বাংলা সাহিত্যে ঈদ-উৎসব

আবদুল মান্নান সৈয়দ
 | প্রকাশিত : ২৬ জুন ২০১৭, ০৯:১৬

পটভূমি

 

আজ থেকে একশ বছর আগে বাংলা সাহিত্যের প্রথম প্রকৃত ইতিহাসকার দীনেশ চন্দ্র সেন (১৮৬৬-১৯৩৯) তাঁর সুবিখ্যাত বঙ্গভাষা ও সাহিত্য গ্রন্থে লিখেছিলেন:

...ব্রাহ্মণগণ প্রথমত ভাষা-গ্রন্থ প্রচারের বিরোধী ছিলেন। কৃত্তিবাস ও কাশীদাসকে ইহারা ‘সর্বনেশে’ উপাধি প্রদান করিয়াছিলেন এবং অষ্টাদশ পুরাণ অনুবাদকগণের জন্য ইহারা রৌরব নামক নরকে স্থান নির্ধারিত করিয়াছিলেন।/...আমাদের বিশ্বাস, মুসলমান কর্তৃক বঙ্গবিজয়ই বঙ্গভাষার এই সৌভাগ্যের কারণ হইয়া দাঁড়াইয়াছিল।/মুসলমানগণ ইরান, তুরান প্রভৃতি যে স্থান হইতে আসুন না কেন, এদেশে আশিয়া সম্পূর্ণরূপে বাঙালি হইয়া পড়িলেন। তাঁহারা হিন্দু প্রজাম-লী পরিবৃত হইয়া বাস করিতে লাগিলেন। মসজিদের পার্শ্বে দেবমন্দিরের ঘণ্টা বাজিতে লাগিল, মহররম, ঈদ, শবেবরাত প্রভৃতির পার্শ্বে দুর্গোৎসব, রাস, দোলোৎসব প্রভৃতি চলিতে লাগিল। রামায়ণ ও মহাভারতের অপূর্ব প্রভাব মুসলমান সম্রাটগণ লক্ষ্য করিলেন। এদিকে দীর্ঘকাল এদেশে-বাস-নিবন্ধন বাঙ্গালা তাঁহাদের একরূপ মাতৃভাষা হইয়া পড়িল।

যেখান থেকে আসুন না কেন, অথবা এদেশেই উদ্ভূত হোন না কেন, মধ্যযুগেই মুসলমানরা বাঙালি হয়ে উঠেছিলো এবং তাদের মাতৃভাষা হয়ে উঠেছিলো বাংলা। বাঙালি হিন্দু-মুসলমান যৌথভাবে পাশাপাশি বাস করছিলেন। সাহিত্য চর্চায়ও লিপ্ত ছিলেন। কিন্তু শাহ মুহম্মদ সগীর থেকে খোন্দকার শামসুদ্দিন মুহম্মদ সিদ্দিকী বা মীর মশাররফ হোসেনের আবির্ভাবের আগে পর্যন্ত মধ্যযুগের মুসলিম রচিত যে-সাহিত্য, তাতে রোমান্স, কল্পকথা, ইসলামী পুরাণ, লোকপুরাণ, ইসলামের ইতিহাস, আরবি-ফারসি-হিন্দি কাব্যগ্রন্থের তর্জমা বা ভাবানুসরণই মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়। লোকাচার, জীবনাচার, ধর্মাচার অর্থাৎ বাঙালি-মুসলমানদের প্রাত্যহ-আচরিত জীবন তারও খুব একটা প্রশ্রয় পায়নি। তার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হয়েছে আধুনিককাল পর্যন্ত- যখন কেবল আর স্বভাব-কবিতা লেখা হচ্ছে নাÑচিন্তার চর্চাও শুরু হয়েছেÑ সংস্কারমুক্তিও। একটা ওলট-পালট চলছিলো তখন। মীর মশাররফ হোসেন (১৮৪৭-১৯১১) গোরু জবাই-এর বিরুদ্ধে লিখে সমাজের বিরাগভাজন হয়েছিলেন, মীরের যিনি বিরুদ্ধাচরণ করেছিলেন সেই মৌলভি মোহাম্মদ নইমুদ্দীনকেও (১৮৪৭-১৯৩২) আরবি কুরআন শরীফ বাংলায় তর্জমা করার জন্য জবাবদিহি করতে হয়েছিলো। এরই মধ্যে সাহিত্যে বাঙালি-মুসলমানের ধর্ম স্থান করে নিয়েছিলো নানা স্রোতেÑপ্রতিস্রোতে দুলতে-দুলতে। জীবন থেমে থাকে না, সাহিত্যও থেমে থাকে না। সেই অগ্রসরমানতা আমাদের সাহিত্যও দেখিয়েছিলো। আজ বরং মনে হয়, পরম শ্রদ্ধেয় মুহম্মদ আবদুল হাই (১৯১৯-৬৯) তাঁর বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত (১৯৫৬, সৈয়দ আলী আহসানের সঙ্গে যৌথভাবে রচিত)। গ্রন্থে ‘ইসলামী সাহিত্য’ নামে যে স্বতন্ত্র অধ্যায় যোজনা করেছেন, তা কি যথার্থ? এরকম বিভাজন কি সম্ভব? যখন দেখতে পাই আধুনিক বাংলা সাহিত্যের মুসলমান লেখকদের মধ্যে মীর মশাররফ হোসেন, কায়কোবাদ, মোজাম্মেল হক, বেগম রোকেয়া, শাহাদাৎ হোসেন, গোলাম মোস্তফা, মওলানা মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী, সৈয়দ ইসমাইল হোসেন শিরাজী, কাজী আবদুল ওদুদ, মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ, কাজী নজরুল ইসলাম প্রমুখের সাহিত্যকর্মের এক বিশাল অংশ ইসলাম-সম্পৃক্ত। মূল ধারা থেকে এঁদের বিচ্ছিন্ন করা যাবে কি? এই প্রশ্ন তুলে আমি কেন্দ্রীয় বিষয়ের দিকে এগিয়ে যেতে চাই।

ঈদের কবিতার সূচনা
সৈয়দ এমদাদ আলীর (১৮৮০-১৯৫৬) কবিতাগ্রন্থ ডালির দ্বিতীয় সংস্করণে (১৯৬৬) ‘ঈদ’ নামে দুটি কবিতা আছে: প্রথমটির প্রথম ছত্র ‘কুহেলি তিমির সরায়ে দূরে’ এবং দ্বিতীয়টির প্রথম ছত্র ‘বিশ্ব জুড়ে মুসলিমের গৃহে গৃহে আজি’। ‘কুহেলি তিমির সরায়ে দূরে’ পঙক্তি সংবলিত ‘ঈদ’ কবিতাটির নিচে কবির টীকা আমাদের জন্য খুব মূল্যবান: ১৯০৩ সালের ডিসেম্বর মাসে প্রথম বর্ষ নবনূরের ঈদÑসংখ্যায় প্রকাশিত। ইহাই মুসলিম বাংলার প্রথম ঈদ কবিতা।’ প্রথম এই ঈদের কবিতার প্রথম দুটি স্তবক উদ্ধৃত করছি:
কুহেলি তিমির সরায়ে দূরে
তরুণ অরুণ উঠিছে ধীরে
রাঙিয়া প্রতি তরুর শিরে
আজ কি হর্ষ ভরে।
আজি প্রভাতের মৃদুল বায়
রঙে নাচিয়া যেন কয়ে যায়
‘মুসলিম জাহান আজি একতায়
দেখ কত বল ধরে?’

১৯০৩ সালে প্রথম প্রকাশিত সৈয়দ এমদাদ আলী-সম্পাদিত ‘নবনূর’ পত্রিকাই খুব সম্ভবত প্রথমবার ঈদ-সংখ্যা প্রকাশ করে। ১৯০৩, ১৯০৪, ১৯০৫- পর পর এই তিন বছরই ‘নবনূর’ ঈদ-সংখ্যা প্রকাশ করে, ‘এই অর্থে অন্তত যে প্রত্যেক বছরই এই পত্রিকায় ঈদ সংক্রান্ত লেখা প্রকাশিত হয়েছে। ‘নবনূর’ পত্রিকার প্রধান সাহিত্যিক আবিষ্কার ও ফসল সৈয়দ এমদাদ আলী নিজে এবং কায়কোবাদ (১৮৫৭-১৯৫১) ও মিসেস আর, এস হোসেন অর্থাৎ বেগম রোকেয়া (১৮৮০-১৯৩২)। এই তিনজন লেখকই ‘নবনূরে’ ঈদ-সংক্রান্ত কবিতা বা গদ্য লিখেছেন। ‘নবনূর’- এর পৌষ ১৩১১ সংখ্যায় কায়কোবাদ লেখেন ‘ঈদ’ শীর্ষক কবিতা। বিখ্যাত ঐতিহাসিক রামপ্রাণ গুপ্ত (১৮৬৯-১৯২৭) ‘নবনূর’-এর ফাল্গুন ১৩১১ সংখ্যায় লিখেছিলেন ‘ঈদজ্জোহা’ নামক প্রবন্ধ। ‘নবনূর’Ñএর পৌষ ১৩১২ সংখ্যায় একই সঙ্গে ঈদ-সম্পর্কিত তিনটি লেখা প্রকাশিত হয়। সৈয়দ এমদাদ আলীর ‘ঈদ’ কবিতা, জীবেন্দু কুমার দত্তের ‘ঈদ সম্মিলন’ কবিতা এবং মিসেস আর এস হোসেন অর্থাৎ বেগম রোকেয়ার ‘ঈদ সম্মিলন’ গদ্যপ্রবন্ধ। বেগম রোকেয়া ঈদের তাৎপর্য বিশ্লেষণ করার সঙ্গে তাঁর স্বভাবসিদ্ধ কথোপকথনের ভঙ্গিতে একটুখানি নতুন কথা বলছেন:
আর এক কথা। এমন শুভদিনে আমরা আমাদের হিন্দু ভ্রাতৃবৃন্দকে ভুলিয়া থাকি কেন? ঈদের দিন হিন্দু ভাতৃগণ আমাদের সহিত সম্মিলিত হইবেন, এরূপ আশা কি দুরাশা? সমুদয় বঙ্গবাসী একই বঙ্গের সন্তান নহেন কী? অন্ধকার অমানিশার অবসানে যেমন তরুণ অরুণ আইসে, তদ্রুপ আমাদের এখানে অভিশাপের পর এমন আশীর্বাদ আসুক, ভ্রাতৃবিরোধের স্থানে এখন পবিত্র একথা বিদ্যমান থাকুক। আমিন!
‘ঈদ আবাহন’ এই একই নামে কায়কোবাদ দুটি কবিতা লিখেছিলেন: একটি তাঁর অশ্রুমালা (১৩১১) গ্রন্থর্ভূত, অন্যটি তাঁর অমিয়ধারা (১৩২৯) গ্রন্থর্ভূত। দুটি কবিতাতেই ঈদ উপলক্ষে কায়কোবাদ কামনা করেছেন মুসলমানের জাগৃতি:

১.    আজি এ ঈদের দিনে হয়ে সব এক মনঃপ্রাণ,
জাগায়ে মোশ্লেম সবে গাহ আজি মিলনের গান।
ডুবিবে না তবে আর ঈদের এ জ্যোতিস্মান রবি,
জীবন সার্থক হবে, ধন্য হইবে এ দরিদ্র কবি। [ঈদ আবাহন, অশ্রুমালা]

২.    আজি এ ঈদের দিনে
এ পবিত্র শুভক্ষণে
এস ভাই এক সনে হৃদয় বাঁধিয়া।
রক্ষিতে ইসলাম ধর্ম
সাধিতে আপন কর্ম

এস ভাই কর্মক্ষেত্রে- এস হে ছুটিয়া। [ঈদ-আবাহন, অমিয়ধারা]
‘ঈদ’ নামে ছোটোদের কবিতাও লিখেছেন কায়কোবাদ (মন্দাকিনিধারা)। মীর মশাররফ হোসেন কোরবানির সময় গোরু জবাই-এর বিরুদ্ধে লিখে ব্যাপক প্রতিবাদের সম্মুখীন হয়েছিলেন। মৌলভি মোহাম্মদ নইমুদ্দীন প্রমুখ তাঁর বিরুদ্ধাচরণ করেছিলেন। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলেছিলো এই শতাব্দীর বিশের দশকে। ‘ইসলাম দর্শন’ পত্রিকায় ‘গো-কোরবানি প্রসঙ্গ’ রচনায় বলা হয়েছিলো:

কতিপয় শরিয়ত অনভিক্ষ অদূরদর্শী গো-কোরবানির বিরুদ্ধে ফতওয়া ও মন্তব্য প্রকাশ করিয়া এবং সেন্ট্রাল খেলাফত কমিটি গো-কোরবানির বিরুদ্ধে বিজ্ঞাপন জারি করিয়া পবিত্র ইসলাম ধর্মে হস্তক্ষেপ ও মুসলমানদের জাতিগত অধিকার রহিত করিবার জন্য যে অন্যায় আয়োজন করিয়াছিলেন, সুখের বিষয় ভারতের প্রত্যেক মুসলমান ধর্মক্ষেত্র হইতেই তাহার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদধ্বনি সম্মুত্থিত হইয়াছে।
[‘ইসলাম দর্শন’, শ্রাবণ ১৩২৮]

মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান এসলামাবাদী (১৮৭৫-১৯৫০) ‘ঈদুল আজহা’ প্রবন্ধে কোরবানির প্রসঙ্গে কয়েকটি যুক্তি দেখিয়েছিলেন:
কোরবানির দ্বারা একেক দীনদরিদ্র লোকেরা প্রীতিকর ও তৃপ্তিকর ভোজ পায়, পশুচর্ম দ্বারা তাহাদের অন্নবস্ত্রের অভাব আংশিকরূপে দূর হয়, একসঙ্গে হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ পশুবধে তাহার রক্ত, হাড়, উদরস্থ গোবর ইত্যাদি সাররূপে জমির উর্বরা শক্তি বৃদ্ধি করে। এ জন্য কোরবানির পশুকে মাঠে লইয়া গিয়া জবেহ করার আদেশ দেওয়া হইয়াছে।... পশু পোষণ যাহাদের জীবনের প্রধান সম্বল তাহারা সারা বৎসরের মধ্যে এই পর্বোপলক্ষে পশু বিক্রি করিয়া নিজ নিজ সংসার জীবনের নানাপ্রকার অভাব অভিযোগ তদ্দারা মিটাইয়া থাকে।
[আল এসলাম’, ভাদ্র ১৩২৩]
মোজাম্মেল হক (শান্তিপুর, ১৮৬০-১৯৩৩) ‘ঈদ’ (মোসলেম ভারত, ‘জ্যৈষ্ঠ ১৩২৭) কবিতায় লিখেছেন:
মুসলেমের আজ ঈদ শুভময়
আজ মিলনের দিন,
গলায় গলায় মাখামাখি
আমির ফকির হীন।
আজ সবারি হস্ত পুত
ধোওয়া স্বরগ নীরে?
তাই যে চুমোর ভিড় লেগেছে
নম্র নত শিরে।

‘মোসলেম ভারত’ পত্রিকায় ‘খাজা’ নামধারী ছদ্মনামা ‘ঈদজ্জোহা’ প্রবন্ধে লিখছেন:
আজ ঈদুজ্জোহা- আজ মুসলমানের কোরবানির-উৎসবের বিসর্জনের দিন, অথচ আজই আবার প্রকৃত ঈদের আনন্দ-উৎসবের দিন। ত্যাগেই সুখ-ভোগে নহে, বিসর্জনেই প্রতিষ্ঠা, উৎসর্গেই সাফল্য, নিবেদনেই আনন্দ। মুসলমানকে জীবনের পদে পদে এমনই করিয়া কোরবানি করিতে হইবে, এমনই করিয়া আল্লার নামে আপনাকে বিলাইয়া দিয়া ত্যাগের মধ্যে আনন্দ, মৃত্যুর মধ্যে জীবন খুঁজিয়া লইতে হইবে। [‘মোসলেম ভারত’, শ্রাবণ ১৩২৭]

শেখ ফজলল করিম (১৮৮২-১৯৩৬) ‘ঈদ’ কবিতায় লিখেছেন:
অলস অধম মোরা এখনো কি অবহেলে
যাব রসাতলে?
অদৃষ্টের উপহাস এখনো কি আনিবে না
চেতনা ফিরিয়া?
এখনো লাঞ্ছিত মোরা বুঝিব না হিতাহিত
রহিব ঘুমিয়া?
জীবন-প্রভাত আজি বিস্ময়ে দেখিতে চাহি
মহাজাগরণ;
সাহসে বাঁধিয়া বুক পথে হয়ে অগ্রসর
নতুবা মরণ!! [‘বাসনা’, আশ্বিন ১৩১৫]

নজরুলের অব্যবহিত দুই পূর্বসূরি শাহাদাৎ হোসেন (১৮৯৩-১৯৫৩) ও গোলাম মোস্তফা (১৮৯৭-১৯৬৪) ও ঈদ বিষয়ক কবিতা লিখেছেন। শাহাদাৎ হোসেনের কবিতার বিষয়ে ও প্রকাশে তাঁর স্বভাবশোভন ধ্রুপদী বিন্যাস। ‘ঈদুল ফিতর’ কবিতায়:
কোথা মক্কা-মোয়াজ্জেমা মদিনা কোথায়
প্রাণকেন্দ্র এ মহাসাম্যের
কোথা আমি ভারতের প্রান্ততটে ক্ষুদ্র ঈদগাহে।
সিন্দু-মরু-গিরি-দরী-কান্তার-তটিনী
রচিয়াছে ব্যবধান দুর্জয় বিপুল
তবু শুনি বায়ুস্তরে তরঙ্গদোলায়
ভেসে আসে সে উদাত্ত মন্দ্রিত নির্ঘোষ।
সাম্যের দিশারী আমি-আমি মুসলমান
দেশ-কাল-পাত্র মোর সর্ব একাকার-
বহুত্বে একক আমি
আত্মার আত্মীয় মোর দুনিয়া-জাহান।
ঈদুল আজহা সম্পর্কিত তাঁর ‘ঈদ-বোধন’ কবিতার উপাত্ত পঙক্তিগুলি এরকম:
ত্যাগপন্থী ‘ইসমাইল’ সবুজ তরুণ
নব জীবনের আশে রঙিন অরুণ
যুগে যুগে এ আহ্বানে জেগেছিস তোরা
আজিও জাগরে যুগে খুলে দে রে শোণিতের উন্মাদিনী ঝোরা।
তাজা খুনে লাল হয়ে যাক ‘মীনা’র ময়দান,
মরণের আলিঙ্গনে হোক পুনর্জীবনের নব অভ্যুত্থান।

শাহাদাৎ হোসেনের দুটি কবিতাই ১৯২৪ সালে রচিত। গোলাম মোস্তফা, বিপরীতভাবে, ঈদুল আজহার বর্ণনায় অনেক বেশি কাহিনিধর্মী। ‘কোরবানি’ নামে খোশরোজ ও কাব্যকাহিনি গ্রন্থভুক্ত কবির দুটি কবিতাই এর সাক্ষ্য দেবে। অন্যপক্ষে, গোলাম মোস্তফার ‘ঈদ-উৎসব’ কবিতাটি (প্রথম প্রকাশ: ‘সওগাত’, ভাদ্র ১৩২৬, রক্তরাগ) গীতিময়। উপাত্ত স্তবকটি এরকম:
সকল ধরা মাঝে বিরাট মানবতা সুরভি লভিয়াছে হর্ষে
আজিকে প্রাণে প্রাণে যে ভাব জাগিয়াছে, রাখিতে হবে সারা বর্ষে,
এ ঈদ হোক আজি সফল ধন্য
নিখিল-মানবের মিলন জন্য,
শুভ যা জেগে থাক, অশুভ দূরে যাক খোদার শুভাশিস স্পর্শে।

নজরুল ইসলাম
এটা আজ দিবালোকের মতো সত্য যে, কাজী নজরুল ইসলামই (১৮৯৯-১৯৭৬) ইসলামী বিষয়বস্তুর অসাধারণ সাহিত্যিক রূপদান করেছিলেন। এই সাফল্যের একটি কারণ তাঁর বিষয়, বক্তব্য ও বিন্যাসের আশ্চর্য মেলবন্ধন। ১৯২৭ সালে নজরুল ইসলামই প্রথম সাহস করে উচ্চারণ করেছিলেন ‘আমি মনে করি, বিশ্ব-কাব্যলক্ষ্মীর একটি মুসলমানী ঢং আছে।’ এই ‘মুসলমানী ঢং’ নজরুল বাংলা সাহিত্যে এনেছিলেন অসাধারণভাবে। এই ‘মুসলমানী ঢং’ সৃষ্টিতে নজরুলের এক বিরাট সহায়ক ছিলো প্রাসঙ্গিক আরবি-ফরাসি শব্দ ব্যবহার। নজরুলের ‘বড়র পিরীতি বালির বাঁধ’ প্রবন্ধ থেকে ছেঁড়া-ছেঁড়া কিন্তু একটু বিশদভাবেই কয়েকটি পঙক্তি উদ্ধৃত করবো:

এই আরবি-ফারসি শব্দ প্রয়োগ কবিতায় শুধু আমিই করিনি। আমার বহু আগে ভারতচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, সত্যেন্দ্রনাথ প্রভৃতি করে গেছেন।/... ঐ একটু ভালো শোনাবার লোভেই ঐ একটি ভিনদেশী কথার প্রয়োগে অপূর্ব রূপ ও গতি দেওয়ার আনন্দেই আমিও আরবি-ফারসি শব্দ ব্যবহার করি।/... আমি শুধু ‘খুন’ নয়- বাংলায় চলতি আরো অনেক আরবি-ফারসি শব্দ ব্যবহার করেছি আমার লেখায়। আমার দিক থেকে ওর একটা জবাবদিহি আছে। আমি মনে করি, বিশ্ব-কাব্যলক্ষ্মীর একটি মুসলমানি ঢং আছে। ও-সাজে তাঁর শ্রীর হানি হয়েছে বলেও আমার জানা নেই।/... আজকের কলালক্ষ্মীর প্রায় অর্ধেক অলংকারই তো মুসলমানি ঢঙের। বাইরের এ ফর্মের প্রয়োজন ও সৌকুমার্য সকল শিল্পীই স্বীকার করেন।
১৯২৮ সালে ‘বঙ্গসাহিত্যে খুনের মামলা’ নামে এক প্রবন্ধে বীরবল তথা প্রমথ চৌধুরী (১৮৬৮-১৯৪৬) নজরুলের ঐ প্রবন্ধের বক্তব্যের কিছুটা সমালোচনা করলেও মূল বিষয়ে সহমতই প্রকাশ করেন:

বাংলা সাহিত্য থেকে আরবি ও ফারসি শব্দ বহিষ্কৃত করতে সেই জাতীয় সাহিত্যিকরাই উৎসুক যাঁরা বাংলা জানেন না।

নজরুল ইসলাম অবিসংবাদীভাবে বাংলা সাহিত্যে আরবি-ফারসি শব্দ তথা ‘মুসলমানী ঢং’-এর প্রতিষ্ঠা করেন। এ বিষয়ে তাঁর নানামুখী উদ্যমের মধ্যে ইসলামী আচার-অনুষ্ঠান-ব্যবহারিক দিকগুলোও রয়েছে। ঈদ তার মধ্যে একটি। ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা এই দুই ঈদ নিয়েই নজরুল কবিতা গান-নাটক-গীতিবিচিত্রা লিখেছেন। এখানে তার একটি তালিকা দেওয়া যেতে পারে।

কবিতা
১.    কৃষকের ঈদ। সাপ্তাহিক ‘কৃষক’, ঈদ-সংখ্যা ১৯৪১।
২.    ঈদ মোবারক। রচনা: কলিকাতা, ১৯ চৈত্র ১৩৩৩। জিঞ্জির।
৩.    জাকাত লইতে এসেছে ডাকাত চাঁদ।
৪.    ঈদের চাঁদ।
৫.    সর্বহারা।
৬.    বকরীদ।
৭.    কোরবানি। ‘মোসলেম ভারত’, ভাদ্র ১৩২৭। অগ্নি-বীণা।
৮.    শহীদী ঈদ। সাপ্তাহিক ‘মোহাম্মদী’। ভাঙার গান।
৯.    আজাদ। দৈনিক ‘আজাদ’, ঈদ-সংখ্যা, ১৩৪৭।

গান
১০.    নতুন ঈদের চাঁদ (ওরে ও নতুন ঈদের চাঁদ)।
১১.    খুশির ঈদ (ওমন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ)।
১২.    চলো ঈদগাহে (এলো আবার ঈদ ফিরে এলো আবার ঈদ)।
১৩.    ঈদুল-ফিতর (ঈদুল ফেতর এলো ঈদ ঈদ ঈদ)।
১৪.    ঈদ মোবারক (ঈদ মোবারক ঈদ মোবারক)
১৫.    ঈদ ঈদ ঈদ (আজি ঈদ ঈদ ঈদ খুশির ঈদ এলো ঈদ)।
১৬.    আল্লাহ আমার মাথার মুকুট (নাই হলো মা জেওর লেবাস)।
১৭.    নতুন চাঁদের তকবির (নতুন চাঁদের তকবির শোনো)।
১৮.    ঈদুজ্জোহার চাঁদ (ঈদুজ্জোহার চাঁদ হাসে ঐ)।
১৯.    ঈদুজ্জোহার তকবির শোনো (ঈদুজ্জোহার তকবির শোনো ঈদগাহে)।
২০.    ঈদ মোবারক হো (ঈদ মোবারক, ঈদ মোবারক, ঈদ)।
২১.    দে জাকাত দে জাকাত, দে জাকাত, তোরা দে রে জাকাত)।

নাটিকা
২২.    ঈদ (বেতার নাটিকা)। দৈনিক ‘ইত্তেফাক’, ঈদসংখ্যা ৭ বৈশাখ ১৩৬৫।
২৩.    ঈদুল ফেতর (রেকর্ড-নাটিকা)।

অভিভাষণ
২৪.    স্বাধীন-চিত্ততার জাগরণ (১৩৪৭ সালে কলকাতায় বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির এক অধিবেশনে সভাপতির অভিভাষণ)।
মীর মশাররফ হোসেন (১৮৪৭-১৯১১), কায়কোবাদ (১৮৫৭-১৯৫১) ও মোজাম্মেল হক (শান্তিপুর, ১৮৬০-১৯৩৩)Ñ উনিশ শতাব্দীর এই শ্রেষ্ঠ তিন সৃষ্টিশীল মুসলিম প্রতিভাবান লেখকের উত্তরাধিকার বহন করেছেন নজরুল এবং একা তিনি এগিয়ে নিয়ে গেছেন অনেকখানি। ইসলামী ঐতিহ্যের ব্যবহারে তার একটি পরিষ্কার সাক্ষ্য পাওয়া যায়। ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা- মুসলমানদের এই প্রধান দুটি ধর্মীয় উৎসব নিয়েই কবিতা লিখেছেন নজরুল। এবং যথারীতি ঈদ নিয়ে এতোকাল যে কবিতা গান লেখা হয়েছে, নজরুল তাকে অনায়াসে অতিক্রম করেছেন, ঈদ-সম্পৃক্ত তাঁর কবিতা- গান-নাটকে তাঁরই করাঙ্গুলির ছাপ স্পষ্ট মুদ্রিত। শুধু তাই নয়, বাঙালি-মুসলমানকে তা নতুনভাবে উজ্জীবিত-উদ্বোধিত করেছে এবং আজো করে।

কবি হিসেবে নজরুলের আবির্ভাব ১৯১৯ সালে। ১৯২০ সালেই নজরুল লেখেন ঈদুল আজহা নিয়ে অসাধারণ কবিতা ‘কোরবানি’ (‘মোসলেম ভারত’, ১৩২৭)। মোজাম্মেল হক (শান্তিপুর)-সম্পাদিত ‘মোসলেম ভারত’ পত্রিকায় নজরুল একের পর এক ইসলামী ঐতিহ্যভিত্তিক কবিতা লিখে যাচ্ছিলেন। নজরুলের ইসলামী ঐতিহ্যভিত্তিক কবিতায়, যেমন তাঁর ঈদ-সংক্রান্ত কবিতা-গানেও, তাঁর সাম্যবাদী চেতনায় বলীয়ান প্রকাশ আমরা দেখতে পাই। এবং এদিক থেকে নজরুল তাঁর পূর্বজ ঈদের কবিতা- রচয়িতাদের থেকে সম্পূর্ণ এক পৃথক জগৎ নির্মাণ করেছিলেন। নজরুলের ঈদ সংক্রান্ত কবিতা-গানে একদিকে আছে নিছক আনন্দ-উল্লাস (যেমন, ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’), অন্যদিকে আছে সাম্যের আহ্বান (‘দে জাকাত, দে জাকাত, তোরা দে রে জাকাত’) বা নবজাগরণের বাণী (‘ওরে হত্যা নয় আজ সত্যাগ্রহ শক্তির উদ্বোধন)। প্রমথ চৌধুরী-সম্পাদিত ‘সবুজপত্র’ পত্রিকার শ্রাবণ ১৩২৭ সংখ্যায় তরিকুল আলম ‘আজ ঈদ’ শীর্ষক এক প্রবন্ধে কোরবানির ঈদে পশু হত্যার বিরুদ্ধে অভিমত ব্যক্ত করেছিলেন। এই প্রবন্ধের প্রতিক্রিয়াতেই নজরুল ‘কোরবানি’ কবিতাটি লিখেছিলেন। ৬ মাত্রার মাত্রাবৃত্তে ও অপরূপ অন্তমিলে এক আশ্চর্য সুরঝংকার সৃষ্টি করেছিলেন কবিÑ কবিতার মধ্যেই শক্তির উদ্বোধন হয়েছিলো। তরিকুল আলমের ‘আজ ঈদ’ প্রবন্ধের কথা আজ আর মনে নেই কারো, কিন্তু নজরুলের ‘কোরবানি’ কবিতাটি পঁচাত্তর বছর পরেও এবারের বসন্তের কৃষ্ণচূড়ার মতোই তরতাজা মনে হয়।

