ডিসির দরবারে অসহায়ের ভিড়, সমাধান নিয়ে ফিরছেন হাসিমুখে

গাজীপুর প্রতিবেদক, ঢাকা টাইমস
  প্রকাশিত : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২০:৩৬
অ- অ+

অসুস্থতা, আর্থিক সংকট, জমিজমার জটিলতা কিংবা এলাকার উন্নয়ন—নানা সমস্যা নিয়ে প্রতি বুধবার গাজীপুরের জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে হাজির হন অসহায় মানুষ। জেলা প্রশাসক মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া ধৈর্য ধরে তাদের কথা শোনেন। নিজের এখতিয়ারের মধ্যে থাকা সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান দেন, আর অন্যগুলো সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠিয়ে দেন। ফলে দুশ্চিন্তা নিয়ে দূর-দূরান্ত থেকে আসা অনেক মানুষই ফিরছেন কিছুটা স্বস্তি নিয়ে।

বুধবার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত গণশুনানিতে অর্ধশতাধিক নারী-পুরুষ নিজেদের নানা সমস্যা নিয়ে হাজির হন।

গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ১৬ নম্বর ওয়ার্ডের দীঘিরচালা এলাকা থেকে পঙ্গু বাবার চিকিৎসার জন্য আর্থিক সহায়তা চাইতে আসেন পোশাক শ্রমিক সানিয়া আক্তার (২৫)।

জেলা প্রশাসককে সানিয়া জানান, তার বাবা মজিদ মিয়া লেগুনা চালিয়ে পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন। ছয় বছর আগে সড়ক দুর্ঘটনায় তার পা ভেঙে যায়। এরপর থেকে পঙ্গুত্বের কারণে তিনি বিছানায় পড়ে আছেন। ১১ বছর আগে মারা যান সানিয়ার মা।

অষ্টম শ্রেণিতে পড়ুয়া ছোট বোনের লেখাপড়া ও বাবার চিকিৎসার খরচ চালাতে সানিয়াকে পোশাক কারখানায় চাকরি নিতে হয়েছে। বেতন দিয়ে ঘরভাড়া, সংসার খরচ ও বোনের পড়াশোনার ব্যয় মেটাতেই সব টাকা শেষ হয়ে যায়। অর্থের অভাবে বাবার চিকিৎসাও বন্ধ হয়ে গেছে।

সানিয়ার কথা শুনে জেলা প্রশাসক তার বাবার চিকিৎসার জন্য নগদ অর্থ সহায়তা দেন এবং ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যবস্থা করার আশ্বাস দেন।

এদিকে, টাকার অভাবে চিকিৎসা বন্ধ হয়ে যাওয়া স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত টঙ্গীর অসহায় বৃদ্ধা সামসুন্নাহারকেও নগদ অর্থ সহায়তা দেন জেলা প্রশাসক।

গণশুনানিতে নিজের অসহায়ত্বের কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন নগরীর ধীরাশ্রম এলাকা থেকে একমাত্র মেয়েকে নিয়ে আসা বিধবা হালিমা আক্তার।

হালিমা জানান, চার মাস আগে তার স্বামী মারা গেছেন। ছেলে না থাকায় ভাসুরসহ স্বামীর পরিবারের অন্যরা তাকে ও তার মেয়েকে স্বামীর সম্পদ থেকে বঞ্চিত করার চেষ্টা করছেন। এমনকি ঘরের জিনিসপত্র নিয়ে তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। ১৩ বছরের কিশোরী মেয়েকে নিয়ে দ্বারে দ্বারে ঘুরেও তিনি কোনো প্রতিকার পাননি।

তার কথা শুনে জেলা প্রশাসক বিষয়টি দ্রুত সমাধানের জন্য সদর সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি)কে দায়িত্ব দেন।

শুধু চিকিৎসা বা আর্থিক সহায়তা নয়, অধিগ্রহণ করা জমির টাকা পেতে সমস্যা, মাতৃত্বকালীন ভাতা, দুর্ঘটনায় আহত হয়ে ক্ষতিপূরণ, এলাকার রাস্তা সংস্কার, অফিস স্থাপন, অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা, বাসস্থানের সমস্যা এবং কারখানার বকেয়া বেতন আদায়সহ নানা বিষয়ে গণশুনানিতে আবেদন করেন মানুষ।

জেলা প্রশাসকের কাছে আসা এসব সমস্যার কোনোটি তিনি নিজে সমাধান করেন, আবার কোনোটি সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠিয়ে দেন।

জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া বলেন, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতি বুধবার গণশুনানির আয়োজন করা হয়। সেখানে এলাকার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ তাদের অভাব, অভিযোগ ও সমস্যার কথা জানান।

তিনি বলেন, ‘তাদের অনেকেই বয়স্ক এবং অসহায়। সন্তান থাকলেও অনেক সময় খোঁজ নেয় না। আবার অনেকের কেউ নেই, সামর্থ্যও নেই। তাদের কষ্ট দেখলে-শুনলে মন খারাপ হয়।’

নিজের এখতিয়ারের মধ্যে থাকা সমস্যাগুলোর সমাধান করে দেওয়ার কথা জানিয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, গণশুনানিতে বেশিরভাগ অভিযোগ আসে জমিজমা, আর্থিক সংকট ও চিকিৎসা সংক্রান্ত বিষয়ে। সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচির আওতায় এসব মানুষকে সহায়তার সুযোগ রয়েছে।

তিনি বলেন, জটিল রোগে আক্রান্তদের সমাজসেবা বিভাগ, গর্ভবতী মায়েদের পুষ্টিকর খাবারের জন্য মহিলা ও শিশু বিষয়ক দপ্তর, প্রতিবন্ধীদের জন্য প্রতিবন্ধী কল্যাণ ট্রাস্ট, দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষেত্রে বিআরটিএ এবং অসহায় মানুষের জন্য জেলা ত্রাণ বিভাগের মাধ্যমে সহায়তার সুযোগ রয়েছে। এসব সেবা পেতে মানুষকে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে যুক্ত করে দেওয়া হচ্ছে।

গণশুনানিতে শুধু ব্যক্তিগত সমস্যাই নয়, সামাজিক বিভিন্ন বিষয় নিয়েও মানুষ আসেন বলে জানান জেলা প্রশাসক।

তিনি বলেন, ‘একটি ইউনিয়নে ভূমি অফিস নেই—এমন একটি বিষয় নিয়ে একজন সাবেক শিক্ষক এসেছেন। তিনি ওই ইউনিয়নে একটি ইউনিয়ন ভূমি অফিস স্থাপনের আবেদন করেছেন। কেউ আসেন কোনো এলাকায় জরিপ বন্ধ রয়েছে, সেটি সরকারের সঙ্গে কথা বলে চালুর অনুরোধ নিয়ে। কেউ হাসপাতাল বা রাস্তা নির্মাণের আবেদন নিয়েও আসেন।’

জেলা প্রশাসক বলেন, ‘এখানে সারাদিন যদি আমরা মানুষের কথা শুনি, তাহলে সমাজের একটা পূর্ণাঙ্গ চিত্র বোঝা যায়। মানুষের অভাব, অভিযোগ, অনুযোগ—সবকিছু বোঝা যায়। কেউ কেউ সত্যিই খুব কষ্টে আছেন। তাদের সেই কষ্ট কীভাবে লাঘব করা যায়, সেজন্য আমরা কাজ করি।’

গণশুনানিতে আসা সবাই অনুদানের জন্য আসেন না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আজকে পঞ্চাশের অধিক মানুষকে আমরা শুনেছি। সবাই কিন্তু অনুদানের জন্য আসেননি। যারা অনুদানের জন্য এসেছেন, তাদের মধ্যে অনুদান দেওয়ার মানদণ্ড অনুযায়ী বেশ কিছু মানুষকে সহায়তা দেওয়া হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আবার কাউকে হাসপাতালে রেফার করেছি, কাউকে ভূমি জটিলতার বিষয়ে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে পাঠিয়েছি। কেউ থানায়, কেউ শিল্প পুলিশে কাজের জন্য এসেছেন—তাদের সংশ্লিষ্ট জায়গায় রেফার করে দিয়েছি, কানেক্ট করে দিয়েছি। এটাই আমাদের কাজ। সঠিক ব্যবস্থাপনা হলেই মানুষ এসব সেবা পাবে।’

প্রতিদিনই মানুষের নানা সমস্যা নিয়ে আসার প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক বলেন, ‘প্রতিদিন মানুষ আসে। প্রতিদিন মানুষগুলোর চেহারার দিকে যখন তাকাই, তখন মনে হয়—এই লোকটার জন্য কিছু করা দরকার।’

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
নারায়ণগঞ্জে স্ত্রীর গলায় ছুরিকাঘাতের পর স্বামীর আত্মহত্যা
অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও দুর্গাপূজার নিরাপত্তায় জামালপুর পুলিশকে ডিআইজির নির্দেশনা
অবৈধ ওষুধ তৈরির দায়ে এনসিপি নেতার কারাদণ্ড
রাষ্ট্রপতির সঙ্গে অ্যাটর্নি জেনারেলের সাক্ষাৎ: আইনের শাসন ও গণতন্ত্রের অভিযাত্রা অব্যাহত রাখার তাগিদ