হাসিমুখের অন্য রকম একুশ

আরিফ হাসান, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ১২:৫২ | প্রকাশিত : ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ১১:২৭

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। বাংলা ৮ ফাল্গুন। পুলিশের ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে রাজপথে নেমেছিলেন এ দেশের ছাত্র-জনতা। নির্মমভাবে গুলি চালালো পুলিশ। রাজপথে ঝরে গেল রফিক, শফিক, সালাম, বরকত, জব্বারসহ নাম না জানা অনেক তরুণের প্রাণ। তাদের আত্মত্যাগের জন্যই আমরা পেয়েছিলাম মায়ের ভাষায় কথা বলার অধিকার। মহান সে সকল ভাষা সৈনিকদের স্মৃতিতে প্রতি বছরের ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালন করা হয়।

এবারও দেশব্যাপী পালন হয়েছে দিনটি। জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে যাতে শরীক হয়েছিল দেশের প্রতিটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন সংগঠন। তাদের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে ভাষা শহীদদের শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেছে ‘হাসিমুখ সমাজ কল্যাণ সংস্থা’ও। তরুণ-তরুণীদের একটি সেচ্ছাসেবক দল কর্তৃক পরিচালিত যে সংস্থাটি দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে সমাজের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ও অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে।

প্রতিটা দিবসেই এই সংস্থাটির পক্ষ থেকে থাকে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমি আয়োজন। গতানুগতিক ধারা থেকে বেরিয়ে তারা যেকোনো দিবসকেই একটু ভিন্ন ভাবে পালন করার চেষ্টা করে। যে চেষ্টার ছাপ পাওয়া গেছে এবারের ২১ ফেব্রুয়ারির অনুষ্ঠানেও। তারই অংশ হিসেবে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে আগের দিন বিকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত অক্লান্ত পরিশ্রম করে স্কুল প্রাঙ্গণ পরিষ্কার ও নয়াভিরাম আলপনায় সাজিয়ে তোলেন সংস্থাটির অন্যতম স্বেচ্ছাসেবক মিনা। 

এরপর সকাল থেকে শুরু হয় মূল অনুষ্ঠান। ২১ ফেব্রুয়ারির দিন সকাল সাড়ে ৯টায় আমন্ত্রিত অতিথি, সেচ্ছাসেবক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে শহীদ বেদিতে ফুল দিয়ে ও জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে মহান ভাষা সৈনিকদের স্মরণ করে ‘হাসিমুখ সমাজ কল্যাণ সংস্থা’। পরে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে একে একে শুরু হয় চিত্রাঙ্কন, কবিতা আবৃতি, গান ও রচনা প্রতিযোগিতা।

সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য হাসিমুখ কর্তৃক আয়োজিত প্রতিটা প্রতিযোগিতাতেই ছিল ভাষা দিবসের ছোঁয়া। শিক্ষার্থীরা তাদের প্রতিটি প্রতিযোগিতার মাধ্যমেই মহান ভাষা সৈনিকদের আন্দোলন ও জীবন দানের গৌরবোজ্জ্বল সে ইতিহাসের কথা ফুটিয়ে তোলে। কচি কচি শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের সে সকল প্রতিযোগিতার প্রতিটিই ছিল বেশ উপভোগ্য।  

হাসিমুখের ২১ ফেব্রুয়ারির এবারের আয়োজনে অতিথি হয়ে এসেছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি একাডেমি অধ্যাপক ড. নাসরিন আহমেদ ও বাংলাদেশ অর্থ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব সুশান্ত কুমার সাহা। তাঁরা দুজনই তাঁদের বক্তব্যে ভাষা আন্দোলনের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস বাচ্চাদের সামনে তুলে ধরেন। বলেন, ‘বিশ্বের মধ্যে বাংলাদেশই একমাত্র রাষ্ট্র, যেখানকার মানুষ ভাষার জন্য জীবন দিয়েছেন। পৃথিবীর ইতিহাসে এ ঘটনা বিরল। কাজেই, রক্তের বিনিময়ে অর্জিত সে ভাষার প্রতি আমাদের সকলেরই শ্রদ্ধা বাড়াতে হবে এবং ভালো বাংলা বলার অভ্যাস করতে হবে।’