নজরুলের ঈদুল ফিতরের কবিতায়-গানে বারবার এসেছে দরিদ্রের জন্যে তাঁর মমত্বময় সংবেদন:
১.    জাকাত লইতে আসমানে এলো আবার ডাকাত চাঁদ
গরীব কাঙাল হাত পাত, ধনী রইস সবাই বাঁধ।
[জাকাত লইতে এসেছে...]
২.    প্রজারাই রোজ রোজা রাখিয়াছে আজীবন উপবাসী,
তাহাদেরই তরে এই রহমত, ঈদের চাঁদের হাসি।
[ঈদের চাঁদ]
৩.    সবাই খোরাক পাইবে ক্ষুধার আসিবে ঈদের খুশি,
লুট করে নে রে আল্লার দান কেউ হবি না রে দুষী।
[সর্বহারা]
আর সেই প্রবাদপ্রতিম পঙক্তি দুটির কথা কার না স্মরণে জাগে?Ñ
জীবনে যাদের হররোজ রোজা ক্ষুধায় আসে না নিদ
মুমূর্ষু সেই কৃষকের ঘরে এসেছে কি আজ ঈদ?
[কৃষকের ঈদ]

নজরুলের ঈদুল আজহার কবিতায়-গানে উপর্যুপরি বেজেছে জেগে ওঠার বীজমন্ত্র:
১.    ‘শহীদান’দের ঈদ এলো বকরীদ!
অন্তরে চির নৌ-জোয়ান যে, তারি তরে এই ঈদ।...
উমরে, খালেদে, মুসা ও তারেকে বকরীদের মনে করো,
শুধু সালোয়ার পরিও না, ধরো হাতে তলোয়ার ধরো। [বকরীদ]
২.    পশু কোরবানি দিস তখন
আজাদ- মুক্ত হবি যখন
জুলুম-মুক্ত হবে বে দ্বীন।Ñ
কোরবানির আজ এই যে খুন
শিখা হয়ে যেন জ্বালে আগুন,
জালিমের যেন রাখে না চিন।।
আমিন রাব্বিল আলামীন!
আমিন রাব্বিল আলামীন!

‘ঈদ মোবারক’ কবিতায় নজরুলের ঈদের কবিতার তিনটি স্তর- আনন্দময়তা, সাম্যবাদ এবং শরীর থেকে আত্মার জাগরণÑ সবই উপস্থিত। একদিকে: ‘সাপিনীর মতো বেঁধেছে লায়লি কায়েসে গো,/বাহুর বন্ধে চোখ বুঁজে বধূ আয়েশে গো/গালে গালে চুমু গড়াগড়ি।’ এই আনন্দময়তার উল্টোদিকে ঈদের সামাজিক দায়িত্ব: ‘ইসলাম বলে, সকলের তরে মোরা সবাই,/ সুখ-দুখ সম-ভাগ করে নেবো সকলে ভাই,/নাই অধিকার সঞ্চয়ের।’ কবিতা শেষ হচ্ছে নজরুলের ঈদের কবিতার আরাধ্যে: দেহ নয়, দিল হবে শহীদ।’

সাধারণভাবে নজরুল চেয়েছিলেন মানুষের জাগরণ, ভারতবাসীর জাগরণ, বাঙালির জাগরণ। ইসলামী কবিতায় নজরুলের আকাক্সক্ষা ছিলো বাঙালি-মুসলমানের জাগরণ। দৈনিক ‘আজাদ’-এর ১৩৪৭-এর ঈদ-সংখ্যায় প্রকাশিত ‘আজাদ’ কবিতায়ও ঈদের আকাক্সক্ষার সঙ্গে তাঁর আরাধ্য মিশে গেছে। তাই এরকম ব্যঙ্গোক্তি:

আজও তেমনি জমায়েত হয় ঈদগাহে মসজিদে,
ইমাম পড়েন খোৎবা, শ্রোতার আঁখি ঢুলে আসে নিদে।
যেন দলে দলে কলের পুতুল শক্তিশৌর্যহীন,
নাইকো ইমাম, বলিতে হইবেÑ ইহারা মুসলেমিন।
এই দীর্ঘ কবিতার শেষদিকে কবির প্রশ্নের অন্তরালেই রয়েছে তাঁর উত্তর:
জরারে পৃষ্ঠে বহিয়া বহিয়া জীবন যাবে কি তব,
জীবন ভরিয়া রোজা রাখি ঈদ আনিবে না অভিনব?

নজরুলের ঈদের সম্পূর্ণতম কবিতা যেমন ‘ঈদ মোবারক’, তেমনি ঈদের সম্পূর্ণতম গান ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’। তিরিশের দশকে রচিত এই গান যুগ-যুগ ধরে বাঙালি-মুসলমানকে কথায়-সুরে-ছন্দে নাচিয়েছে যেমন, আমাদের বিশ্বাস-চিরকালই এই গান তেমনিভাবে উদ্বুদ্ধ করে যাবে। আনন্দময়তা, সাম্যবোধ ও আত্মার জাগরণ-নজরুলের ঈদের কবিতা-গানের এই ত্রিমাত্রিকতা এক অপরূপ পেয়েছে এই কালোত্তর গানের ভিতরে:

ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ।
তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে শোন আসমানী তাকিদ।।
তোর সোনাদানা বালাখানা সব রাহে লিল্লাহ
দে জাকাত মুর্দা মুসলিমের আজ ভাঙাইতে নিদ।।
তুই পড়বি ঈদের নামাজ রে মন সেই সে ঈদগাহে
যে ময়দানে সব গাজী মুসলিম হয়েছে শহীদ।।
আজ ভুলে গিয়ে দোস্ত-দুশমন হাত মিলাও হাতে,
তোর প্রেম দিয়ে কর বিশ্ব-নিখিল ইসলামে মুরিদ।।
যারা জীবন ভরে রাখছে রোজা নিত্-উপবাসী
সেই গরিব এতিম মিসকিনে দে যা কিছু মফিদ।।
ঢাল হৃদয়ের তোর তশতরিতে শিরনি তৌহিদের,
তোর দাওত কবুল করবেন হযরত, হয় মনে উমীদ।।
তোরে মারল ছুঁড়ে জীবন জুড়ে ইট-পাথর যারা
সেই পাথর দিয়ে তোল রে গড়ে প্রেমেরি মসজিদ।।

পরবর্তী ধারা
নজরুল ইসলামের সমকালে ও পরবর্তীকালে ঈদ বিষয়ক কবিতা ও গদ্যের ধারা অব্যাহত থাকে। বিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে বেগম রোকেয়া, সৈয়দ এমদাদ আলী, কাজী ইমদাদুল হক (১৮৮২-১৯২৬), এয়াকুব আলী চৌধুরী (১৮৮৭-১৯৪০), ডা. লুৎফর রহমান (১৮৮৯-১৯৩৫), ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ (১৮৮৫-১৯৬৯) প্রমুখ যে চিন্তার চর্চা শুরু করেন, বিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে তা বিশেষভাবে ফলবান হয়ে ওঠে কয়েকজন ভাবুকের রচনায়। এঁদের শ্রেষ্ঠ দুজন হচ্ছে কাজী আবদুল ওদুদ (১৮৯৪-১৯৭০) ও মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী (১৮৯৬-১৯৫৪)। এঁদের দুজনেরই বহুমাত্রিক ভাবনার মধ্যে ঈদ-প্রসঙ্গও এসেছে। ‘ঈদুল ফিতর’ ও ‘ঈদুজ্জোহা’ দুই শিরোনামেই প্রবন্ধ লিখেছেন ওদুদ। কাজী আবদুল ওদুদের যে-বিশিষ্টতা, প্রমুক্তচিত্ততা, তার প্রকাশ এখানেই আছে। তাঁর ‘ঈদুল ফিতর’ প্রবন্ধের উপসংহার এরকম:
সর্বপ্রকারের জড়তা থেকে মুক্ত হয়ে মানুষ যোগ্যভাবে ধর্ম পালন করুক, পালন করে সর্বাঙ্গীণ উৎকর্ষ লাভ করুক, ঈদুল-ফিতরের পুণ্য দিনে এই প্রার্থনা করি।

মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী ‘ঈদের লেখা’ নামক নকশায় একজন লেখকের, পরোক্ষে নিজেরই, সামাজিক অবস্থান বর্ণনা করেছেন। ‘ঈদ-অল-ফেতর’ (‘সাম্যবাদী’, বৈশাখ ১৩৩১) প্রবন্ধে মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী তাঁর স্বভাবসুলভ ঈদের তাৎপর্য বিশ্লেষণ করেছেন। আমাদের তিরিশের কবিদের কেউ-কেউ ঈদের কবিতা লিখেছেন। বেগম সুফিয়া কামাল (১৯১১)। অনেকদিন ধরে বছর-বছর ঈদের কবিতা লিখে গেছেন। কবি মঈনুদ্দীন (১৯০২-৮১) ‘সাম্যবাদী’ পত্রিকায় (বৈশাখ ১৩৩২) ‘ঈদ’ কবিতাটি তো এক সময় যথেষ্ট বিখ্যাত হয়েছিলো। আশরাফ আলী খান চিরকালই ছিলেন নির্জিতদের পক্ষে, ‘ঈদ’ কবিতাতেও তার পরিচয় পাওয়া যায়। শেষ স্তবকটি উদ্ধার করছি:
সাঁঝের আকাশে দেখা দেয় চাঁদ, ঘরে ঘরে লাগে ধুম,
সারা রাত ধরি চলে উৎসব, কারো চোখে নাই ঘুম।
মওলভী ক’ন, ‘আল্লার শান
ঈদে হয় তাজা সকলের প্রাণ।’
প্রজা কেঁদে কয়- ‘ঈদের জুলুমে মরিল গরীব মজলুম।’
‘ঈদ একেবারে ব্যর্থ হইল’- আল্লা ভাবেন হয়ে গুম।

পরবর্তীকালে ঈদের কবিতা-গান লিখেছেন সিকানদার আবু জাফর, ফররুখ আহমদ, আবুল হোসেন, তালিম হোসেন, আহসান হাবীব, সানাউল হক, আজিজুর রহমান, আশরাফ সিদ্দিকী, মনোমোহন বর্মণ প্রমুখ অনেক কবি। ফররুখ আহমদ তাঁর ‘ঈদের স্বপ্ন’ (কাফেলা) সনেটে ঈদের চাঁদ দেখে তাঁর স্বপ্নজগতেই প্রস্থান করেছেন। এই কবিতার অষ্টকটি উৎকলন করছি:

আকাশের বাঁক ঘুরে চাঁদ এলো ছবির মতন,
নতুন কিশতি বুঝি এলো ঘুরে অজানা সাগর
নাবিকের শ্রান্ত মনে পৃথিবী কি পাঠালো খবর
আজ এ স্বপ্নের মাঠে রাঙা মেঘ হলো ঘন বন!
নিবিড় সন্ধ্যার পথে শাহজাদি উতলা উন্নন
কার প্রতীক্ষায় যেন পাঠায়েছে আলোর ইশারা,
পুষ্পিত গোলাবশাখে বুলবুল ডেকে হলো সারা;
আতরের ঘন গন্ধে মাটি চায় হাওয়ার বাঁধন।

শামসুর রাহমান তাঁর একটি কবিতায় শৈশবের ঈদের আনন্দের বর্ণনা দিয়েছেন। শহীদ কাদরীর কবিতায় ‘সুনীল ঈদগা’ দেখা দেয় প্রতীকের মতো। এমনিভাবে ঈদের আনন্দ-বেদনা মূর্ত হয়েছে সৈয়দ এমদাদ আলী থেকে শহীদ কাদরী বা তাঁর পরবর্তীদের রচনায়।

শেষ কথা
১৯২৭ সালে কাজী মোতাহার হোসেন (১৮৯৭-১৯৮১) তাঁর বিখ্যাত ‘আনন্দ ও মুসলমান-গৃহ’ (‘সওগাত’, অগ্রহায়ণ ১৩৩৪) প্রবন্ধে লিখেছিলেন:

মুসলমানের যে গৃহ নেই, তার একটি কারণ, আনন্দের উপকরণের অভাব। মুসলমান গান গাইবে না, ছবি আঁকবে না, এক কথায় মনোরঞ্জনকর ললিতকলার কোনো সংশ্রবেই থাকবে না। মুসলমান পুরুষরা কেবল কাজ করবে, আর ঘর শাসন করবে, মেয়েরা কেবল রাঁধবে, বাড়বে, আর বসে বসে স্বামীর পা টিপে দেবে.../... গৃহে যখন আমাদের থাকতেই হবে, তখন আমরা এর সংস্কারে লেগে যাই না কেন? সমাজকে যখন আমরা বাদ দিতে পারি না, তখন একে সরস শোভন এবং আনন্দময় করেই গড়ে তুলি না কেন?

এরও কয়েক বছর আগে, ১৯২০-এ, দৈনিক ‘নবযুগ’-এর এক সম্পাদকীয়, ‘বাংলা সাহিত্যে মুসলমান’ প্রবন্ধে কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের সাহিত্যে প্রাণচঞ্চলতা সৃষ্টির তাগিদ দিয়েছেন এবং তার জন্যে করণীয় নির্ধারণ করেছিলেন:

আমাদের বাংলার মুসলমান সমাজ যে বাংলা ভাষাকে মাতৃভাষা বলিয়া স্বীকার করিয়া লইয়াছেন এবং অত্যল্পকাল মধ্যে আশাতীতভাবে উন্নতি দেখাইয়াছেন, ইহা সকলেই বলিবেন এবং আমাদের পক্ষে ইহা কম শ্লাঘার বিষয় নহে।... এখন আমাদের বাংলা সাহিত্যে স্থায়ী প্রভাব বিস্তার করিতে হইলে সর্বপ্রথম আমাদের লেখার জড়তা দূর করিয়া তাহাতে ঝরনার মতো ঢেউ-ভরা চপলতা ও সহজে মুক্তি আনিতে হইবে। ... নবীন সাহিত্যিকগণ সর্বদা প্রফুল্লচিত্ত থাকিবার জন্য যদি এক-আধটু করিয়া সংগীতের আলোচনা করেন, তাহা হইলে দেখিবেন তাহাদের লেখার মধ্যে এই সংগীত, সুরের এই ঝংকার উন্মুক্ত প্রফুল্ল চিত্তের এই মোহন-বিকাশ ফুটিয়া উঠিয়া তাঁহাদের লেখার মধ্যে এক নতুন মাদকতা, অভিনব শক্তি দান করিতেছে।

আমাদের ধর্মীয় ও অন্য উপাচারগুলি সাহিত্য-সংস্কৃতি-নিষিক্ত হতে কয়েকশ বছর লেগে গেলো। এখনো তা সম্পূর্ণ হয়েছে বলে মনে করি না আমরা। কয়েকশ বছর ধরে বাঙালি-মুসলমান ঈদ উদযাপন করলেও মাত্র এই শতাব্দীর শুরু থেকে ঈদ সম্পৃক্ত সত্যিকার সাহিত্য রচনা শুরু হয়েছে। কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের দুই ঈদ তথা ধর্মীয় উপাচারগুলিকে অসাধারণ সৌন্দর্য ও তাৎপর্যে ম-িত করে এক যুগান্তর সৃষ্টি করেছিলেন। দেশ বিভাগের পরে ঢাকা যখন বাংলা সাহিত্যের দ্বিতীয় রাজধানী হয়ে উঠে, তখন স্বাভাবিকভাবে অন্যান্য অনেক কিছুর মতো ঈদ-উদযাপনে সাহিত্যিক-সাংস্কৃতিক তাৎপর্যও গরিয়ান ও বলীয়ান হয়ে ওঠে। ঈদ বিষয়ক কবিতা ও গদ্য রচনা পত্র-পত্রিকার ঈদ সংখ্যায় প্রকাশ, রেডিও-টেলিভিশনে ঈদ উদযাপন আনন্দের সঙ্গে সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে মিলিয়ে দেয়। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর পত্র-পত্রিকার পৃষ্ঠপোষকতায় ঈদ-সংখ্যার প্রকাশ তাকে আরো একটু গতি দেয়। তবে কথাসাহিত্যে এই বাস্তবতার পুরোপুরি ছাপ- যে পড়েনি, তাও স্বীকার করা ভালো। বাঙালি-মুসলমানের যে-বিশিষ্ট জীবনযাপন, আমাদের তথাকথিত বাস্তববাদী কথাসাহিত্য তাকে অস্বীকার করে অনেক সময় এক কল্পিত বাস্তবতার দাবি তুলে এনেছে। কিন্তু তারপরও গত শতবর্ষ ধরে ঈদের কবিতা-গান-কথাসাহিত্য আমাদের ধর্মীয় আনন্দের সঙ্গে সাংস্কৃতিক আনন্দকে একটু একটু করে মিশিয়ে তুলেছে। এই শতাব্দীর সূচনায় যার সুত্রপাত হয়েছিলো, শতাব্দীর শেষে এসে দেখতে পাচ্ছি তার পরিণত রূপ। ঈদ ধর্মীয় উৎসব তো বটেই, আজ সাংস্কৃতিক উৎসবেও পরিণত হয়েছে। আমাদের গৃহ ও সাহিত্যকে খানিকটা হলেও আনন্দময় করে তুলেছে।। [১৯৯৫]

* লেখাটি ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ প্রকাশিত (দ্বিতীয় সংস্করণ, ২০০৫) আবদুল মান্নান সৈয়দের বই ‘বাংলা সাহিত্যে মুসলমান’ থেকে সংগৃহীত

সংবাদটি শেয়ার করুন

সাহিত্য বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত