ওবায়দুল কাদেরের ‘পার্টনার আমলা’ সাবেক সচিব আমিন উল্লাহ নুরীকে পুনর্বাসিত করল ইউনাইটেড গ্রুপ

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের ঘনিষ্ঠ আমলা হিসেবে পরিচিত এ বি এম আমিন উল্লাহ নুরী এখন বেসরকারি শিল্পগোষ্ঠী ইউনাইটেড গ্রুপে নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বলে জানা গেছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর চুক্তিভিত্তিক সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিবের পদ হারান তিনি। এরপরেই ইউনাইটেড গ্রুপে যোগদান করেন।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, আমিন উল্লাহ নুরী ২০২২ সালের ৫ জুন থেকে ২০২৪ সালের ১৪ আগস্ট পর্যন্ত সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব ছিলেন। ২০২৪ সালের ২৬ জুন তার চুক্তির মেয়াদ আরও এক বছর বাড়ানোর প্রজ্ঞাপন জারি হয়েছিল।
প্রশাসন ক্যাডারের ১১তম ব্যাচের কর্মকর্তা নুরী আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, শিল্প মন্ত্রণালয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেন।
এ ছাড়া তিনি রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) চেয়ারম্যান এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ছিলেন। ২০২১ সালে ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা থাকা অবস্থায় তাকে রাজউকের চেয়ারম্যান করা হয়।
শেখ ফজলে নূর তাপস ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র থাকাকালে আমিন উল্লাহ নুরী ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, তাপসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে পরবর্তী সময়ে নুরীকে রাজউকের চেয়ারম্যান করা হয়। রাজউকের দায়িত্বে থাকা অবস্থায় তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগও ওঠে।
বিশেষ করে রাজউকের প্লট বরাদ্দ এবং ঢাকার মাদানী অ্যাভিনিউয়ে ইউনাইটেডের ভবন নির্মাণে সহযোগিতার অভিযোগ রয়েছে আমিন উল্লাহ নুরীর বিরুদ্ধে। আওয়ামী লীগ সরকারের অনেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও নেতাকে রাজউকের প্লট পাইয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়াতেও নুরী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন—এমন অভিযোগও রয়েছে। রাজউকের চেয়ারম্যান থাকাকালে প্লট-সংক্রান্ত বিধিমালা পরিবর্তন নিয়েও তার সময়ের কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল।
ডিএসসিসির ৯৬৬ কোটি টাকা নিয়ে অভিযোগ
ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা থাকাকালে সিটি করপোরেশনের ৫৪৩ কোটি টাকা এবং বিভিন্ন প্রকল্পের আরও ৪২৩ কোটি টাকা নয়ছয় করে মধুমতি ব্যাংকে সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, ওই অর্থ স্থানান্তরের ক্ষেত্রে তৎকালীন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আমিন উল্লাহ নুরী শেখ ফজলে নূর তাপসকে সহযোগিতা করেছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরও ওই টাকা ফেরত দিতে ব্যাংকটি গড়িমসি করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
২০২৪ সালে আবারও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ
আমিন উল্লাহ নুরীর স্বাভাবিক চাকরির মেয়াদ ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা ছিল। এর আগে ২০২২ সালের জুনে তিনি সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব হন।
তৎকালীন সরকার তাকে প্রথমে ছয় মাসের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়। পরে ২০২৪ সালের ২৬ জুন তার চুক্তির মেয়াদ আরও এক বছর বাড়ানো হয়। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, নতুন মেয়াদ ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকর হওয়ার কথা ছিল।
তবে ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ১৪ আগস্ট তার চুক্তির অবসান ঘটে। এরপরই ইউনাইটেড গ্রুপে নির্বাহী পরিচালক হিসেবে যোগ দেওয়ার বিষয়টি সামনে আসে।
ওবায়দুল কাদেরের অত্যন্ত একনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত
আমিন উল্লাহ নুরীর চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ একাধিকবার বাড়ানোর পেছনে ওবায়দুল কাদেরের ভূমিকা ছিল বলে দাবি করেছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। সূত্রের ভাষ্য, একনেকের একটি সভায় তৎকালীন সরকারপ্রধানের কাছে আমিন উল্লাহ নুরীর চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর জন্য সরাসরি অনুরোধ করেছিলেন ওবায়দুল কাদের।
সূত্রের দাবি, প্রথমে ওই প্রস্তাবে আপত্তি জানিয়ে বলা হয়—নুরীর চাকরির মেয়াদ বাড়ালে অন্য কর্মকর্তাদের পদোন্নতির সুযোগ কমে যাবে। পরে ওই সভাতেই ওবায়দুল কাদের আমিন উল্লাহ নুরীকে তার ‘অত্যন্ত একনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত’ কর্মকর্তা হিসেবে উল্লেখ করেন এবং তার মেয়াদ বাড়ানোর অনুরোধ করেন। এরপরই তার চুক্তির মেয়াদ দুই দফা বাড়ানো হয়।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আমিন উল্লাহ নুরী বর্তমান সরকারের একজন গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারককে ‘ম্যানেজ’ করে ফেলেছেন বলে প্রচার করেছেন। সূত্রের দাবি, তার অতীত কর্মকাণ্ড আর কোনো বিষয় নয় এবং ওই নীতিনির্ধারকের সহায়তায় তিনি নতুন পাসপোর্টও নিয়েছেন।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দায়িত্ব পালন করা অনেক আমলা পাসপোর্ট পেতে সমস্যায় পড়লেও নুরী কীভাবে নতুন পাসপোর্ট পেলেন—এ নিয়ে সরকারি মহলে আলোচনা রয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।
কাদেরের স্ত্রীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন, সড়ক বিভাগের সচিব থাকাকালে আমিন উল্লাহ নুরীর সঙ্গে ওবায়দুল কাদেরের স্ত্রী ইসরাতুন্নেসা কাদেরের ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। তাদের দাবি, বিভিন্ন কাজের ‘পারসেন্টেজ’ পৌঁছে দেওয়া এবং বিদেশ থেকে ওবায়দুল কাদেরের জন্য দামি ঘড়ি ও স্যুট এনে দেওয়ার মতো বিষয় তখন সরকারি মহলে আলোচিত ছিল।
আওয়ামী লীগ সরকারের সুবিধাভোগী ব্যবসায়ীগোষ্ঠীগুলোর অন্যতম হিসেবে ইউনাইটেড গ্রুপের নামও বিভিন্ন মহলে আলোচিত হয়েছে। ২০২৪ সালের মে মাসে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁর চিকিৎসায় অ্যাম্বুলেন্স এবং ওষুধ সহায়তার প্রয়োজন পড়ে। সে সময় ইউনাইটেড গ্রুপের মালিকানাধীন ইউনাইটেড হাসপাতালে তাঁর মেডিকেল দল সহায়তা চাইলেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সরাসরি চিকিৎসা সহায়তা দিতে অস্বীকৃতি জানায়।
এ ছাড়া বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে নির্যাতনে সরাসরি জড়িত ছিলেন ডিজিএফআই কর্মকর্তা কর্নেল মো. আফজাল নাছের। তাকেই ইউনাইটেড গ্রুপ নির্বাহী পরিচালক (অ্যাডমিন) পদে নিয়োগ দিয়ে পুনর্বাসন করেছিল। খালেদা জিয়াকে ওই রাতে চিকিৎসা না দিয়ে ফেরত পাঠানোর সময় হাসপাতালের দায়িত্বে ছিলেন আফজাল।
আর সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আব্দুল মুবীনের সঙ্গেও ইউনাইটেড গ্রুপের সম্পর্কের প্রসঙ্গ সামনে এসেছে। সেনানিবাসের মঈনুল রোডের বাড়ি থেকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে উচ্ছেদের ক্ষেত্রে তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল আব্দুল মুবীনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। পরবর্তীতে ইউনাইটেড গ্রুপের আরেক প্রতিষ্ঠান ইউনাইটেড পাওয়ারের চেয়ারম্যান করে মুবীনকে। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এলে জেনারেল মুবীনকে ইউনাইটেড পাওয়ারের দায়িত্ব দিয়ে সিঙ্গাপুরে পাঠানো হয়।
একদিকে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে ধারাবাহিক দায়িত্ব পালন, অন্যদিকে ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ—এরপর সরকার পরিবর্তনের পরই একটি বড় বেসরকারি শিল্পগোষ্ঠীর নির্বাহী পরিচালক পদে যোগ দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তাছাড়া ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে যারা বিএনপিতে নির্যাতন করেছে তাদেরকেই বারবার পুনবার্সিত করেছে এই শিল্পগোষ্ঠীটি।
এসব বিষয়ে জানতে আমিন উল্লাহ নুরীকে ফোন করা হলেও তাতে তিনি সাড়া দেননি।
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