পরে আমন্ত্রিত অতিথিরা একুশের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী বিজয়ী শিক্ষার্থীদের হাতে পুরস্কার হিসেবে বই তুলে দেন এবং খাবার বিতরণ করেন। এ সময় সেখানে ‘হাসিমুখ সমাজ কল্যাণ সংস্থা’র সেক্রেটারি নুসরাত একা, কোষাধ্যক্ষ জুলকার নাইনসহ অন্যান্য সেচ্ছাসেবক ও আমন্ত্রিত অতিথিরা উপস্থিত ছিলেন।

হাসিমুখের ২১ ফেব্রুয়ারির এবারের আয়োজনে সেচ্ছাসেবকদের অংশগ্রহণেও ছিল একটি ভিন্ন ধরণের প্রতিযোগিতা। যেটি ছিল, অন্য কোনো ভাষার সংমিশ্রণ ছাড়া কে কতক্ষণ শুধু বাংলা ভাষায় কথা বলতে পারেন। ভাষা দিবসের দিনে বাংলা ভাষা ও মহান ভাষা শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়েই এমন ব্যতিক্রমি প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে বলে জানান সংস্থাটির সেক্রেটারি নুসরাত একা।

শুধু ২১ ফেব্রুয়ারিই নয়, সুবিধিবঞ্চিত শিশুদের সঙ্গে নিয়ে ১৬ ডিসেম্বর, ২৬ মার্চ ও পহেলা বৈশাখের মতো প্রতিটা বিশেষ দিবসই পালন করে ‘হাসিমুখ সমাজ কল্যাণ সংস্থা’। এ সম্পর্কে নুসরাত একা বলেন, ‘প্রতিটি দিবসেরই বিশেষ বিশেষ গুরুত্ব ও তাৎপর্য রয়েছে। প্রতিটি দিবসের ইতিহাসও ভিন্ন ভিন্ন। আমি চাই, অন্যদের মতো সমাজের এসব সুবিধাবঞ্চিত শিশুরাও প্রতিটি দিবসের ইতিহাসকে আলাদা আলাদা করে জানুক।’

সমাজের সুবিধাবঞ্চিত এসব শিশুদের শিক্ষার আলোয় আলোকিত করতে গত পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে ‘হাসিমুখ’পথশিশু স্কুলটি পরিচালনা করছে ‘হাসিমুখ সমাজ কল্যাণ সংস্থা’। রাজধানীর পরিবাগের ওয়াবদা অফিসার্স কোয়ার্টারের সামনের রাস্তা দিয়ে গেলেই চোখে পড়বে স্কুলটি। ঘড়ির কাটায় বিকাল চারটা বাজলেই সেখানে রাস্তার উপর চট ফেলে বসে পড়ে আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা শতাধিক কচিমুখ। তাদের মাঝে শিক্ষার বীজ বুনে দিতে নিজেদের কাজ ফেলে শুক্রবার বাদে সপ্তাহের ছয় দিনই সেখানে হাজির হন জুলকার, মিনা, রেশমী, হাশেম, নিজাম, মিলন, মিশাল, প্রমী ও রিশাদের মত বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা। 

 

শুধু এটুকুতে সমাজের অবহেলিত এসব শিশুদের প্রতি তাদের দায়িত্ব থামিয়ে রাখেনি ‘হাসিমুখ সমাজ কল্যাণ সংস্থা’। বর্তমান সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে এবং বাচ্চাদের সুন্দর ভবিষ্যতের ভিত্তি আরো মজবুত করতে একটি তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রও প্রতিষ্ঠা করেছে তারা। যেখান থেকে বাচ্চারা পাঠ্য বইয়ের পাশাপাশি কারিগরি জ্ঞানেও নিজেদের সমৃদ্ধ করতে পারবে। যাতে সফল হবে সংস্থাটির ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা, পূরণ হবে সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নও। 

ঢাকাটাইমস/২২ফেব্রুয়ারি/এএইচ

সংবাদটি শেয়ার করুন

ফিচার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত