরগুলোর কার্যকর সমন্বয় চান তারা।
প্রধানমন্ত্রীকে সুন্দরবনসংলগ্ন রিসোর্টগুলো সরেজমিনে পরিদর্শনের আমন্ত্রণ জানিয়ে জাকারিয়া হোসাইন শাওন চিঠিতে বলেন, এই সফরে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান, ক্ষুদ্র ব্যবসার বিকাশ এবং পর্যটনকে ঘিরে গড়ে ওঠা জীবিকার বাস্তব চিত্র দেখা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে উদ্যোক্তারা অনুমোদন প্রক্রিয়া ও প্রশাসনিক সমন্বয়ের ক্ষেত্রে কী ধরনের সমস্যায় পড়ছেন, তা-ও সরাসরি জানা যাবে।
চিঠিতে সুন্দরবনসংলগ্ন পরিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন এলাকায় টেকসই ইকো-ট্যুরিজমের জন্য সুস্পষ্ট নির্দেশিকা প্রণয়ন, ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালু, সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলোর সমন্বিত কার্যক্রম নিশ্চিত এবং বিদ্যমান বিনিয়োগগুলো আইনসম্মত ও স্বচ্ছভাবে পর্যালোচনার জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
উদ্যোক্তারা চান না, প্রশাসনিক জটিলতায় তাদের গড়ে তোলা উদ্যোগগুলো থেমে যাক। আবার পর্যটনের নামে সুন্দরবনের পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হোক, সেটিও তারা চান না। তাদের প্রত্যাশা, প্রকৃতি সংরক্ষণ ও মানুষের জীবিকার মধ্যে সমন্বয় ঘটিয়ে এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে উঠবে, যেখানে সুন্দরবন সুরক্ষিত থাকবে, স্থানীয় মানুষ কাজের সুযোগ পাবেন এবং উদ্যোক্তারা নিয়ম মেনে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারবেন।
চিঠিতে সুন্দরবনকে শুধু প্রাকৃতিক সম্পদ হিসেবে নয়, উপকূলের মানুষের জীবন, জীবিকা ও ভবিষ্যতের অংশ হিসেবে বিবেচনা করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
এর আগে গত ৪ অক্টোবর সুন্দরবনের পাশে গড়ে ওঠা ১৮টি রিসোর্ট বন্ধে চূড়ান্ত নোটিশ দেয় খুলনা জেলা পরিবেশ অধিদপ্তর। নোটিশ পাওয়া রিসোর্টগুলো হলো— সুন্দরী, ইরাবতী, অরণ্য, ছায়া, অরণ্যবাস, কেওড়া বন, মায়াবন, গহন, দ্য ফরেস্ট রিট্রিট, নিকুঞ্জ ভ্যালি, লা সিলভা কটেজ, বনবিবি, বনমালী, গোলকানন, পিয়ালী, ম্যানগ্রোভ, জঙ্গলবাড়ী, বনবাস ও বনলতা ইকো কটেজ।
খুলনা পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. হারুন-অর-রশীদ জানান, ১০টি প্রতিষ্ঠানকে ৩০ দিন এবং আটটিকে ১৫ দিনের মধ্যে সব স্থাপনা সরিয়ে নিতে বলা হয়েছে।
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













