সিজেপির বিক্ষোভে উত্তাল দিল্লি: জন্তর মন্তরে সাত স্তরের ব্যারিকেড, বন্ধ মেট্রো-রেল-ইন্টারনেট সেবা

ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে দিল্লির কেন্দ্রস্থলে বড় ধরনের বিক্ষোভের প্রস্তুতি নিচ্ছে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। বিক্ষোভ ঘিরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। জন্তর মন্তরে যাওয়ার পথে বসানো হয়েছে অন্তত সাত স্তরের ব্যারিকেড। বন্ধ রাখা হচ্ছে দিল্লি মেট্রোর ৪৫টি স্টেশনের প্রবেশ ও বের হওয়ার গেট। বাতিল করা হয়েছে ২৫০টির বেশি ট্রেনের চলাচল। পাশাপাশি নির্দিষ্ট এলাকায় ইন্টারনেট সেবাও বন্ধ রাখা হয়েছে। খবর এনডিটিভি’র।
প্রতিবেদনে বলা হয়, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ও কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর ২০ হাজারের বেশি সদস্য মোতায়েনের পরিকল্পনা করেছে কর্তৃপক্ষ। তবে বিক্ষোভের অনুমতি দেয়নি পুলিশ। নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করেও সমর্থকদের নিয়ে জন্তর মন্তরে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে সিজেপি।
গত ২০ জুলাই প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে বিক্ষোভ চলাকালে বিশৃঙ্খলা ও পুলিশের পদক্ষেপের ঘটনাকে সামনে রেখে এবার বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করছে কর্তৃপক্ষ। ওই ঘটনার জেরে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিক্ষোভ ঘিরে দিল্লির গণপরিবহন ব্যবস্থায় ব্যাপক বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। রাজীব চক, নয়াদিল্লি, সেন্ট্রাল সেক্রেটারিয়েট, প্যাটেল চক ও কাশ্মীরি গেটসহ দিল্লি মেট্রোর ৪৫টি স্টেশনের প্রবেশ ও বের হওয়ার গেট বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া শনিবার সকাল ৪টা থেকে দুপুর ২টার মধ্যে নয়াদিল্লি ও হজরত নিজামুদ্দিন স্টেশনে পৌঁছানোর কথা ছিল—এমন অন্যান্য রাজ্য থেকে আসা ২৫০টির বেশি ট্রেন এবং স্থানীয় ট্রেনের চলাচল বাতিল করা হয়েছে।
শুক্রবার রাত ১০টা থেকে জনপথ-কর্তব্য পথ মোড়ের চার কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে ২৪ ঘণ্টার জন্য ইন্টারনেট সেবাও বন্ধ রাখা হয়েছে।
সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে জানিয়েছেন, বিধিনিষেধ সত্ত্বেও স্বেচ্ছাসেবক ও সমর্থকেরা পরিকল্পনা অনুযায়ী জন্তর মন্তরে বিক্ষোভ করবেন।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, বিক্ষোভের কারণে মানুষের অসুবিধার কথা বলে কর্তৃপক্ষ একদিকে জমায়েতের অনুমতি দিচ্ছে না, অন্যদিকে মেট্রো, রেল ও সড়ক চলাচলেও বাধা দিচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আরও বাড়বে কি না, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।
দিল্লি পুলিশের নিরাপত্তা পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং বিক্ষোভ মোকাবিলায় পুলিশের পদক্ষেপ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক এড়ানো। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিক্ষোভকারীদের নয়াদিল্লি জেলায় প্রবেশ ঠেকানো এবং নিষিদ্ধ এলাকা থেকে দ্রুত সরিয়ে দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে।
পুলিশ জন্তর মন্তর, জনপথ, নির্বাচন কমিশনের কার্যালয় ও দিল্লি পুলিশ সদর দপ্তরসহ প্রায় দেড় কিলোমিটার ব্যাসার্ধের এলাকাকে অত্যন্ত সংবেদনশীল হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এ এলাকায় ৬ হাজার ৫০০-এর বেশি পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হবে বলে জানিয়েছেন এক কর্মকর্তা।
নিরাপত্তা জোরদারের অংশ হিসেবে জন্তর মন্তরে যাওয়ার সড়কে অন্তত সাত স্তরের ব্যারিকেড বসানো হয়েছে। শেষ দিকের কয়েকটি ব্যারিকেড ঝালাই করে জোড়া লাগানো হয়েছে, যাতে সেগুলো ভেঙে অতিক্রম করা কঠিন হয়।
নয়াদিল্লি জেলার বিভিন্ন সংবেদনশীল স্থানে অডিও রেকর্ডিংয়ের সুবিধাসহ ৩০০টির বেশি সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে লাউডস্পিকার বসিয়ে বিক্ষোভের অনুমতি না থাকার বিষয়টি প্রচার করা হচ্ছে। লোকজনকে জমায়েত না হওয়া, স্লোগান না দেওয়া, সরকারি সম্পত্তির ক্ষতি না করা এবং পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলা না চালানোর আহ্বান জানানো হচ্ছে।
কমিউনিটি সেন্টার, মসজিদ ও আবাসিক কল্যাণ সমিতিগুলোকেও বিক্ষোভের অনুমতি না থাকার বিষয়টি জানাতে বলা হয়েছে। বিক্ষোভে অংশ নিতে নয়াদিল্লিতে আসা ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার ও আইনি পদক্ষেপের বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে।
বিক্ষোভে অংশ নিতে আসা ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে নয়াদিল্লি ও মধ্য দিল্লির বিভিন্ন হোটেল ও লজে তল্লাশি চালাচ্ছে পুলিশ। হোটেল ব্যবস্থাপকদের অতিথিদের বিক্ষোভে অংশ নিতে নিরুৎসাহিত করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া এয়ারবিএনবির মাধ্যমে বাসা ভাড়া দেন এমন ব্যক্তি এবং সম্পত্তির মালিকদেরও বিক্ষোভে যোগ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে—এমন ব্যক্তিদের কাছে সম্পত্তি ভাড়া না দিতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সাম্প্রতিক বিক্ষোভগুলোতে পুলিশের অসদাচরণ ও অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ ওঠায় এবার প্রতিটি ঘটনা নথিবদ্ধ করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে দিল্লি পুলিশ।
মাসের শুরুর দিকে হওয়া বিক্ষোভের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে পুলিশ সদস্যদের কথিত অসদাচরণের দৃশ্য দেখা যায়। এর মধ্যে এক নারী বিক্ষোভকারীকে মারধর ও শ্লীলতাহানির অভিযোগও রয়েছে। এসব অভিযোগ পুলিশের আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
এবার ঘটনাগুলো বিভিন্ন দিক থেকে ধারণ করতে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার ও তাঁর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ দায়িত্বে থাকা সদস্যদের বডি ক্যামেরা দেওয়া হয়েছে। বিক্ষোভ ও পুলিশের প্রতিক্রিয়া ধারণ করতে শত শত আলোকচিত্রী ও ভিডিওগ্রাফার নিয়োগ করা হয়েছে।
কর্মকর্তাদের আশা, এসব ভিডিও ফুটেজের মাধ্যমে ঘটনার ধারাবাহিকতা প্রতিষ্ঠা করা, বিভ্রান্তিকর দাবি যাচাই করা এবং কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলে তদন্তে সহায়তা নেওয়া সম্ভব হবে।
এদিকে, দিল্লি পুলিশ একটি খোলা চিঠি প্রকাশ করেছে। এতে পুলিশ সদস্যদেরও মানুষ হিসেবে বিবেচনা করে সব পক্ষকে মানবিকতা ও সংযম বজায় রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, ইউনিফর্ম পরার কারণে একজন মানুষের মানবিকতা হারিয়ে যায় না।
(ঢাকাটাইমস/১০ অক্টোবর/আরজেড)
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন











